রমজানে আইন শৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণ জরুরি

রমজানে আইন শৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণ জরুরি

রমজানে আইন শৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণ জরুরি

মাহমুদুল হক আনসারী : রমজান মাস মুসলমানদের ধর্মীয়ভাবে অন্যমাসের তুলনায় বেশি গুরুত্বপূর্ণ। অন্য ১১ মাসে যেসব ধর্মপ্রাণ মুসল্লীরা ইবাদত বন্দেগীতে অমনোযোগী হন তারাও এ মাসে রমজান মাসের বরকতময় ইবাদতে অংশগ্রহণের চেষ্টা করে থাকেন। ফলে রমজান মাসে সব বয়সের মুসল্লীদের মসজিদে আগমন বেশি থাকে। সবগুলো মসজিদ প্রায় মুসল্লীদের উপস্থিতিতে কানায় কানায় ভরপুর থাকে। প্রায় সুস্থ ও সবল প্রাপ্ত বয়ষ্ক নর-নারী রোজা পালন করতে দেখা যায়।

সারা পৃথিবীর মুসলমানদের সাথে বাংলাদেশের ধর্মপ্রাণ মুসল্লীরা মাহে রমজান ও রোজাকে অভিবাদন ও স্বাগত জানাতে সব ধরনের প্রস্তুতি নিয়ে থাকে। রোজা, তারাবিহ নামাজ, সেহরী ও ইফতারের কারণে এ মাসে মুসল্লীদের ভোগ্যপণ্যের কিছুটা অতিরিক্ত চাহিদা বেশি থাকে। সে সুবাদে এক শ্রেণীর ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট অতিরিক্ত মুনাফা লাভের আশায় পণ্যের মওজুদ গড়ে তোলে। এটা এক প্রকার অনৈতিক ব্যবসা বলা যায়। পৃথিবীর মুসলিম অমুসলিম দেশে পণ্যমূল্য বৃদ্ধির প্রবণতা দেখা না গেলেও বাংলাদেশে এ প্রবণতা আমরা দেখে আসছি। মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ট দেশ হলেও মুসলমানরাই এখানে ব্যবসায় বাণিজ্যে এগিয়ে। তাদের নিয়ন্ত্রণেই বড় বড় ভোগ্যপণ্যের বাজার। সিন্ডিকেট ও বাজার উঠানামা তাদের ইশারায় হয়ে থাকে। এসব সিন্ডিকেটে ক্ষমতাসীন দলের কতিপয় নেতাদের সম্পৃক্ততার প্রমাণও দেখা যায়।

রাজনৈতিক চত্রছায়া ছাড়া কখনো সিন্ডিকেট করে বাজার নিয়ন্ত্রণ রাখা সম্ভব না। তাই ক্ষমতাসীন দলের চত্রছায়ায় থেকে এসব অনৈতিক কর্মকান্ড চালাচ্ছে। যা রাষ্ট্রের বিভিন্ন গোয়েন্দা তথ্যে প্রমাণ পাওয়া যাবে। এসব কর্মকান্ড অবশ্যই প্রশাসনকেই থামাতে হবে। পৃথিবীর অন্য দেশে রমজান মাসে ভর্তুকি দিলেও বাংলাদেশে তার বিপরীত কর্মকান্ড জনগণ দেখে থাকে। বাংলাদেশে রাজনীতি থেকে শুরু করে ব্যবসা বাণিজ্য সামাজিক কর্মকান্ড সবকিছুর মধ্যেই ব্যাক্তি ও দলীয় স্বার্থকে বিবেচনা করা হয়। যার ফলে ন্যায় ও অন্যায় রাষ্ট্রীয়ভাবে মূল্যায়নে কম আসে। রাজনৈতিক বিবেচনায় ছোট বড় অপরাধ অথবা অপরাধীরা নিরাপদে থেকে যায়।

অপরাধীকে অপরাধী হিসেবে সনাক্ত না করে দলীয়ভাবে বিবেচনার কারণে অপরাধ ও অপরাধী অনেকটা নিরাপদে থেকে যায়। ফলে অপরাধ প্রবণতা কমে যাওয়া তো দূরের কথা অপরাধী ক্ষমতাসীন দলের ক্ষমতার পট পরিবর্তনের সাথে সাথে সেও পরিবর্তন হয়ে যায়। যার কারণে অপরাধ ও অপরাধী সমাজে বহাল তবিয়তে বেঁচে যায়। সমাজে কী পরিমাণ অপরাধ ও অপরাধী তার হিসেব আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে সযত্নে আছে। ভালো মানুষের তালিকা যেভাবে আছে অসৎ ও কালোবাজারিদের তালিকাও আছে। কিন্তু কেন অপরাধীদের অপরাধ থামছে না, অথবা তাদেরকে আইনের মধ্যে নিয়ে আসা হচ্ছে না সেখানেই সমাজ সচেতন বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য।

সঠিকভাবে যথাযথ আইনের মাধ্যমে সমাজে অপরাধীদের বিচারের আওতায় আনা গেলে অবশ্যই অপরাধ প্রবণতা বহু অংশে কমে আসতো। কিন্তু সমাজের শান্তিপ্রিয় জনগণ সেটা দেখছে না। না দেখার কারণে নিত্য নৈমিত্তিক অপরাধ বিদ্যুৎ গতিতে বৃদ্ধি পাচ্ছে। সেটা রমজান মাস বলে কোনো কথা নেই। অপরাধী তার কাছে মসজিদ, মন্দির, গীজা, কোরআন আর গীতা কিছুতেই তফাৎ নেই। অপরাধী তার পরিচয় অপরাধকারী হিসেবে। তাকে রাজনৈতিক পরিচয় দিয়ে সেল্টার দেয়া অথবা রক্ষা করা আইনের মধ্যে পড়ে না। আইনকে আইনের গতিতে না চালালে অপরাধ প্রবণতা কোনো অবস্থায় কমবে না। বরঞ্চ এসব অপরাধ আরো বৃদ্ধি পাবে। রমজান মাসে অন্যান্য মাসের তুলনায় অপরাধ প্রবণতা কম দেখা যায় না। নানাভাবে ছোট বড় চাঁদাবাজি, হাইজ্যাকার, প্রতারক ও মলম পার্টি দেখা যায়। সহজ সরল জনগণকে প্রতারণা আর ধোঁকায় ফেলে এসব অপরাধী চক্র সক্রিয় থাকে। তারাবিহ নামাজ, সেহরী ও ইফতারের সময় কতিপয় ধরনের অপরাধ সংঘটিত হয়। ছোট খাটো চুরি, হাইজ্যাক পাড়ায় মহল্লায় হয়ে থাকে। মোবাইল চুরি থেকে ল্যাপটপ ও দোকান মার্কেটে চুরি ডাকাতি সংঘটিত হয়ে আসছে। বাংলাদেশের পুলিশ বাহিনীর সাহসী প্রশংসার কথা আমরা জানি। এ বাহিনী অপরাধ নিয়ন্ত্রণে রাখতে চাইলে তাদের পক্ষে সম্ভব। এরপরও কেনো অপরাধীরা নানাভাবে ছোট বড় অপরাধ করে পার পেয়ে যায় সেখানেই অনেক প্রশ্ন থেকে যায়। রাষ্ট্রীয়ভাবে সরকার আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সমস্ত সুযোগ সুবিধা দিচ্ছে বলে আমরা জনি। তবুও কেন এত অপরাধী বৃদ্ধি পাচ্ছে সেখানে কথা থেকে যায়।

এছাড়াও রমজান মাসে যেহেতু ঈদুল ফিতর মুসলমানদের বড় খুশির দিন সেহেতু একটু বাজার মার্কেটে যাতায়াত বেশি হয়ে থাকে। কী রাত, কী দিন যার যখন সময় সুযোগ হয়, অথবা অর্থ কড়ি হাতে আসে তখনি বাজার মার্কেটে কেনাকাটায় নেমে পড়ে। সেখানেও আলাদাভাবে ভোগান্তির মধ্যে পড়তে দেখা যায় কেনাকাটাকারীদের। যুবক-যুবতী, ছাত্র-ছাত্রী দল বেঁধে মার্কেটে মার্কেটে ঘুরে ঘুরে কেনাকাটা করে।

প্রায় দেখা যায়, তারাবিহ নামাজের পর সেহরীর আগ মুহুর্ত পর্যন্ত অনেক মানুষ কেনাকাটায় ব্যস্ত থাকে। সেখানে কিছুটা তাদের যাতায়াত ও নিরাপত্তায় ভোগান্তি দেখা যায়। রাস্তায় নিয়োজিত আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কর্তৃক অনেক স্পটে অহেতুক ঝামেলা করতে দেখা যায় জনগণকে। যুবক-যুবতী যারা মার্কেট করতে যায় তাদেরকে অতিরিক্ত ঝামেলা করতে দেখি। যেখানে রাস্তাঘাট মার্কেটে জনগণকে অতিরিক্ত নিরাপত্তার বেষ্টনীতে রেখে সহযোগীতার কথা, সেখানে অহেতুকভাবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হয়রানি আর ভোগান্তি কোনো অবস্থায় গ্রহণযোগ্য নয়। যেহেতু রমজান মাসে মুসল্লীদের ইবাদত বন্দেগী আর পারিবারিক কেনাকাটার ঝামেলাটা বেশি থাকে, সে সুযোগে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জনগণের প্রতি সেবার মনোভাব থাকতে হবে বেশি। সেখানে যদি হয়রানি আর ভোগান্তির মাত্রা হয় বেশি তাহলে এ বাহিনীর প্রতি জনগণের আস্থা আর বিশ্বাস কোথায় গিয়ে দাড়ায় সে বিষয় বলার অপেক্ষা রাখে না। রমজান মাসে রোজা পালনের সাথে মুসল্লীদের পারিবারিক সামাজিক কর্তব্য বেড়ে যায়।

সামর্থ্যবান মুসল্লীদের যাকাত প্রদান ও দান খয়রাতের বিষয় জড়িত। গরিব, দু:স্থ মানুষদের এ মাসে সামর্থ্যবানরা সাহায্য সহযোগীতা দিয়ে থাকে। সেটা তাদের হক। এসব দান খয়রাত নিতে ও দিতে যেনো কাউকে ভোগান্তিতে পড়তে না হয় সে বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে থাকা দরকার। দেখা যায়, দেশের বিভিন্ন এলাকায় যাকাতের সামগ্রি নিতে গিয়ে অনেক মুসল্লীকে জীবন দিতে হয়েছে। এটা কোনো অবস্থায় গ্রহণযোগ্য নয়। যে বা যারা এসব দান খয়রাত করবে অবশ্যই তাদেরকে শৃঙ্খলার মধ্যে তা করা দরকার। লোক দেখানো আর মানুষের জীবনকে ধ্বংস করে কোনো দান খয়রাত গ্রহণযোগ্য ইবাদত হতে পারে না। এসব কর্মকান্ড থেকে আমাদের বিরত থাকা চায়।

রমজান মাসে যেসব সময়ে অপরাধ প্রবণতা বেশি সংঘটিত হয়, সেসব সময় বেশি করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে বেশি দায়িত্বশীল হতে হবে। অহেতুক ও অন্যায়ভাবে কোথাও যেন জনগণ ভোগান্তির শিকার না হয় সেসব দিক উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে নির্দেশনা প্রদান করতে হবে। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সমস্ত ক্ষমতার মালিক দেশের জনগণ। কোনো অবস্থায় জনগণকে অন্যায়ভাবে হয়রানি ও কষ্ট দেয়া যাবে না। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এদেশের রাষ্ট্র ও জনগণের সেবক, সে দায়িত্ব মাথায় রেখে জনগণের কল্যাণে তাদের দায়িত্ব ও কর্তব্য পালন চায় জনগণ। রমজানে মুসল্লীদের পূণ্যময় ইবাদত বন্দেগী পালনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সহযোগীতার বিকল্প নেই।

লেখক : গবেষক, প্রাবন্ধিক

byda1814@gmail.com

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *