স্বাগত ‏মাহে রমজান

স্বাগত ‏মাহে রমজান

স্বাগত ‏মাহে রমজান

নুরুল ইসলাম শ্রীপুরী : স্বাগত ‏মাহে রমজান। কাঙ্ক্ষিত মাহে রমজান চলে এসেছে। ‏মানবতা ও মনুষ্যত্বের দুর্ভিক্ষ চলছে বিশ্বের সকল মানবমঞ্চে । মানুষ অনাচার ও পাপাচারে লিপ্ত । মনে হচ্ছে শান্তির নদী শুকিয়ে গেছে। অশান্তির রুধিরঞ্জিত মানবের দেহ মন। পাপ পঙ্কিলতার অন্তহীন পরিস্থিতি থেকে মুক্তির জন্য মুসলিম উম্মাহ অধীর আগ্রহে এবাদতের সুযোগ সন্ধানে উম্মুখ। যেখানে অল্প আমলে বেশি ছওয়াব পাওয়া যাবে। যে এবাদত মানব জাতিকে গোনাহের কালোকালিমার ঘোর অন্ধকার থেকে বের করে নিয়ে আসবে হেদায়েত ও মুক্তির আলোর ভুবনে। সে আলোর ইশারায় শুরু হবে ‘হেরার রাজতোরণ’ পানে মানবতার পথহারা কাফেলার নতুন সফর । সুূচনা হবে স্বর্গীয় দরজা ‘বাবুররাইয়ান’ পানে নবিীন রোজাদারের নবযাত্রা।

‏আলহামদুলিল্লাহ প্রতিক্ষিত সেই শুভক্ষণ শুরু হয়েছে। আমরা সবাই বরণ করছি মহিমান্বিত রমজান মাসকে। সকলেই অনুপ্রাণিত মনে প্রবেশ করছি রহমত বরকতের বৃষ্টিস্নিগ্ধ মাস, মাগফিরাতের বর্ষাকাল, সাম্য ও জীবিকায় টইটম্বুর রমজান শরীফে। আবেগাপ্লুত ও উচ্ছ্বসিত মনে উষ্ণ অভিনন্দন জানাই রমজানুল মোবারককে।

মানবজীবনে প্রাচুর্য অর্জনের শ্রেষ্ঠ মাস রমজান মাস। এ মাস হলো কল্যাণ ও মুক্তির সওগাতবাহক মাস। এ মাসের গুরুত্ব ও মাহাত্ম্য অনন্য অতুল্য। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ মাসকে ‘শাহরুন কারীম’ ‘শাহরুন আযীম’ এবং ‘শাহরুন মোবারাকুন’ নামে আখ্যায়িত করেছেন । সর্বোপরি তিনি রমজান আগমনের দু’মাস আগেই এ মাসের ব্যাপক প্রাচুর্য অর্জনের জন্য কায়মনোবাক্যে এ প্রার্থনা করতেন, “হে আল্লাহ ! রজব ও শা’বান মাসে আমাদেরকে বরকত দান করেন এবং রমজান মাস পর্যন্ত আমাদেরকে পৌঁছে দিন। এখন ভাবতে হবে আমরা কী প্রস্তুতি নিয়েছি রমজানকে বরণ করার জন্যে। আমরা কীভাবে প্রাচুর্যময় রমজানকে সাদর সম্ভাষণ জানাবো। রমজান আমাদের মহামেহমান, শ্রদ্ধার অতিথি। রমজান উদ্যানে আমরা মনখুলে বিচরণ করি। অবগাহন করি তার স্নিগ্ধ সরোবরে। আপন আমলের হালখাতায় একটু হিসাব মিলাই, পরকালের জন্য কী পশ্চাতে রেখে এসেছি আর কী অগ্রে প্রেরণ করছি।

‏রমজান মাসকে স্বাগতম জ্ঞাপন করার ক্ষেত্রে সর্বাগ্রে আমরা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর বাণীকে প্রণিধানযোগ্য মনে করবো । হযরত আবু হুরায়রা রাদিআল্লাহু তায়ালা আনহু থেকে বর্ণিত রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবায়ে কেরামকে রমজান আগমনের সুসংবাদ দিতেন।

‏তিনি বলেন, তোমাদের মাঝে রমজান মাস অত্যাসন্ন। তা মোবারক মাস। আল্লাহ তায়ালা তোমাদের উপর সে মাসের রোযা ফরজ করেছেন । উক্ত মাসে জান্নাতের দরজা খোলে দেয়া হয়। জাহান্নামের দরজা বন্ধ করে দেয়া হয়। অভিশপ্ত শয়তানকে শৃঙ্খলাবদ্ধ করা হয়। উক্ত মাসে রয়েছে এমন একটি রজনী যা হাজারো মাস থেকে উত্তম। সে রাতের কল্যাণ থেকে যে বঞ্চিত রয়েছে সে যেনো সকল ধরনের কল্যাণ থেকে বঞ্চিত রয়েছে (মুসনাদে আহমদ ও নাসায়ী শরিফ) । আল্লামা ইবনে রজব হাম্বলী রহ. বলেন, বর্ণিত হাদিসটি রমজান উপলক্ষে উষ্ণ অভিভাদন জ্ঞাপন করার মৌলিক শিক্ষাবাহক হাদিস। রমজান মাসকে কেন স্বাগত জানানো হবে না, অথচ এ মাসে শীর্ষ অপরাধীদের জন্য নরক দ্বার রুদ্ধ করে দেয়া হয়। আত্মত্যাগী মুমিনদের জন্য স্বর্গ দ্বার খোলে দেয়া হয় । সর্বোপরি অভিশপ্ত শয়তানকে বন্দি করা হয়।

‏প্রথিতযশা আবেদ মুয়াল্লা ইবনে ফাযাল বলেন, সুদীর্ঘ ছয় মাস যাবৎ রমজানকে পাওয়ার জন্য আল্লাহর কাছে কায়মনে দুআ’করতেন। অতঃপর আরও ছয় মাস রমজানের আমল কবুল হওয়ার জন্য অনুনয় বিনয় করতেন (ড, সৈয়দ হুসাইন আল আফফানী, আলজামে’ আল উম)।

‏রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, পবিত্র রমজানের উপলক্ষে জান্নাতকে অপূর্ব সুগন্ধি দিয়ে সুরভিত করা হয় । বছরের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত জান্নাতকে রমজানের সম্মানার্থে কান্তিময় ও সুসজ্জিত করা হয় । রমজানের প্রথম রাতে আরশের তলদেশ হতে সুমধুর বাতাস বয়ে যায়।

জান্নাতি বায়ূর প্রবাহে জান্নাতের পত্র-পল্লব, নব নব কিশলয় ও স্বর্গতোরণের কড়াসমূহ হেলতে দুলতে আরম্ভ করে। ক্রমেই জান্নাতের মাঝে এমন হৃদয়স্পর্শী সুরলহরীর গুঞ্জন শোনা যাবে যে এরূপ মনোমুগ্ধকর সুর পূর্বে আদৌ কর্ণকুহরে গুঞ্জরিত হয়নি। ডাগর ডাগর চোখ বিশিষ্ট ঈর্ষণীয় হুর আত্মপ্রকাশ করবে। জান্নাতের স্বচ্ছ-সফেদ আলীশান বালাখানায় দাঁড়িয়ে কেউ ঘোষণা করবে, আল্লাহর সান্নিধ্যপ্রাপ্ত কোন সুপ্রিয় বান্দা আছো কী? আমাদের সঙ্গে পরিণয়সূত্রে আবদ্ধ হওয়ার জন্য আল্লাহর কাছে আল্লাহর দরবারে দরখাস্ত করবে। অতঃপর হুর-বালাগণ জান্নাতের প্রহরী ‘রিদওয়ানের’ নিকট জিজ্ঞেস করবে এটা কোন রাত্রি ?

তিনি বলবেন, এটা রমজানের প্রথম রাত। মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উম্মতের জন্য জান্নাতের দরজা খোলে দেয়া হয়েছে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, আল্লাহ পাক রিদওয়ানকে বলবেন, আহমদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের রোজাদার উম্মতের জন্য জাহান্নামের দরজা বন্ধ করে দাও (আততারগীব লিল মুনযিরী)।

‏রমজান পাওয়া , রোযা রাখতে সক্ষমতা অর্জন করা এটা আল্লাহর বৃহত্তম দান এবং মহা নেয়ামত।

‏হযরত আবু সালমা, হযরত আবুবকর সিদ্দিক রাদিআল্লাহু আনহু থেকে বর্ণনা করেন ‘রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে খুযাআ গোত্রের দুই ব্যক্তি ইসলাম গ্রহণ করেন, তন্মধ্যে একজন শাহাদাত বরণ করেন আর অপরজন একবছর জীবিত থেকে জীবন সাঙ্গ করেন। ত্বালহা ইবনে উবায়দুল্লাহ বলেন, আমাকে স্বপ্নে জান্নাত দেখানো হয়েছে। আমি দেখলাম শহীদ ব্যক্তির জান্নাতে প্রবেশের পূর্বে যিনি শহীদ নন তাঁকে জান্নাতে প্রবেশ করানো হয়েছে। আমি বিষয়টি দেখে বিস্মিত হলাম এবং ভোরে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে স্বপ্ন বললাম।

তিনি বললেন, শহীদ ব্যক্তি শাহাদাতের পর যে ব্যক্তি শহীদ হয়নি সে রমজান মাস পেয়েছে এবং ছয়হাজার রাকা’আত নামাজ আদায় করেছে। রমজানের আমলের মাধ্যমে সে শহীদ ব্যক্তি থেকে জান্নাতে পূর্বে প্রবেশ করেছে। রমজান মহা গণীমতের মাস। রমজানকে সার্থক করে তোলা আমাদের নৈতিক দায়িত্ব। (‏আলজামে’ আল উম, সৈয়দ আফফানী)

‏হায় আফসোস! অনেকেই আশায় আশায় বুক বেঁধেছে, এবার রোযা রাখবে । কিন্তু তার আশা ও বাস্তবতার মধ্যে মৃত্যু যবনিকা অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়। ফলে সে প্রতিক্ষিত রমজান আসার পূর্বেই গুর গহবরে চলে যায়। আশা, স্বপ্ন, স্বাদ আগামী পৃথিবীর জন্য স্বপ্নময় প্রতিচ্ছবি হয়ে নির্বাক দাঁড়িয়ে আছে। মানুষ যদি মৃত্যু ও তার ভয়াল রূপ দেখতো তাহলে আদৌ আশার ধোঁকাবাজিতে মোহগ্রস্ত হতো না । রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, নিশ্চয়ই তোমাদের প্রতিপালক তোমাদের জীবনের দিনসমূহে অনেক সুভাস সুগন্ধি রেখেছেন। তোমরা এসব সুগন্ধি অর্জনের মুখোমুখি হও। হয়তো তোমাদের মধ্যে কারো গায়ে এ সুভাস লাগবে ফলে সে আর কখনো বিপথগামী হবে না (আততারগীব লিল মুনযিরী)।
লেখক : শিক্ষক ও গবেষক

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *