তথ্যপ্রযু্ক্তি : সম্ভাবনা ও সীমাবদ্ধতা
ফারুক মো: আব্দুল মুনিম : বর্তমান যুগ তথ্যপ্রযুক্তির যুগ। বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশও তথ্যপ্রযুক্তির উন্নয়নকে কাজে লাগাতে একধাপ এগিয়ে। দেশে তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহারকারীর সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। প্রত্যেক মানুষের তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহারের অধিকার আছে। যার হাতে একটি স্মার্ট ফোন আছে সেই সুযোগ পাচ্ছে অনলাইনে প্রবেশ করার। কারো বাধা দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। কিন্তু অনলাইনের এই ব্যবহারকে কতটা দক্ষতার সাথে করতে পারছে এটাই এখন বড়ো ব্যাপার। কারণ বর্তমানে সাইবার অপরাধের মাত্রা ক্রমান্বয়ে বেড়েই চলেছে।
ইন্টারনেট এর মাধ্যমে সংঘটিত যে কোনো অপরাধই হলো সাইবার অপরাধ। ইন্টারনেট বা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করে বিভিন্ন রকম অপরাধ সংঘটিত হতে পারে। ফেসবুক এখন সবার হাতের নাগালে। ফেসবুক এখন আমাদের দেশে খুবই সহজলভ্য। প্রযুক্তির এই ছোঁয়ায় আমাদের দেশ বদলেছে অনেক। কিন্তু ডিজিটাল মাধ্যমে করা অপরাধ বৃদ্ধির আশঙ্কা রয়েছে। আমাদের অজান্তেই আমরা সাইবার ক্রাইমের শিকার হতে পারি। আমরা কখনো সাইবার বুলিং এর শিকার, ডিফেমিং এর শিকার, আইডি হ্যাক হতে পারে, ফেসবুক এবিউজিং এর শিকার, হ্যাকিং এর শিকার হতে পারি। এর বাইরেও অনেক রকমের সাইবার ক্রাইম রয়েছে। তাছাড়া অনলাইনের মাধ্যমে অনেকে হয়রানির শিকার হতে পারে।
তার মধ্যে হলো- সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ফেইক আইডি খুলে জ্বালাতন; ই-মেইল অথবা ওয়েবসাইট হ্যাক; বিভিন্ন ট্রল গ্রুপ বা পেজে ব্যক্তিগত ছবি ছড়িয়ে দেওয়া; বিভিন্ন পর্ণো ওয়েবসাইটে মুহুর্তের মধ্যেই ছড়িয়ে দেওয়া; আইডি হ্যাক করে অর্থ দাবি; কাউকে মারধর করে তার ভিডিও ধারণ করে তা অনলাইনে ছড়িয়ে দেওয়া; অনলাইনে ই-কমার্সের নামে ভুয়া পেজ খুলে খারাপ পণ্য বিক্রির নামে হয়রানি; ভুয়া নম্বর থেকে ফোন করে লটারির কথা বলে বিপুল পরিমাণ অর্থ আত্মসাৎ; অনলাইন ব্যাংক একাউন্ট ও এটিএম কার্ডের ডিটেইলস চুরি করে অর্থ চুরি এবং অনলাইনে বিভিন্ন সেলিব্রেটির নামে ভুয়া তথ্য ছড়ানো ইত্যাদি।
আসলে সাইবার ক্রাইম নিয়ে বলতে গেলে শেষ করা যাবে না। আগামীতে সাইবার ক্রাইম বড়ো আকার ধারণ করার আশঙ্কা রয়েছে। সরকারের প্রশংসনীয় উদ্যোগ হলো ২০২১ সালের মধ্যে দেশকে ডিজিটাল করা তাই একদিকে আমাদের দেশের যুবসমাজের জন্য খুলে দিয়েছে অপার সম্ভাবনার দ্বার, আবার কতিপয় অসৎ ব্যক্তির প্রযুক্তির অপব্যবহার করার ঝুঁকি এ অগ্রযাত্রাকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলছে। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের বেশিরভাগ যুবক এখনো জানে না যে তারা কীভাবে সাইবার ক্রাইমের শিকার হচ্ছে।
সাইবার ক্রাইমে আক্রান্ত হওয়ার হাত থেকে বাঁচতে আমাদের কিছু বিষয় লক্ষ্য রাখা একান্ত জরুরি। তা হলো- ব্যক্তিগত কোনো কিছু অনলাইনে আদানপ্রদান করা যাবে না; আবেগের বশবর্তী হয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম বিশেষ করে Facebook ও You Tube এ যে কোনো ছবি ভিডিও আপলোড এবং লাইক, শেয়ার করা থেকে বিরত থাকতে হবে; সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের পাসওয়ার্ড কারও সাথে শেয়ার করা যাবে না; পাবলিক ওয়াই-ফাই ব্যবহার করা থেকে বিরত থাকতে হবে। ব্যক্তিগত ডিভাইসকে সুরক্ষিত রাখতে হবে; নিজের বা পারিবারিক ছবি অন্যকে দেওয়ার ক্ষেত্রে সতর্ক হতে হবে।
মোবাইলে অহেতুক উপহারের কথা শুনে অর্থ লেনদেন করা যাবে না; রিভিউ না দেখেই অনলাইনে কেনাকাটা করা যাবে না; বিকাশে ভুয়া মেসেজ না বুঝেই টাকা ট্রানজেকশন করা যাবে না; সুরক্ষিত নয় এমন জায়গায় ক্রেডিট বা ডেবিট কার্ড রাখা যাবে না; ভুয়া আইডি ব্যবহার করা যাবে না এবং ভুয়া আইডি সম্পর্কে সচেতন থাকতে হবে; মাঝে মাঝে পাসওয়ার্ড পরিবর্তন করতে হবে; ফেসবুক ব্যবহারের পর অবশ্যই লগ আউট করতে হবে এবং সেই সাথে প্রতিটি একাউন্টে শক্তিশালী পাসওয়ার্ড ব্যবহার করতে হবে। তাহলেই আমরা সাইবার ক্রাইম এর হাত থেকে নিজেদেরকে রক্ষা করতে পারব।
সাইবার অপরাধের শাস্তি সংক্রান্ত একটি আইন সম্প্রতি বাংলাদেশে পাস করা হয়। এর নাম হলো ‘ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন-২০১৮’। এখানে কোন ধরনের সাইবার অপরাধের জন্য কি রকম শাস্তি প্রাপ্য তা স্পষ্ট উল্লেখ করা হয়েছে। তবে আইন থাকলেও অনেক সময় এর যথাযথ প্রয়োগ না হওয়ায় অপরাধের মাত্রা কমিয়ে আনা কিংবা অপরাধ বন্ধ করা সম্ভব হয় না। তাই এক্ষেত্রে প্রয়োজন ইন্টারনেট বা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার সংক্রান্ত জ্ঞান অর্জন করা ও সচেতনতা বৃদ্ধি করা।
সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের ইন্টারনেট বা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার সংক্রান্ত জ্ঞান থাকা একান্ত প্রয়োজন। এক্ষেত্রে বিভিন্ন প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তাঁদের ব্যবহারিক জ্ঞান ও সচেতনতা বৃদ্ধি করা যেতে পারে। বিশেষত মানুষ যদি নৈতিকতাবোধকে জাগ্রত রেখে ইন্টারনেট বা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করতে পারে তাহলে সাইবার অপরাধে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা কমে যায়। পরিশেষে তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার করে মানুষ বিশ্ব সরণির সঙ্গে যুক্ত হয়ে বুদ্ধিবৃত্তিক ও সৃজনশীল কর্ম বিতরণের ক্ষেত্র তৈরি করবে এবং তাদের জীবনমানের উন্নয়ন ঘটাবে। আর এ প্রযুক্তি ব্যবহারে জনসচেতনতাই এর সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে উঠতে সহায়তা করবে।
লেখক : কলামিস্ট
১৭.০৬.২০১৯


