পদ্মাপাড়ে দাঁড়িয়ে একবার নদীভাঙন দেখেছিলাম। ভাঙছে পদ্মা। এক বৃদ্ধের চোখ বেয়ে ঝরছে পানি আর পানি। নিজের ভিটেমাটি চোখের সামনেই গিলে খাচ্ছে পদ্মা। যতটা জায়গা নদী ভেঙে নিয়ে যায় ততটুকু পেছনে আসেন বৃদ্ধ। এ এক আজব অভিজ্ঞতা। মাটির প্রতি ভালোবাসা দেখে আমার খুব ভালো লেগেছিল। মুন্সিগঞ্জ থেকে ট্রলারে পার হয়ে চোখে পড়েছিল এ দৃশ্য। নদী একদিকে খায় অন্যদিকে চর তৈরি করে দিয়ে যায়। চর নিয়েও আবার মারামারির ঘটনা কম ঘটেনি। এসব নিয়ে দেশে নাটক-সিনেমাও নির্মাণ হয়েছে।
দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষেরা একসময় যখন ভাবতো, ‘এই পদ্মা যদি গাড়িচরে পার হওয়া যেত।’ তখন তাদের অজান্তেই খুশিচ্ছটা ঠিকরে পড়তো। একদিন পদ্মাসেতু হবে, লাখো লাখো মানুষের ভাগ্য উন্নয়ন ঘটবে। দেশের অর্থনীতির চাকায় হাওয়া লাগবে। দক্ষিণ-পশ্চিম অংশের সঙ্গে উত্তর-পূর্ব অংশের সংযোগ সৃষ্টি হবে। এ প্রত্যাশা দিন দিন বড় বেশি উচ্চকিত হয়ে উঠেছিল। মেঘনা নদীর উপর সৈয়দ নজরুল ইসলাম সেতু কত আগে হয়েছে। হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজার, সিলেট, সুনামঞ্জ এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার মানুষদের আর ট্রলারের অপেক্ষায় বসে থাকতে হয় না। দেশের চাকা কীভাবে ঘুরেছে সেটা হবিগঞ্জে ঢুকলেই সহজে বুঝা যায়। এ ছাড়াও দাউদকান্দি সেতু, বরিশালের কীর্তনখোলার উপর শহীদ আবদুর রব সেরনিয়াবাত সেতু, ঝালকাঠির গাবখান চ্যানেলে গাবখান সেতু, চট্টগ্রামের কর্ণফুলির উপর কর্ণফুলী সেতু, কালুরঘাট সেতু, শাহ আমানত সেতু, নারায়ণগঞ্জের শীতলক্ষ্যার উপর কাঞ্চন সেতু, সিলেটের সুরমার উপর তৎকালীন আসাম প্রদেশের গভর্নর মাইকেল ক্বীনের নামে ক্বীন সেতু, খুলনার রূপসার উপর খান জাহান আলী সেতু, বাগেরহাটের মধুমতির উপর দাড়াটানা সেতু, মুন্সিগঞ্জের ধলেশ্বরী সেতু, মেঘনা সেতু, মাদারীপুরের আড়িয়াল খাঁর উপর হাজি শরিয়তুল্লাহ সেতু নির্মাণে কী পরিমাণে বাংলাদেশে এগিয়েছে তা বলাবাহুল্য। কর্ণফুলিতে ঝুলন্ত সেতু নির্মাণকে কেন্দ্র করে আন্দোলন হয়েছিল। তবে খুব একটা দুর্নীতি নিয়ে কথা উঠেনি।
পদ্মাসেতু মূলত বাংলাদেশের পদ্মা নদীর উপর নির্মাণাধীন একটি বহুমুখী সেতু। এই সেতু দিয়ে যুগপৎভাবে যানবাহন ও ট্রেন চলাচল করবে। এর মাধ্যমে লৌহজং, মুন্সিগঞ্জের সঙ্গে শরিয়তপুর ও মাদারীপুর যুক্ত হবে, ফলে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিম অংশের সঙ্গে উত্তর-পূর্ব অংশের সংযোগ ঘটবে। পদ্মাসেতুর দৈর্ঘ্য হবে ৬ দশমিক ১৫ কিলোমিটার। দ্বিতলবিশিষ্ট এই সেতু নির্মিত হবে কংক্রিট আর স্টিল দিয়ে। যার ওপর দিয়ে যানবাহন আর নিচে দিয়ে ট্রেন চলবে। এই প্রথম বাংলাদেশে এ জাতীয় সেতু নির্মাণ করা হচ্ছে। পদ্মাসেতুর দৈর্ঘ্য ৬.১৫ কিলোমিটার, এটি তৈরির জন্য চুক্তিবদ্ধ হয়েছে চায়না রেলওয়ে গ্রুপ লিমিটেড নামক এক কোম্পানি। কাজটি ২৬ নভেম্বর ২০১৪ তে দেয়া হয়। এতে ব্যয়ের পরিমাণ হিসেবে ধরা হয় ১২,১৩৩.৩৯ কোটি টাকা। ডিসেম্বর ২০১৮ নির্মাণ শেষ হওয়ার কথা রয়েছে।
আশা ও আকাক্সক্ষার এই পদ্মাসেতুকে কেন্দ্র করে জলঘোলা কম হয়নি। সময়মতো পদ্মসেতু নির্মাণ কাজ সম্পন্ন হলে কীভাবে অগ্রসর হতো বাংলাদেশ তা এডিপি সমীক্ষায় স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। এডিবির এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, পদ্মাসেতু হলে আমাদের জিডিপি বেড়ে যেত ১ দশমিক ২ শতাংশ। বর্তমানে আমাদের জিডিপি ৭ দশমিক ১’র কাছে অবস্থান করে। পদ্মাসেতু হলে জিডিপি বেড়ে দাঁড়াবে ৮-৯ %।
পরিকল্পনা কমিশন সূত্রে গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য থেকে জানা যায়, ২০০৭ সালে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক) প্রায় ১০ হাজার ১৬২ কোটি টাকায় প্রথম পদ্মাসেতু প্রকল্পটি অনুমোদন করেছিল। ২০১১ সালে প্রকল্প প্রস্তাব সংশোধন করে ব্যয় নির্ধারণ করা হয় ২০ হাজার ৫০৭ কোটি টাকা। সেতু বিভাগ সূত্র জানায়, সরকারিভাবে এখনো ২০১১ সালে ধরা ব্যয়ই বহাল আছে।
সরকারের একটি সূত্র জানিয়েছিল, দুই কারণে সরকার এই প্রকল্পটিকে গুরুত্ব দিচ্ছে। প্রথমত, এর অর্থায়ন নিয়ে বিশ্বব্যাংকসহ দাতাদের সঙ্গে সরকারের তিক্ততার সম্পর্ক তৈরি হয়েছে। এটাকে সরকার চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়েছে। পাশাপাশি এর মাধ্যমে আন্তর্জাতিক বিশ্বের সামনে বাংলাদেশের সক্ষমতাকেও তুলে ধরতে চায় সরকার। দ্বিতীয়ত, আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারে এই প্রকল্পটি বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে ২০০৮ সালে। আগামী নির্বাচনে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষের কাছে রাজনৈতিকভাবে সরকার বিশেষ সুবিধা পাবে এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে।
হ্যাঁ, কাজ দেখাতে পারলে, পারফর্ম করতে পারলে দলে থাকা যায়। ক্রিকেট বলি আর ফুটবল বলি সর্বক্ষেত্রে পারফর্মের গুরুত্ব। আত্মীয়তা সম্পর্ক বা উপরের টেলিফোনে এ জাতীয় কোনো দলে থাকা টেকা যায় না। কারণ, ১৬ কোটি মানুষের চাপ নিয়ে, ৩২ কোটি চোখের সামনে থেকে পরীক্ষা দিয়ে এগিয়ে যাওয়ার সাহসিকতা আর ঘুমকাতুরে আলস্যের অলসতা এক জিনিস নয়। রাজনীতির মাঠেও যারা পারফর্ম করেন তারাও এই ষোল কোটি মানুষের চোখ এড়াতে পারেন না। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ তো সে ধারারই একটি দল। তারা চাইতেই পারে পদ্মাসেতু করে দক্ষিণাঞ্চলের লোকদের মধ্যে তাদের জনপ্রিয়তা আরও বাড়াবে। এটা স্বাভাবিক ঘটনা। এতে তো কারো মন খারাপের কথা নয়। এরকম সাবেক রাষ্ট্রপতি এরশাদের আমলে তিনিও সেরকম চেয়েছেন, বেগম খালেদা জিয়ার আমলে তিনিও উন্নয়ন করে জনপ্রিয়তা বাড়াতে চেয়েছেন। আর মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ দেশ চালাচ্ছেÑ তারা তো উন্নয়ন করে জনপ্রিয়তা বৃদ্ধির সুযোগ নেবেই। কিন্তু এসব দেখে কারো তো চুলকানী উঠার কোনো কারণ থাকতে পারে না। দায়িত্বজ্ঞানহীন কা- ঘটিয়ে বিশ্বব্যাংকের বিরুদ্ধে নিন্দার ঝড় উঠেছে বিশ্বজুড়ে। কারও কারও বিরুদ্ধে চক্রান্তের গন্ধও আবিষ্কৃত হয়েছে। একজন তো পদ্মাসেতু বিরোধিতাকারীদের সেতুর নিচে দিয়ে চলাচলের পরামর্শ দিয়েছেন। হাসি পেলেও কথা বাস্তবই। বিষয়টা অনেকটা এমন, ‘উন্নয়ন করবো না, উন্নয়ন করতেও দেবো না।’ পরশ্রীকাতর এসব লোকদের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগের অনেক নেতারাও কথা বলছেন উচ্চকিত কণ্ঠে। বিশ্বব্যাংক পদ্মায় ডুবুক আর যমুনায় ডুবুক তাদের বিরুদ্ধে যে কিছু করা যাচ্ছে না সেটাও প্রতিভাত হয়েছে মাননীয় আইনমন্ত্রীর বক্তব্যে।
স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় পাকিস্তানী এক আমলাকে ঢাকা শহরের এক গরু গুঁতো দিয়ে শিরোনাম হয়েছিলেন ‘চিনিল কেমনে’। দেশে বিশ্বব্যাংক নিন্দা কুঁড়িয়েছে সত্য। হয়তো সে পর্যায়ের কিছু হবে না। কিন্তু দুঃখবোধটা যে অনেক বছর হৃদয়ের কোণে আটকে থাকবে তা কিন্তু স্পষ্টতই বলা যায়। বাংলাদেশ যে বিশাল দক্ষ জনশক্তি লাভ করে পৃথিবীর উন্নয়নশীল দেশের কাতারে পৌঁছাবে না এমন কথা কেউ হলফ করে বলতে পারে না। এগিয়ে যাচ্ছে এবং কাক্সিক্ষত লক্ষ্যে পৌঁছাবেই ইনশাআল্লাহ। এখন তো প্রতিটি ‘মা’-এর ঘরেই যোগ্য হয়ে বেড়ে উঠছে সন্তান। তারাই তো ‘আরেকটা দিন সবুর করো, রসুন বুনেছি’র পর একদিন হাত নেড়ে নিজেদের উপস্থিতির জানান দেবে।
২০১১-এর ১২ অক্টোবর বুধবার তখনকার যোগাযোগমন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেন বলেছিলেন, বায়বীয় অভিযোগের ওপর ভিত্তি করে বিশ্বব্যাংক দুর্নীতির তদন্ত করছে। আমরা মনে করি না এর কোন সত্যতা পাওয়া যাবে। আমার হাসি পায়Ñ কিভাবে একটা অসত্য তথ্যের ওপর মানুষ কথা বলে আসছে।
আবুল হোসেন চ্যালেঞ্জ হিসেবে বলেছিলেন, ‘যারা পদ্মাসেতু নিয়ে অভিযোগ করেছেন আমি তাদের বলব অভিযোগের পেছনে এসে দাঁড়ান, অভিযোগ প্রমাণ করুন।’
অভিযোগকারীরা আদতেই পদ্মাসেতু নিয়ে যে অভিযোগ করেছিলেন তা প্রমাণে ব্যর্থ হয়েছেন। লোকচক্ষুর অন্তরালে থেকেই তারা গা ঢাকা দিয়েছেন। কিন্তু মাঝখানে যে বাংলাদেশের একটি স্বপ্নকে ঢিল মেরে একেবারে দু’বছর পেছনে ফেলে দিয়েছেন। সেখান থেকে আবার মাথা উঁচু করে দাঁড়াবার জন্য প্রধানমন্ত্রী যে সাহসী উদ্যোগ নিয়েছেন তা প্রশংসীয় তা নিশ্চিত করেই বলা যায়। নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মাসেতু করার উদ্যোগ গ্রহণ না করা হলে আরও ক’বছর পর যে পদ্মাসেতু হালে পানি পেত তা বলা মুশকিল।
একটা আশাজাগানিয়া আবেদন জানিয়েছেন সাবেক রাষ্ট্রপতি এ কে এম বদরুদ্দোজা চৌধুরী। তিনি সৈয়দ আবুল হোসেনকে আবার মন্ত্রিসভায় দেখতে চাচ্ছেন। বিষয়টি অবশ্যই ভাবনার। পদ্মাসেতু নিয়ে যতটা বাড়াবাড়ি করা হয়েছে সবই বিপক্ষে গেছে আবুল হোসেনের। নিজের সম্মান রক্ষা করারটা হয়ে গেছে বিপজ্জনক। নিজের সবটুকু ভালো জেনেও তাকে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়াতে হয়েছে। অবশ্যই তাকে যথাযথ মূল্যায়ন করা উচিত।
পদ্মাসেতু নিজের মতো করে মাথা উঁচু করে দাঁড়াচ্ছে। আর কেউ তাকে আটকাতে পারবে না। কোনো দস্যুতা, কোনো অন্যায় ষড়যন্ত্র, কোনো ঘৃণ্য প্রক্রিয়ার আর কাজে আসবে না। পদ্মাসেতুর সঙ্গে সঙ্গে সমগ্র বাংলাদেশের অগ্রগতি ও সমৃদ্ধি আরও উজ্জ্বল ও আলোকময় হবে। অর্থনৈতিকভাবেও দেশ এগিয়ে যাবে তা হলফ করেই বলা যায়।
লেখক : শিক্ষক ও সাংবাদিক


