আমার লেখালেখি এবং ইসহাক ফরিদী রহ.
সারওয়ার আলম ভূঈয়া : অপলক তাকিয়ে আছি দোয়ালিকাটির দিকে।বুঝেই আসছিল না কিভাবে মানুষ এত সুন্দর করে লিখে।মাদরসার ছাত্ররা এত সুন্দর – সাবলীল-প্রাঞ্জল ভাষায় লিখতে পারে!? কিছু কিছু লিখায় শব্দের যে সমাহার,ভাষার যে ঝংকার এত চমৎকার,বলে শেষ করা যাবে না।মুগ্ধের মতো আমি পাঠোদ্ধার করার চেষ্টা করি লিখার প্রতিটি শব্দের অর্থ।কিছু বুঝি কিছু বুঝি না।কিছু কিছু ছাত্রের হাত ও লিখা এত পাকা, ভাবতেও অবাক লাগে।আরবী ও বাংলা সাহিত্যে হাত পাকানোর জন্য দেয়ালিকা প্রকাশ করা হয়।
ছোট গল্প, প্রবন্ধ, কবিতা, জোকস কি নেই এ দেয়ালিকাটিতে। হেংলার মতো তাকিয়ে থাকি, চোক ফেরাতে ইচ্ছা হয় না।প্রতিটি লিখাই পড়তে ইচ্ছা হচ্ছে।দেয়ালিকাটির সামনে দিয়ে যখনই যাচ্ছি, কিছু সময় দাঁড়াচ্ছি, পড়ছি। এখন কবিতাটি পড়ছি তো বাদ আছর পড়ছি গল্প।প্রবন্ধের কিছুই মাথায় ঢুকে না।অনেক শব্দের সঠিক মর্মার্থ উপলদ্ধি করতে পারি না।
ঢাকা জামেয়া চৌধুরী পাড়া (মাদরাসার) তদানিন্তন মুহতামীম (প্রিন্সিপাল) মাওলানা মুহাম্মদ ইসহাক ফরিদী রহ. বিষয়টি খেয়াল করলেন।প্রিন্সিপাল এর হুজরার কাছাকাছি সিড়িতে “দেয়াল পত্রিকা” টানানোর নিদ্ধারিত স্থান।হাঁটা চলার পথেই বলা যায়।
প্রিন্সিপাল সাহেব হুজুর একদিন আমাকে ডেকে জিজ্ঞেস করলেন, নিজে লিখতে পারিস না? দেয়ালিকায় লিখা দিতে পারিস না? হাতের ইশারায় কাছে ডাকলেন।মাথাটা এগিয়ে দিলাম, মাথায় আদর আর স্নেহের পরশ বুলিয়ে কান টেনে ধরলেন, বললেন, লিখার জন্য চেষ্টা করতে হবে।লাজনা করিস, লিখতে পারিস না; এটা কি হয়!
গত সেমাহী পরিক্ষায় (প্রথম সাময়ীকিতে) রেজাল্ট কী? বিস্তারিত জেনে বললেন, গড়ে ৭০-এর উপরে আছে তো প্রতিটি বিষয়ে? বল্লাম; জ্বী…..
এখন থেকে দেয়ালিকার প্রতিটি সংখ্যায় তোকে লিখতে হবে। লিখার জন্য তোকে যা যা করতে হবে,
( ১) রোজনামচা লিখতে হবে প্রতিদিন।
(২) প্রতি দিন কিছু সময় ক্লাসের পড়াশোনার বাইরেও বাংলা পড়তে ও লিখতে হবে।
(৩) স্কুলের বাংলা ব্যাকরণ বইগুলো পড়তে হবে।
(৪) নিজের দরসি কিতাবে যেভাবে এবারতে সকল শব্দের তরজমা করে, নতুন শব্দগুলোর লোগাত বা ডিকশনারী দেখে এর সঠিক অর্থ জেনে নিতে হয়, বাংলাও সেভাবে করে নিতে হবে।
আমি বাংলা নিয়ে ভাবতে শুরু করলাম।ক্লাসের পড়ার পাশাপাশি লিখতে-পড়তে শুরু করলাম।শান্তি নগরে “তমুদ্দুন মজলিশের” সাহিত্যসভায় ও যাওয়ার চেষ্টা করতে লাগলাম।
কওমী মাদরাসার ছাত্রদের যুগোপযোগি ওয়ারিসে নবী হিসাবে গড়ে উঠার জন্য “লাজনাতুত্ তালাবার” নামে যে সংগঠন গড়ে উঠেছে, সে সংগঠন এর সাহিত্য সভায়ও উপস্থিত থাকার চেষ্টা করলাম।আমার দ্বারা মান সম্পন্ন কোন লেখাই তৈরী করা সম্ভব হয়ে ওঠেনি।
বড়কাটারা মাদরাসায় পড়াকালীন বিশিষ্ট লেখক, ছড়াকার, বারিধারা মাদরাসার মুহাদ্দিস মাওলানা আবু সালেহ সাহেবের কাছে তাঁর মসজিদে যেয়ে স্বরবর্ণ- ব্যঞ্জনবর্ণসহ বেশ কিছু বাংলা লিখার পদ্ধতি শিখে ছিলাম।বাংলা সাহিত্যের প্রতি একটা অনুরাগ- দুর্বলতা তৈরী হয়েছিল।সে অনুরাগ দিয়ে কিছুটা লিখতে শিখেছিলাম।
বাংলা লিখায় হাত পাঁকানোর জন্য মাদরাসার দেয়ালিকায় লিখা আহ্বান করার পর আমার কিছুটা প্রচেষ্টা শুরু হতো একটা লেখা তৈরীর জন্য।লেখাটা শুরুর পর একটা হীনম্মন্যতায় পড়ে যেতাম।শেষ করার পর আর জমা দিতে ইচ্ছা হতো না।আল্লামা ইসহাক ফরিদী রহ. দফতরে ডেকে বলতেন, তোর লিখা কই? বলতাম, লিখেছি তবে কিছুই হয়নি।
দরদী প্রিন্সিপাল দরদমাখা কণ্ঠে বলতেন ‘নিয়ে আয়’।সম্পাদনা ও ঘষা-মাজা করে আমাদের ক্লাসের এনাম অথবা মুজাহিদের হাতে দিতেন।এনামের হাতের লিখা ছিল অসাধারণ সুন্দর।ওর হাতেই পুরা দেয়ালিকা লিখা হতো।এনামুল হক বর্তমানে আল- আরাফা ইসলামী ব্যাংক এর এস পি ও।প্রধান শাখায় কর্মরত।আর মুজাহিদ হোসাইন ইয়াছিন শুনেছি সমকাল বা যুগান্তর পত্রিকায় লিখা লিখি বা সাংবাদিকতার কাজ করে।পুরা দেয়ালিকাটা ওরা দুজন লিখে মুক্তার মতো করে ফেলতো।
প্রায় প্রতি সংখ্যায়ই আমার কবিতা /গল্প/ প্রবন্ধ যেত।সে বছর বার্ষিক স্মারকেও একটা লিখা গিয়েছিল।একটা সময়ে আমার কাছে মনে হয়েছে,লিখা-লিখি দিয়ে একটা গল্প কবিতাই লিখা যায় জীবন চলে না।আমার হীনমন্যতায় আমি পিছিয়ে গেলাম।আমাকে দিয়ে তেমন কোন লিখা লিখি হলো না।
এগিয়ে গেলেন আল্লামা ইসহাক ফরিদী রহ.- এর মত প্রতিথযশা মুহতামীম, শাইখুল হাদীসরা।যারা এ দেশের অসংখ্য ছাত্রের হাতে কলম তুলে দিয়ে হাতেখড়ি দিয়েছিলেন।লিখতে শিখিয়ে ছিলেন।লেখক বানিয়ে ছিলেন এ দেশেরঅসংখ্য আলীম উলামাকে। আমার বর্তমান বয়োসের মতো বয়োসে তিনি দুনিয়ার সফর শেষ করেছেন (০৫.০৬.২০০৫)।তার পরেও হুজুরের লিখা পুস্তকের সংখ্যা প্রায় ৭০টি।মানুষ ও নায়েবে নবীদের কে শিখানোর চেষ্টা করেছেন,কিন্তু সে চেষ্টার ফল পেয়েছেন তিনি নিজে।অন্যের উপকার করার চেষ্টা করলেই, সে চেষ্টার ফল নিজের মধ্যে প্রতি ফলিত হয়।আমার মতো পরগাছার অভিব্যক্তি এটি।
আমাকে লেখালেখি শেখানোর বিনিময়ে আল্লাহ তুমি আল্লামা ইসহাক ফরিদী রহ.কে জান্নাতের উঁচা মাকাম দান কর।
লেখক : আল্লামা ইসহাক ফরিদী রহ.-এর একজন শিষ্য


