হৃদয়ের চোখ প্রসারিত হোক বন্ধুদের

হৃদয়ের চোখ প্রসারিত হোক বন্ধুদের

হৃদয়ের চোখ প্রসারিত হোক বন্ধুদের

মাওলানা আমিনুল ইসলাম : কওমী অঙ্গনে একজন লেখক বন্ধু আছেন, যিনি আমার পাশেই থাকেন। কলমে ধার কম নয়। ভালই লেখেন। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, তিনি মনে হয় চোখে দেখেন না। চর্ম চোখ খোলা থাকলেও অন্তর চক্ষু মনে হয় আজো খোলেনি। যার কারণে হক পন্থী আলেম, দারুল উলূম দেওবন্দের সূর্য সন্তানদের তার কাছে বাতিল মনে হয়।

ঐ বন্ধুর ইশকাল দেওবন্দের মাহমুদ মাদানীকে নিয়ে। মারকাজুদ্দাওয়ার আব্দুল মালেক সাহেবকে নিয়ে, তার ইশকাল আল্লামা তকী উসমানীকে নিয়ে। তার অভিযোগ আল্লামা ফরীদ উদ্দীন মাসঊদ সাহেবকে নিয়ে, তার আরো বড় অভিযোগ চরমোনাইকে নিয়ে। বিশেষ করে চরমোনাই এর নায়েবে আমীর সৈয়দ ফয়জুল করীম সাহেবের উপর তার যেন ক্ষোভ একটু বেশী।

মানে হক পন্থী যত আলেম আছে, সকলের বিরুদ্ধে তার অভিযোগ। তার লিখনী আর বক্তৃতা থেকে আর কেউ বাদ পড়েন না।

আমি বুঝি না আমার ঐ বন্ধু কি চায়। তিনি কিন্তু আমাদের কওমীর সন্তান। কওমী মাদ্রাসার আলো বাতাসে বড় হয়েছেন। এখন তিনি কওমীর বিরুদ্ধে কলম চালাচ্ছেন। ওলামায়ে দেওবন্দের উপর তার কলমের তীর ছুড়ে মারছেন।

তবে আমার মনে হচ্ছে, তিনি চোখ থাকতেও অন্ধ। চোখ আছে ঠিকই, কিন্তু ঐ চোখ দিয়ে এখনো দেখতে পারছেন না। তার কাছে হকপন্থী আলেমদের বাতিল মনে হয়, এটা তো বড় দুঃখজনক কথা।

ওলামায়ে দেওবন্দের সূর্য সন্তানদের যার কাছে বাতিল মনে হয়, গোমরাহ মনে হয়, নিশ্চয়ই তিনি নিজেই বড় গোমরাহীর মধ্যে আছেন তাতে কোন সন্দেহ নেই।

আসলে কথা কি? কুয়ার ব্যাঙ কি কখনো সমুদ্রের খবর রাখে?

যে কুয়ার ব্যাঙ সারা জীবন দশ বার হাত কুয়ার পানির মধ্যে জীবন কাটালো, তার কি সমুদ্রের উত্তাল- তরঙ্গের কি খবর আছে? সমুদ্রের গভীরতা, সমুদ্রের ঢেউ, সমুদ্রের বিশালতা সম্পর্কে কি কোন জ্ঞান থাকতে পারে?

যার মাদ্রাসার চৌহদ্দির মধ্যে কাটানো অভ্যাস, শুধু মাদ্রাসার গণ্ডির মধ্যে জীবন কাটালেন, তিনি ওলামায়ে দেওবন্দের মহারথীদের ব্যাপারে কি খবর রাখেন?

যারা কোনদিন সমুদ্র দেখা হয়নি, সমুদ্রের জলরাশি দেখা হয়নি, সমুদ্রের উত্তাল- তরঙ্গ দেখা হয়নি, সে কি কোনদিন সমুদ্র সম্পর্কে কোন বয়ান করতে পারবে?

দেওবন্দী হালকার বড় বড় আলেমদের সাথে উঠা বসা না করে, সে কিভাবে ওসব মহা পণ্ডিতদের সস্পর্কে জানবে? কোন খাঁটি মানুষের সোহবতে না গিয়ে নিজের মত করে যারা ইসলাম বুঝতে চাইবে, সে কি কখনো সোজা পথে চলতে পারে?

মওদুদী সাহেব কিন্তু কোন ছোট-খাঁটো লেখক ছিলেন না। তার কলমেও কিন্তু সাংঘাতিক ধার ছিল। তারপরেও কিন্তু মওদুদী সাহেবকে হকপন্থী আলেমগণ গোমরাহ বলেছেন। কারণ, তিনি শুধু বেপরোয়াভাবে কলম চালিয়েছেন। আলেম – উলামাকে তাচ্ছিল্যের চোখে দেখেছেন সব সময়। নিজের ইচ্ছে মত যা খুশি তাই লিখেছেন, কোন কিছু তোয়াক্কা করেন নি। আর এ কারণে মওদুদী সাহেবের ভুল- ত্রুটি হয়েছে বে -শুমার। আরো বেশী সমস্যা ছিল তার, আলেমগণ মওদুদী সাহেবের ভুলত্রুটি ধরে দিলে, সে কখনো শোধরানো চেষ্টা করেনি।বরং তার লেখনির উপর তিনি অটল থেকেছেন। এ কারণে মওদুদী সাহেব আরো বেশী গোমরাহীর দিকে ধাবিত হয়ে ছিলেন।

আপনিও কিন্তু সেই মওদুদী সাহেবের পথ অবলম্বন করেছেন। নিজের ইচ্ছেমত যা খুশি লিখে যাচ্ছেন। আর উলামায়ে কেরাম সম্পর্কে বিষোদগার করতে কোন দ্বিধাবোধ হচ্ছেনা আপনার।

আরো সমস্যা হলো, দেওবন্দী হালকার যে সব উলামাদের নিয়ে আপনার অভিযোগ, এঁদের বাদ দিলে, তাহলে আর বাকি থাকল কে?

আমাদের এই বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান যে সব আলেম দের মানুষ অনুসরণ করে, সে সব আলেমদের নিয়েই আপনার যত অভিযোগ। তাহলে আপনি কার অনুসরণ করেন? আপনার মুরুব্বী কে?

এ কথার জওয়াব আপনার হয়ত নেই। যদিও আপনি উত্তর দেন, তবে এমন মানুষের নাম বলবেন, যাকে আলেম সমাজ গোমরাহ বলেন। আপনার সে মুরুব্বী আলেমদের জামাত থেকে বহিষ্কৃত। কোন আলেম তাকে সমর্থন করে না।

ঠিক আপনার মুরুব্বীর যে দশা আপনারও একই দশা। তিনিও আলেম সমাজ থেকে অনেক দুরে, ঠিক আপনিও সেই পথে হাঁটছেন।

সাইয়্যেদ মাহমুদ মাদানী হলেন, কুতুবুল আলম সাইয়্যেদ হুসাইন আহমাদ মাদানীর দৌহিত্র। ফেদায়ে মিল্লাত সাইয়্যেদ আসআদ মাদানীর সাহেবজাদা।

মাহমুদ মাদানী স্বীয় বাপ- দাদার পদাঙ্ক অনুসরণ করে চলেছেন। যেরকম চলেছেন তাঁর দাদা, যে রকম চলেছেন তার পিতা, ঠিক সে রকমভাবে পা ফেলছেন তিনি। একদম বাপ- দাদার বাতলানো পথে অবিচল রয়েছেন।

ভারতের চল্লিশ কোটি মুসলমানের রাহবার তিনি। সুখে দুঃখে সময় তাদের পাশে। শুধু ভারত নয়, সারা বিশ্বের মুসলমানের দুঃসময়ে মাহমুদ মাদানীকে দেখা যায়।

সাইয়্যেদ হুসাইন আহমাদ মাদানী কে ছিলেন, সেটা কিন্তু আপনার অজানা নয়। তাঁর অবদান কি ছিল? সেটাও কিন্তু আপনি জানেন।

এমনি ভাবে ফেদায়ে মিল্লাত কে ছিলেন? তাঁর কি অবদান, এটাও আপনার অজানা নয়।

এত কিছুর পরেও আপনি ঐ সকল মানুষের একনিষ্ঠ অনুসারীকে গোমরাহ বলে সাব্যস্ত করছেন, যেটা খুবই দুঃখজনক।

আর আল্লামা মাসঊদ সাহেবের ব্যাপারে আর কি লিখব? এক ঈর্ষান্নিত মানুষগুলো তাঁর বিরোধিতা করতে পারে। কেননা, আল্লামা মাসউদ সাহেবের যে ইলমী মাকাম, তাঁর ইলমী যোগ্যতা, তাঁর দক্ষতা, মাসউদ সাহেবের শত্রুরাও স্বীকার করে। এক বাক্যে মেনে নেয় তিনি একজন প্রতিভাবান আলেম।
এরপর আল্লামা মাসঊদ সাহেব ফেদায়ে মিল্লাত রহ.-এর একজন বিশিষ্ট খলিফা। সুলুকের লাইনে বিশাল দখল রয়েছে।

আল্লামা ফরীদ উদ্দীন মাসঊদ সাহেব নিজ দেশের সীমানা পেরিয়ে এখন বিশ্ব মুসলিমের মাঝে খ্যাতি লাভ করেছেন। এখন তিনি বিশ্ব বিখ্যাত ইসলামী স্কলার। যার প্রসংসা শোনা যায়, বিশ্ব বিখ্যাত মানুষদের থেকে।

আর চরমোনাই কি জিনিস, তাদের কি কার্যক্রম, তারা গোমরাহ না সহী পথ আঁকড়ে আছেন। এ ব্যাপারে তো দারুল উলূম দেওবন্দের কাছে আপনি জানতে পারেন। আমাদের বাংলাদেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপিঠ হাটহাজারী থেকে ফতোয়া নিতে পারেন।

প্রতি বছর দারুল উলূম দেওবন্দের আলেমদের একটা জামাত চরমোনাইতে আসেন। তারা বয়ান করেন চরমোনাইয়ের ময়দানে।

এমনি ভাবে হাটহাজারী থেকে আলেমগন আসেন। ঢাকা সহ বাংলাদেশের হাজারো আলেম এখন চরমোনাই মুখী।

দেওবন্দ, হাটহাজারী এবং বাংলাদেশের কোন প্রতিষ্ঠানের কেউ আজ পর্যন্ত ফতোয়া দিতে পারেনি চরমোনাই গোমরাহ।বরং সবাই হক বলে থাকেন। কিন্তু একমাত্র আপনাকেই পেলাম, যিনি চরমোনাই নিয়ে নাক গলায়ে থাকেন।

এমনিভাবে এরকম বহু আলেম- উলামা সম্পর্কে আপনার অভিযোগের শেষ নেই। আপনার লিখনী হক পন্হী আলেমদের নিয়ে।

বড় আফসোস! আপনার জন্য। আপনার আজো সুমতি হলো না। হককে হক বলে জানতে পারলেন না। আর বাতিলকে বাতিল বলে চিনতে পারলেন না।
হে আল্লাহ! তুমি হককে হক বোঝার, এর অনুসরণ এবং বাতিলকে বাতিল হিসেবে চেনার এবং তা থেকে পরহেজ থাকার তাওফিক দাও। আমিন।

লেখক : শিক্ষক ও সমাজ বিশ্লেষক

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *