এই সময়। ম. জাভেদ ইকবাল
শিশুশ্রম নিরসনে সমন্বিত উদ্যোগ
মনির খুলনার একটি রেস্টুরেন্টে কাজ করে। তার বয়স ১৪ বছর। সকাল আটটা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত তাকে রেস্টুরেন্টে কাজ করতে হয়। রেস্টুরেন্টে আগতদের খানা পরিবেশনের পাশাপাশি থালা-বাসন পরিস্কারের কাজটিও তাকে করতে হয়। বার বার পানির সংস্পর্শে আসার কারণে দু’হাতের আঙুলের ফাঁকে সাদা ফাঙ্গাস জন্মেছে তার। চিকিৎসক বলেছেন, হাত শুকনো রাখতে না পারলে এই ক্ষত সারবে না। মনিরদের গ্রামের বাড়ি খুলনার কয়রা উপজেলার প্রত্যন্ত অঞ্চলে। গত আইলা ঝড়ে নদীর ভাঙনে তাদের ভিটেবাড়ি ভেসে গেছে। মনিরের বাবা উদ্বাস্তু হয়ে খুলনা শহরে এসে এখন রিক্সা চালায়, মা বাসা-বাড়িতে ঝিয়ের কাজ করে। ছোট বোনটি স্কুলে অনিয়মিত। বোনটির বয়স ১২/১৩ বছর।
আইলার আগে মনির স্কুলে নিয়মিত ছিল। ঘূর্ণিঝড় আইলা মনিরদের সব স্বপ্ন ভাসিয়ে নিয়ে গেছে। নিতান্ত বাধ্য হয়েই মনিরের বাবা তাকে রেস্টুরেন্টের কাজে লাগিয়েছে উপার্জনের জন্য। তার মতো এমন অনেক শিশু খুলনা শহরে আছে যারা মনিরের চাইতে আরও ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োজিত। ঝুঁকিপূর্ণ কাজের মধ্যে আছে হিমায়িত চিংড়ি প্রক্রিয়াজাতের কাজ, গাড়ির ব্যাটারিতে এসিড ভরানোর কাজ, বেকারি শিল্প, জন পরিবহণ খাত, ওয়েল্ডিং কারখানাসহ অন্যান্য কাজ। শুধু অভাব অনটনের কারণেই এসব শিশুদের বাবা-মায়েরা তাদেরকে শুধু অর্থ উপার্জনের জন্য শ্রমকাজে নিয়োগ দিয়েছেন।
শিশুশ্রম নিরসনে সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। বাংলাদেশ শ্রম আইন, ২০০৬-এ নির্দিষ্টভাবে বলা হয়েছে, কারা শিশু। এখানে বলা আছে, ১৪ বছরের নিচে কোনো শিশুকে কাজে নেওয়া যাবে না। ১৪ থেকে ১৮ বছর পর্যন্ত শিশুদের কাজে নেওয়া যাবে, তবে ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নয়। আমাদের শিশুশ্রম নীতি, ২০১০ বাস্তবায়ন করার লক্ষ্যে জন্য বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও উন্নয়ন সহযোগীদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করে জাতীয় কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। বাসায় যারা কাজ করে, তাদের কল্যাণের জন্য একটা নীতিমালা করা হয়েছে। শিশুদের জন্য সব কাজই ঝুঁকিপূর্ণ। তারপরও ৩৮টি কাজকে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। এই ৩৮টি কাজে শিশুদের কোনোভাবেই নিয়োগ করা যাবে না।
শিশুশ্রম নিরসনে জাতিসংঘ প্রণীত সব সনদে বাংলাদেশ অনুস্বাক্ষর করেছে। শিশুশ্রম নিরসনের জন্য কতগুলো পদক্ষেপ ঠিক করা হয়েছে। এগুলোর মধ্যে রয়েছে নীতির প্রয়োগ, শিক্ষা, পুষ্টি ও স্বাস্থ্য, সামাজিক সচেতনতা, গবেষণা, প্রশিক্ষণ ইত্যাদি। জাতীয় পরিকল্পনার মধ্যে এগুলো অন্তর্ভুক্ত করে শিশুশ্রম দূর করা হচ্ছে। এক্ষেত্রে চারটি কমিটি কাজ করছে। ন্যাশনাল চাইল্ড লেবার ওয়েলফেয়ার কমিটি; যার প্রধান হলেন মাননীয় শ্রম প্রতিমন্ত্রী। বিভাগীয় চাইল্ড লেবার ওয়েলফেয়ার কমিটি যার প্রধান বিভাগীয় কমিশনার; জেলা শিশু অধিকার ফোরাম; যার প্রধান জেলা প্রশাসক এবং উপজেলা চাইল্ড লেবার মনিটরিং কমিটি; যার প্রধান হলেন উপজেলা নির্বাহী অফিসার। সরকারের সঙ্গে আইএলও, এনজিওসহ বিভিন্ন সংস্থা কাজ করে এ উদ্যোগকে বিভিন্নভাবে সমর্থন করে যাচ্ছে। শিশুশ্রম নিরসন করাই এর মূল লক্ষ্য। শিশুশ্রম নিরসনে সরকার ২০১০ সালে শিশুশ্রম নিরসন নীতিমালা এবং গৃহকর্মী সুরক্ষায় ২০১৫ সালে গৃহকর্মী সুরক্ষা ও কল্যাণ নীতি প্রণয়ন করেছে, যা শিশুশ্রম নিরসনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
শিশুদের জন্য শিশু বাজেটের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। এক লাখ শিশুকে শ্রম থেকে ফিরিয়ে আনার জন্য শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় ২৮৪ দশমিক ৪৯ কোটি টাকা ব্যয়ে একটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। জাতীয়, বিভাগীয়, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে গঠিত সংশ্লিষ্ট কমিটিসমূহ শিশুশ্রম নিরসনে কাজ করছে। সেই সঙ্গে কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের ২৩টি আঞ্চলিক কার্যালয় সারা দেশে শিশুশ্রম নিরসনে দায়িত্ব পালন করছে।
শ্রম পরিদর্শন বিভাগকে আরও শক্তিশালী করা হয়েছে। আগে এ বিভাগের জনবল ছিল ৩৪ জন। এখন ৯০০ জনে উন্নীত করা হয়েছে। শিশুশ্রম নিরসনে অগ্রগতির হার আশাব্যঞ্জক। ভবিষ্যতে এক্ষেত্রে আরও সাফল্য আসবে। যেসব কারখানা কমপ্লায়েন্স মেনে চলে, তাদের কোনো শিশুশ্রম নেই। কিন্তু অনেক ছোট কারখানা আছে, যারা কমপ্লায়েন্স মেনে চলে না, সেখানে এখনো শিশুশ্রম আছে। এসব শিশু তাদের ন্যায্য পাওনা পায় না।
পোশাকশিল্পের ছোট কারখানা ছাড়াও অনেকে ট্যানারি, চামড়া ও জুতার কারখানা, যানবাহনে ভিক্ষাবৃত্তিসহ বিভিন্ন জায়গায় কাজ করে। এদের কর্মক্ষেত্র ও কাজ অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। এসব কাজে তাদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশ ভীষণভাবে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। কিছু মালিক আছেন, যারা কম পয়সায় বেশি মুনাফা করতে চান। এরা বেশি বেতন দেওয়ার ভয়ে বড়দের কাজে না লাগিয়ে শিশুদের দিয়ে কাজ করান। এসব মালিকের বিরুদ্ধে শাস্তির ব্যবস্থা করা প্রয়োজন।
জাতীয় শিশুশ্রম সমীক্ষা ২০১৩ অনুযায়ী কর্মরত শিশু, শিশুশ্রম, ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রমের আলাদা আলাদা সংজ্ঞা রয়েছে। ১৮তম শ্রম পরিসংখ্যানবিদদের আন্তর্জাতিক সম্মেলন, বাংলাদেশ শ্রম আইন, ২০০৬ এবং ২০১৩-এর সংশোধনী অনুসারে কর্মরত শিশু বলতে বোঝায়, ১২ থেকে ১৭ বছর বয়সী শিশুদের মধ্যে যারা সপ্তাহে ৪২ ঘণ্টা পর্যন্ত হালকা পরিশ্রম বা ঝুঁকিহীন কাজ করে। এ শ্রম অনুমোদনযোগ্য। তবে পাঁচ থেকে ১১ বছর বয়সী কোনো শিশু যদি কোনো ধরনের ঝুঁকিহীন কাজও করে, তবে তা শিশুশ্রম হবে। তারাও কর্মরত শিশুদের মধ্যে পড়ে পাঁচ থেকে ১৭ বছর বয়সী কেউ যদি সপ্তাহে ৪২ ঘণ্টার বেশি কাজ করে, তা ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রম হিসেবে স্বীকৃত। প্রায় এক দশকের ব্যবধানে কর্মরত শিশুর সংখ্যার পাশাপাশি শিশুশ্রম অর্ধেকে নেমে এসেছে।
সমীক্ষায় আরো বলা হয়েছে যে, বাংলাদেশে এখন সাড়ে ৩৪ লাখ শিশু কর্মরত রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ১৭ লাখ শিশু রয়েছে, যাদের কাজ শিশুশ্রমের আওতায় পড়েছে। বাকি শিশুদের কাজ অনুমোদনযোগ্য। কর্মরত শিশুদের মধ্যে ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োজিত আছে ১২ লাখ ৮০ হাজার জন শিশু। আর দুই লাখ ৬০ হাজার শিশু অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োজিত। তাদের কাজের বৈশিষ্ট্য জীবন ও স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত হুমকিস্বরূপ। বিবিএসের ২০০৩ সালের জাতীয় শিশুশ্রম সমীক্ষায় দেখা গেছে, তখন প্রায় ৭৪ লাখ কর্মরত শিশু ছিল। জরিপে আরো দেখা গেছে, বাংলাদেশে ১৮টি খাতে ১৬ লাখ ৯৮ হাজার ৮৯৪ জন শিশু ‘শিশুশ্রমে’ নিয়োজিত রয়েছে। তাদের মধ্যে সাত লাখ ৪৫ হাজার ৬৯০ জন মেয়েশিশু। শিশুশ্রম বেশি দেখা গেছে কৃষিক্ষেত্রে ও কলকারখানায়। তবে সরকারের নানামুখী গৃহীত কর্মসূচির ফলে ইতোমধ্যে শিশুশ্রম অনেকখানি কমেছে।
শিশুশ্রমিকদের মজুরিও বেশ কম। প্রায় সাত লাখ শিশু কোনো মজুরি পায় না। থাকা-খাওয়ার বিনিময়ে তারা কাজ করে থাকে। মজুরি পায় সব মিলিয়ে ১০ লাখ ১৯ হাজার শিশু। তিন লাখ ৮৮ হাজার ১৪২ জন শিশু মাসে পাঁচ থেকে সাড়ে সাত হাজার টাকা মজুরি পায়। আড়াই থেকে পাঁচ হাজার টাকা মজুরি পায় দুই লাখ ৮৪ হাজার ৪২৩ জন শিশু। প্রায় এক লাখ শিশু আড়াই হাজার টাকার কম পায়। সাড়ে সাত হাজার টাকার বেশি মাসে মজুরি পায় আড়াই লাখ শিশু।
টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে সরকার শিশুশ্রম নিরসনের বিষয়টি গুরত্বের সঙ্গে বিবেচনায় নিয়েছে। শিশুশ্রম নিরসনে চাই সকলের সমন্বিত উদ্যোগ।
দরিদ্রতাই যেহেতু শিশুশ্রমের অন্যতম কারণ, তা দূরীকরণে কারিগরি শিক্ষাকে প্রাধান্য দিতে হবে। এজন্য আরও কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা প্রয়োজন, যাতে করে শিশুরা কারিগরি জ্ঞান লাভ করে সহজে কর্মসংস্থানের সুযোগ পায়। সুফল পেতে এলাকাভিত্তিক কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করা যেতে পারে। ইতোমধ্যে সরকার আগামী ২০২১ সাল হতে ষষ্ঠ থেকে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত কারিগরি শিক্ষাকে বাধ্যতামূলক করার পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে, যা শিশুশ্রম নিরসনে অত্যন্ত কার্যকর হবে। প্রাথমিক বিদ্যালয়ে এখন শিশুদের ভর্তির হার শতভাগ।
সরকার প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষাকে অবৈতনিক করেছে। প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ২০২৩ সালের মধ্যে মিডডে মিল চালুর যে নীতিমালা তৈরি হয়েছে, তা বাস্তবায়িত হলে স্কুলে ঝরে পড়ার হার অনেক হ্রাস পাবে। এর ফলে শিশুশ্রমও কমবে। কোথায় কোথায় শিশুশ্রম হচ্ছে তাও খুঁজে বের করতে হবে। গণমাধ্যমে এ বিষয়ে বেশি বেশি প্রচার করা দরকার।
বিভিন্ন ধরনের নাটক, সিনেমা ও গানের মাধ্যমে শিশুশ্রমের কুফল প্রচার করা যেতে পারে। দরিদ্র শিশুদের অভিভাবকদের আইনগুলোর প্রয়োগও বাড়ানো প্রয়োজন। জেলা, উপজেলা ও গ্রামের বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের নিয়ে গঠিত কমিটির অনুরূপ কমিটি তৈরি করে শিশুশ্রম ও বাল্যবিয়ে নিরসনে সচেতনতা তৈরি করা যেতে পারে। কারখানার মালিক সমিতির সকলকে শ্রম আইন মেনে চলতে বাধ্য করানো প্রয়োজন। সমাজের সকলে যার যার অবস্থানে থেকে সচেতনতা বাড়াতে পারলে এবং সমাজের অগ্রগতির জন্য এগিয়ে আসলে শিশুশ্রম নামক ব্যধিটি দূরীভূত হবে।
লেখক : কলামিস্ট


