শিশুর ফাঁকিবাজি প্রবণতা ও করণীয়

শিশুর ফাঁকিবাজি প্রবণতা ও করণীয়

সচেতনতা। আবুল কালাম বিশ্বাস

শিশুর ফাঁকিবাজি প্রবণতা ও করণীয়

নয়নের বাবা নয়নকে কোচিং ফি বাবদ প্রতিমাসে চার হাজার টাকা করে দেন। গত মাসে কোচিং এর পরিচালক ফোন করে নয়নের বাবাকে জানান নয়ন এ মাসে এক হাজার টাকা কম জমা দিয়েছে। সে বলেছে, বাবার একটা সমস্যা হয়েছে, তাই এ মাসে ৪ হাজার টাকা জমা দিতে পারবে না। বিষয়টি তাকে অবগত করার জন্য ফোন করা হয়েছে! নয়নের বাবা খুবই অবাক হয়ে নয়নকে জিজ্ঞেস করলে সে তা অস্বীকার করে এবং জানায় সে পুরো টাকাই কোচিংয়ে জমা দিয়েছে।

অবশেষে নয়নকে সরাসরি কোচিংয়ে নিয়ে যেতে চাইলে সে স্বীকার করে এবং বলে তার এক বন্ধুর বার্থডেতে একটা গিফট দেয়ার জন্য সে এক হাজার টাকা খরচ করেছে। কোন বন্ধুর বার্থডে, তা জিজ্ঞেস করলে নয়ন একটু সময় নিয়ে রনির কথা বলে। নয়নের বাবা বুঝতে পারেন ছেলে তাকে মিথ্যে কথা বলছে! তিনি সিদ্ধান্ত নেন এই বন্ধুর বিষয়ে খোঁজ নিতে হবে! নয়নের মাকে জিজ্ঞেস করা হলে-তিনিও এ ব্যাপারে কিছু জানেন না বলে জানান! আরিফ সাহেব বুঝতে পারেন ছেলে তাদেরকে ফাঁকি দিচ্ছে !

আরিফ সাহেব চিন্তিত হয়ে পড়েন, ছেলে কোনো মেয়ের সাথে সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েনি তো! খোলামেলা ছেলের সাথে বেশ কিছুক্ষণ কথা বললেন। তাকে জানালেন জীবনে পড়ালেখা করে নিজের পায়ে দাঁড়ানো অত্যন্ত জরুরি। ছেলে অত্যন্ত সাবলীলভাবে বাবাকে আশ্বস্ত করলো, দুশ্চিন্তা করার মতো কোনো কিছুই করছে না সে। তারপরও আরিফ সাহেব চিন্তামুক্ত হতে পারছেন না। দিনকাল যা পড়েছে দুশ্চিন্তা না করে উপায় কী? ছেলেকে চোখে চোখে রাখতে হবে।

নয়নের অনুপস্থিতিতে তার শোবার ঘর চেক করা হলে চিন্তিত হওয়ার মতো কিছু আলামত পাওয়া গেল। একদিন বাইরে থেকে ফিরেই বাবা নয়নকে ডাকলেন। বেশ কয়েকবার ডাকা ডাকির পর নয়ন সামনে এসে কথা বলা শুরু করতেই আরিফ সাহেব বুঝতে পারলেন ছেলের মুখ থেকে সিগারেটের গন্ধ পাওয়া যাচ্ছে! বাবা ছেলের এ ঘটানায় চিন্তিত ও ব্যাথিত হয়ে পড়লেন।

বয়ঃসন্ধিকালে শিশুদের মাঝে ফাঁকিবাজি বা মিথ্যা বলার প্রবণতা কাজ করে। এ বিষয়ে অভিভাবকদের সচেতন হওয়া খুবই জরুরি। শিশুরা সচরাচর পড়ালেখায় ফাঁকি দেয়। তারা বাবা-মাকে ফাঁকি দিয়ে সিনেমা দেখতে পারে; বন্ধু-বান্ধবীদের সাথে আড্ডা দিতে পারে; সম্পর্কে জড়াতে পারে; সিগারেট বা অন্য কোনো নেশাগ্রহণ করতে পারে; টাকা-পয়সা নষ্ট করতে পারে। এ সবই তারা বাবা-মাকে ফাঁকি দিয়ে করে। তারা পড়ালেখার বিষয়ে বাবা-মা এমনকি শিক্ষককেও ফাঁকি দিতে পারে। তারা শিক্ষকের হোমওয়ার্ক ঠিক মতো না করতে পারে; পরীক্ষায় নকল করতে পারে; রেজাল্ট শিট ঘষা মাজা করতে পারে। এমনি আরো নানারকম ফাঁকিবাজির কৌশল তারা অবলম্বন করতে পারে। তারা সুযোগ পেলেই বাবা-মাকে ফাঁকি দিয়ে টেলিভিশন দেখতে পারে।

ইদানীং মোবাইল ফোনে ফেসবুক, ইন্টারনেট নিয়ে ব্যস্ত থাকে ছেলে-মেয়েরা! পড়ার টেবিলে বসেও নামমাত্র বই খুলে রেখে অমনোযোগী হয়ে নিজেকে, অভিভাবককে ফাঁকি দিতে পারে তারা শিশুরা আসলে কেন ফাঁকি দেয়? তারা কী বোঝে না যে এতে তাদের নিজেরই ক্ষতি ও পরিবারের ক্ষতি! এ বিষয়ে মনোবিশেষজ্ঞরা বলেন, ‘শিশুদের মাঝে কিছুটা ফাঁকি দেওয়ার প্রবণতা সহজাত। তারা স্বাভাবিকভাবেই নিজেদের ভালো-মন্দ নিজেরা বুঝতে পারে না। কিংবা বুঝেও ততটা সতর্ক বা সাবধান হতে চায় না। বয়সের কারণেই শিশুরা অ্যাডভেনচার প্রিয় হয় এবং বাধাহীন চলতে পছন্দ করে।’

একজন শিশুর কর্তব্য বাবা-মার অনুগত হওয়া। সব বাবা-মাই তাদের শিশুর মঙ্গল এবং কল্যাণ চান। কল্যাণ কীসে নিহিত রয়েছে, শিশু হয়তো পুরোপুরি তা জানেনা, কিংবা জানলেও অনুধাবন করতে পারেনা। তারা বোঝেনা তাদের কল্যাণ নিহিত রয়েছে জ্ঞানার্জন ও চরিত্রবান হওয়ার মধ্যে। এ দুটো অর্জনের উপায় হলো মনোযোগ দিয়ে পড়ালেখা করা এবং বর্তমান সময়কে সঠিকভাবে কাজে লাগানো। এই লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত হলে ভবিষ্যতে করুণ পরিণতিতে পতিত হওয়া অনিবার্য-এ বাস্তবতা তাদের মধ্যে কাজ করে না।

পড়ালেখা অবশ্যই কঠিন কাজ। সততার সাথে নিজস্ব প্রস্তুতির মাধ্যমে পরীক্ষায় ভালো ফলাফল আরো কঠিন কাজ। কঠোর অধ্যাবসায়ের মাধ্যমে মনোযোগের সাথে নিরলসভাবে একাগ্রাচিত্তে পড়ালেখা চালিয়ে যাওয়া ধৈয্যের ব্যাপারও বটে! শিশুরা তা স্বাভাবিকভাবে করতে আগ্রহী হয় না। তারা না বুঝেই তাৎক্ষনিক আনন্দ-ফুর্তিতে মশগুল হয়ে পড়ে এবং বাবা-মা, শিক্ষকদেরকে ফাঁকি দিতে চেষ্টা করে। পরবর্তিতে তার কুফল সবাইকে ভোগ করতে হয়!

বাবা-মা’র এ ব্যাপারে শিশুদের উপর সর্বদা নজরদারি করা প্রয়োজন। শিশুদের ফাঁকিবাজির ধরন ও মাত্রা অনুধাবন করা আবশ্যক। শিশুরা খাবার-দাবারের ব্যাপারে চালাকি বা ফাঁকিবাজি করতে পারে, কোনো প্রিয় খাবার খেতে চালাকির আশ্রয় নিতে পারে। ভালো পোশাক পেতে কিংবা ভালো গিফট পেতে ছোট-খাটো বাহানা বা কৌশলের আশ্রয় নিতে পারে। কোনো গল্পের বইপড়া নিয়ে কিছুটা চালাকি করতে পারে! এগুলো সমর্থন করা যায়, যা সহনীয়। কোনো পরোপকারী দুঃসাধ্য কিংবা উত্তম কাজ করার প্রচেষ্টা দেখলে তাৎক্ষণিক প্রশংসা ও সহযোগিতা করা উচিত। বিখ্যাত মনীষীদের জীবনী পড়তে ও তা থেকে শিশুদের শিক্ষা নিতে বাবা-মাও কৌশলের আশ্রয় নিতে পারেন। অবশ্যই সীমিত মাত্রায় চালাকি, দুষ্টুমী শিশুদের সৃষ্টিশীলতাকে বাড়িয়ে দেয় এবং বুদ্ধিমত্তাকে শানিত করে। শিশুর মাঝে সৃষ্টিশীল কোনো কুশলীভাব লক্ষ্য করলে সতর্কতার সাথে তা পরিচালনা করা উচিত।

কিন্তু শিশুর ফাঁকিবাজি, চতুরতা, মিথ্যা বলা কিংবা যে কোনো ধরনের চালাকি ধরার জন্য বাবা-মাকে সচেতন হতে হবে। কোনো বিপদজনক, ক্ষতিকর কিংবা মারাত্মক চালাকি থাকলে অবশ্যই তা বন্ধ করতে হবে এবং শিশুকে বুঝতে দিতে হবে, বাবা-মা তার সব বিষয়ে পুরোটাই অবগত আছেন। এক্ষেত্রে বাবা-মার কৌশল, বুদ্ধিমত্তা ও দক্ষতা প্রয়োগ করা প্রয়োজন।

শিশুর ফাঁকিবাজি ও চালাকির বিষয়ে বাবা-মার ইচ্ছাকৃত বা অনিচ্ছাকৃত অজ্ঞতা বা উদাসীনতা ভয়ঙ্কর পরিণতি বয়ে আনতে পারে, যার লক্ষণ বর্তমান সমাজে লক্ষ্য করা যাচ্ছে। বিশেষ করে মাদক, ধর্ষণ, জঙ্গিবাদ, কিশোর গ্যাং এর মতো কর্মকা-ের বিস্তৃতি ও শিশুদের এসব কর্মকা-ে ব্যাপকভাবে জড়িয়ে পড়ার জন্য বাবা-মা’র অসচেতনতা এবং উদাসী নতাও অনেকখানি জড়িত।

শত ব্যস্ততা কিংবা অসুবিধা সত্ত্বেও বাবা-মার উচিত সবসময় শিশুদের সান্নিধ্যে থাকা। মনে রাখা দরকার, সন্তানের জন্য যখন পিতা মাতার সান্নিধ্য দরকার, তখন যদি তা না দেওয়া হয়, তাহলে বৃদ্ধ বয়সে বাবা-মার প্রয়োজনেও সন্তানের সান্নিধ্য পাওয়ার আশা হবে দূরাশা এবং শিশুর ভবিষ্যতও অনিরাপদ হয়ে উঠবে।

তবে শিশুর চালাকি কিংবা ফাঁকিবাজি হঠাৎ করে বন্ধ করে দিতে চাইলে হিতে-বিপরীত হতে পারে, এ বিষয়টিও অভিভাবকদের মনে রাখতে হবে। যথাযথভাবে, শিশুর ফাঁকিবাজির এই সহজাত প্রবণতা উদঘাটন, মূল্যায়ন ও নিয়ন্ত্রণের ওপর সন্তান ও পিতামাতা দু’জনেরই ভবিষ্যৎ কল্যাণ অথবা অকল্যাণ অনেকাংশেই নিভর্রশীল। কাজেই সন্তানের কল্যাণ ও নিরাপত্তা নিশ্চিতে বাবা-মাকেই সবার আগে সচেতন ও কৌশলী হতে হবে।

লেখক : কলামিস্ট

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *