মেহমানদারীতে আলেমদের জুড়ি নেই
মাওলানা আমিনুল ইসলাম : আলেম- উলামার এক জামাত নিয়ে হাজির হলাম প্রিয় বন্ধু ইসমাতুল্লাহ কাসেমীর বাড়িতে। বন্ধু আমার মাদানী সিলসিলার পীর। আবার তিনি প্রতিভাবান আলেম।
উদ্দেশ্য, বন্ধুর বড় মেয়েটার সাথে আমার ছোট ভাইয়ের বিয়ে। এতদিন বন্ধু হিসেবে তার বাড়িতে গিয়েছি। আজ বরযাত্রী হিসেবে।
মাদানী খান্দানের একটা ঐতিহ্য আছে, তারা খুব মেহমান নেওয়াজী। মেহমানদের খুব কদর করেন। মাদানী সিলসিলার পীর – মাশায়েখগণের ও সেই ছোঁয়া লেগেছে। তারাও মেহমান নেওয়াজী।
আমাদের হাটহাজারীর হযরত, আল্লামা আহমাদ শফি সাহেব দামাত বারাকাতুহুম, তিনি তো সাইয়্যেদ হুসাইন আহমদ মাদানী রহ.- এর বিশিষ্ট খলিফা। তাঁর খানকায় বেশ কয়েকবার গিয়েছি। তিনিও বিশাল খেদমত করেন। কোন মেহমান না খেয়ে আসতে পারে না। দুর- দুরান্তের বহু মানুষ তাঁর খানকাতে আসা যাওয়া করে। সকলেই তাঁর উদার হস্তের মেহমানদারীতে শরীক হয়।
আমার বন্ধু কিন্তু হাটহাজারী হুজুরের খলিফা। হযরতের কাছ থেকে খেলাফত লাভের পর থেকেই নিজের এলাকাতে দ্বীনের কাজ করে যাচ্ছেন। তিনিও নিজের মাদ্রাসাতে মাদানী খানকা প্রতিষ্ঠা করেছেন। এখন প্রতি সপ্তাহে, প্রতি মাসে ইসলাহী ইজতেমা হয় সেখানে।
বন্ধু খুব মেহনতী একজন মানুষ। রাতদিন মেহনত করে চলেছেন। আর তার এই মেহনতের কারণে হাজার হাজার ভক্তবৃন্দ তার। প্রতি মাসের ইসলাহী ইজতেমাতে হাজারো মেহমান জমা হয়ে থাকে।
তিনিও মাদানী খান্দানের মত মেহমানদারী আয়ত্ব করেছেন। মাসিক ইজতেমায় যত মানুষের আগমন হয়, সকলকেই দিল খোলা মেহমানদারী করেন।
আমি সেদিন যখন বন্ধুর বাড়িতে গেলাম, মনে করেছিলাম, বন্ধু তো খুব মেহমান নেওয়াজী মানুষ। মেহমান পেলে খুব খেদমত করে থাকেন, আজ তিনি যে কি করেন?
আমরা পৌঁছালাম তাঁর বাড়িতে জোহরের নামাজের পরে। আমাদের জন্য একটা স্পেশাল প্যান্ডেল করা হয়েছে। অত্যন্ত দৃষ্টিনন্দন প্যান্ডেল। আমরা সকলেই সেখানে বসলাম।
বসার সাথে সাথে দস্তার খানে আসা শুরু হয়ে গেল, ফরিদপুরে ঐতিহ্য বাহী সব পিঠা। বড় বড় খাঞ্চাতে করে আনা হয়েছে পিঠাগুলো। কত পদের যে পিঠা, নাম বলে শেষ করতে পারব না।
ভাজা কুলি, আন্দাশা, পাকান, রস- পাকান, আন্ডা- লজ, বরফি, তখতি, আরো যে কত পদের, নাম লিখে পাড়া মুশকিল।
পিঠা পর্ব শেষ। এর একটু পরে শুরু হল, আসল খাবার- দাবারের অনুষ্ঠান। হঠাৎ ছয়জন যুবক বিশাল এক খাঞ্চা উঁচু করে নিয়ে আসছে। খাঞ্চা উপরে বিশাল এক হরিণ বসা। হরিণের মুখে ঘাস- পাতা শোভা পাচ্ছে।
সবাই তো হতভম্ব হয়ে গেল, এ কি? আরে এত বড় হরিণ কিভাবে আসল এই প্লেটের উপর! তাও আবার মুখে যেন ঘাস চিবোচ্ছে! অনেকের চোখে ধাঁধা লেগে গেল। আসলে জিনিসটা কি?
আসলে সেটা ছিল এক আস্তো খাসি। জবাই করে চামড়া ছিলে ফেলা হয়েছে। এরপর একজন খ্যাতনামা বাবুর্চি সেটাকে ঐ আস্তা রান্না করে, কৌশলী ভাবে হরিণের ডিজাইন করে বড় খাঞ্চার উপর বসিয়ে দেওয়া হয়েছে।
এখানে বাবুর্চি অনেক দক্ষ। সে এমন কায়দা করে সেটাকে ডেকোরেশন করেছেন, মনে হচ্ছে, হুবহু তাজা হরিণ বসে ঘাস খাচ্ছে।
বর যাত্রীদের অধিকাংশ ওলামায়ে কেরাম। ঐ দৃশ্য দেখে একেকজন একেক মন্তব্য শুরু করলেন।
কেউ বললেন, গোরবা কুশতান শবে আওয়াল। কেউ বললেন, পীর তো পীর। তিনি যেমন সবার উপরে, ঠিক তাঁর মেহমানদারী ও সবার সেরা।
কেউ বললেন, পীরের কাছে সব মুরীদ ফেল হয়ে গেল। এরপর আরো রকমারী খাবার আসতে লাগল। মেহমানগণ আপ্যায়নে এমন সন্তষ্ট হল, যা প্রকাশের ভাষা নেই।
আসলে পীর সাহেব বন্ধুর এই উদারতা, আন্তরিকতা চিরদিন স্মরণ থাকবে সকলের। আর এই মেহমানদারী এমনিতে হয় না। এটা মেজবানের আন্তরিকতায় হয়ে থাকে। বিশেষ করে আলেম সমাজের মেহমানদারী সকলের থেকে সেরা হয়। আলেমদের উদারতা, আলেমদের আন্তরিকতা, সবচেয়ে প্রশংসনীয়।
লেখক : শিক্ষক


