আমাদের সাত বিলিয়ন ইউরো
পলাশ রহমান : জোয়ার ভাটার দেশ ভেনিস। আদ্রিয়াতিক সাগর কেটে গড়ে ওঠা এই শহর বছরের একটা বড় সময় জুড়ে থাকে পানির নিচে। সাগরে যখন জোয়ার হয় ভেনিসের পথঘাট তলিয়ে যায়। হাঁটু পানি, কোমর পানি ভেঙ্গে হাটাহাটি করা, কাজকাম সারা, সদায়পাতি করা এই শহরের বাসিন্দাদের জন্য খুব মামুলি বেপার। পর্যটকদের কাছেও ভেনিস ডোবানো জোয়ার অন্যরকম এক আকর্ষণ, বাড়তি বিনোদন। কিন্তু সমস্যা হয় যখন এই বাড়তি বিনোদন বাড়তি বিড়ম্বনার হয়ে দাঁড়ায়।
গত কয়েকদিন থেকে ইতালির আবহাওয়ার অবস্থা খুব খারাপ। বৈশ্বিক পরিবর্তনের চাপ দিনে দিনে বাড়ছে। প্রায় সারা দিন আকাশ গুমটি দিয়ে থাকে। বৃষ্টি এবং দমকা হাওয়া, ঝোড়ো হাওয়া তো আছেই। গেল মঙ্গলবার রাতে প্রায় একশ কিমি বেগে ঝড় হয়েছে। আমার বাসার পাশেই বড় বড় দুটি গাছ ভেঙ্গে পড়েছে দড়াম করে। পরদিন সকালেই দেখি সিটি করপোরেশনের লোকজন বড় বড় করাত নিয়ে হাজির।
জোয়ারে ডুব-সাঁতার করা ভেনিস আমার কর্মস্থান। গত মঙ্গলবার আমার কর্মস্থানের নিচতলা প্রায় ডুবে গিয়েছিল। পানি উঠেছিল ১৮৭ সেমি। যার উচ্চতা আমার থেকেও বেশি।
গতকালও জোয়ার এসেছিল। আজ, আগামী কাল, তারপরের দিন, তারপরের দিনও জোয়ার হবে। পানি বাড়বে প্রায় কোমর সমান। বেশিও হতে পারে, আবহাওয়া অফিস আগে ভাগে জানিয়ে দিয়েছে। এবারের জোয়ারটা এত বেশি ফুলে উঠেছে যে অনেকেই বলাবলি করছে, গত একশ বছরে এত জোয়ার কখনো হয়নি। স্থানীয় মেয়র জরুরি অবস্থা ঘোষনা করেছেন। স্কুলগুলোয় ছুটি ঘোষনা করা হয়েছে। দেশের প্রধানমন্ত্রী ছুটে এসেছিলেন মানুষের দূর্ভোগ দেখতে। তিনি ঘোষনা করেছেন, জোয়ারে ক্ষতিগ্রস্থদের আর্থিক সহযোগিতা করা হবে।
জলবায়ু পরিবর্তনের চাপ থেকে ভেনিসকে বাঁচাতে প্রায় ১৬ বছর আগে বাধ নির্মাণের কাজ শুরু করে স্থানীয় সরকার। সাত বিলিয়ন ইউরো ব্যায়ের বাধ কোনো কাজে আসেনি। সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, বাধ নির্মানের কাজ এখনো শেষ হয়নি। পুরাপুরি কাজ শেষ হলে ভেনিসের জোয়ার আর বিপদসীমা অতিক্রম করবে না। বিপদসীমা অতিক্রম করার আগেই পানির নিচে লুকিয়ে থাকা ডিজিটাল বাধগুলো ভেসে উঠবে এবং পানির চাপ কমিয়ে দেবে। আর আমরাও আশায় বুক বেধে আছি, আমাদের ট্যাক্সের সাত বিলিয়ন ইউরো নিশ্চই জোয়ারের জলে ভেসে যাবে না।
ভেনিসের প্রাণকেন্দ্র হলো সান মারকো। আর এই সান মারকো ভেনিসের সব থেকে নিচু এলাকা। জোয়ার এলে সবার আগে ডুবে যায় সান মারকো। স্থানীয় এক পত্রিকা মজা করে ভবিষ্যৎ সান মারকোর একটা ছবি প্রকাশ করেছে। যেখানে দেখা যাচ্ছে তালগাছের মতো উচু সান মারকোর টাওয়ার প্রায় ডুবে গেছে, পাশ দিয়ে চলে যাচ্ছে বিরাট এক যান্ত্রিক নৌকা।
প্রবাসী লেখক


