ওয়াজে গিয়ে কারা গলা কাটছে

ওয়াজে গিয়ে কারা গলা কাটছে

ওয়াজে গিয়ে কারা গলা কাটছে

মাওলানা আব্দুল্লাহ :: মাওলানা নুরুল ইসলাম ওলীপুরীকে অসংখ্য ধন্যবাদ জানাই। তিনি গলাকাটা ওয়ায়েজদের বিরুদ্ধে গর্জে উঠেছেন। বর্তমান প্রেক্ষাপটে ওলীপুরী সাহেবের এ অবস্থান আলোচনার ঝড় তুলেছে। গলা আসলে কারা কাটতে চায়? গলাাকাটা কখনোই ভালো কাজ নয়।

তবে এখানে কথা আছে, এক গলাকাটার বিরুদ্ধে বলতে গিয়ে আর দশজন গলাকাটা বক্তাকে আড়াল করা যাবে না।
ওলীপুরী সাহেব যেহেতু কারো নাম ম্যানশন করেননি। আমিও কারো নাম উল্লেখ করতে চাই না।
তিনি যাদেরকে এ যুগের আল্লামা খেতাবে ভুষিত করছেন, এবং যার ঠ্যাঙের ধুলোর সমান ঐ গলাকাটা বক্তা হতে পারেননি, সেই আল্লামার কি অবস্থা?

আবার ওসব আল্লামাদের ওয়াজের সংগঠনের নেতৃবৃন্দদের কি হালাত? সেটাও কিন্তু আল্লামা ওলীপুরী হযরতের বিশদ বর্ণনা করা দরকার ছিল।

তিনি যাদেরকে এ যুগের আল্লামা খেতাবে ভুষিত করলেন, যার পা মোবারকের ধুলোর সমান সেই গলাকাটা বক্তা হতে পারেননি। সেই আল্লামা সাহেব তো বড় গলাকাটা বক্তা। তাদের সংগঠনের সেক্রেটারী, সভাপতি, প্রায় নেতৃবৃন্দ গলাকাটা দলেরই সদস্য।

আমার জানামতে খেতাবধারী আল্লামা সাহেব দুই মাহফিল থেকে পঁচিশ হাজার করে টাকা হাদিয়া নিলেন।

তিনি যেখানে মাহফিলে গিয়েছিলেন, সেখানে আসা যাওয়া গাড়ি ভাড়া সর্বোচ্চ ৬/৭ হাজার টাকা। কিন্তু তাকে দেওয়া হল পঁচিশ হাজার। তার গাড়ির খরচ যেহেতু ৬/৭ হাজার, সেখানে আর হয়ত ৪/৫ হাজার টাকা হাদিয়া নিতে পারেন। সর্বোমোট ১১/১২ হাজার টাকা নেওয়াটা মানানসই হয়। কিন্তু পঁচিশ হাজার টাকা নেওয়া কি গলাকাটা নয়?

তার দলের সেক্রেটারী সাহেব এক জায়গায় পঁচিশ হাজার টাকা নিয়েছেন জানলাম। তার রাহা খরচ ওরকম হবে। ৫/ ৬ হাজার টাকা। তিনিও একদম একই স্টাইলে কর্তৃপক্ষের কল্লা নামালেন। আর আগের আলেমদের দ্বীন প্রচারের স্বার্থে যদি কেউ ওয়াজে যেতেন তাহলে তার দেশের কোথাও যেতে ১০০০টাকার বেশি খরচ হওয়ার কথা নয়। কিন্তু তারা এ কি করছেন? দ্বীনের প্রচার নাকি কল্লাকাটা?

এরকম সংগঠনের অনেকেই কিন্তু এই রোগে ভুগছেন। তাদেরকে কিন্তু একটু ট্রিটমেন্ট দেওয়া উচিত ছিল।

এই গলাকাটা বক্তাদের অত্যাচারে জর্জরিত আমরা সবাই। কথায় আছে, “সব মাছে কিন্তু গু খায়, তবে নাম হয় ঘাউড়া মাছের”। অধিকাংশ বক্তা আজ গলা কেটে টাকা নিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু নাম হচ্ছে শুধু হেলিকপ্টার হুজুরের।

হেলিকপ্টারে যে শুধু তিনি একা ওঠেন এমন নয়। অনেকেই ওঠেন, কিন্তু নাম পড়ে গেছে সহজ সরল মানুষটার।

এভাবে বিভিন্ন কৌশলে খেতাব ধারী আল্লামা এবং তার পরিচালনাধীন ওয়ায়েজদের সংগঠনের নেতৃবৃন্দ, সাধারণ পাবলিকের পকেট ফাঁকা করে গলায় ছুরি চালাচ্ছেন, অথচ তারা ধরা ছোঁয়ার বাইরে। আবার সংগঠনের লেভেল দিয়ে সাধু সাজা হচ্ছে!

আচ্ছা, পঁচিশ/ত্রিশ হাজার টাকা হাদিয়া নিতে হবে কেন? গাড়ি ভাড়ার পরে তো আর দুই তিন হাজারে হয়ে যাওয়ার কথা। তাতে দশ হাজারেই তো যথেষ্ট। এরপর আর পনের বিশ হাজার টাকা অতিরিক্ত মুনাফা নেওয়া বৈধ হয় কিভাবে?
একজন মুহাদ্দিস, শায়খুল হাদীস, তারা বুখারী শরীফের একমাস যাবত দরস দিয়ে মাত্র পনের থেকে বিশ হাজার টাকা বেতন পান। আর ওনারা এক দেড় ঘণ্টা ওয়াজ বলা ঠিক হবে না, গলাবাজি করে পঁচিশ/ত্রিশ হাজার টাকা নিয়ে যাচ্ছেন। এটা কেমন কথা?

সত্যি ওনারা যদি মুখলিস আলেম হবেন, তাহলে এত টাকা নেওয়ার কথা নয়। গাড়ি ভাড়া রেখে বাকি টাকা কর্তৃপক্ষের কাছে ফেরত দেওয়া চাই।

আমি শায়খুল হাদীস আল্লামা আজিজুল হক রহ.কে দেখেছি, গাড়ি ভাড়ার অতিরিক্ত কোন হাদিয়া তিনি নেননি। প্রখ্যাত মুফাচ্ছিরে কুরআন হাবিবুল্লাহ মেসবাহ রহ. এমনটি ছিলেন। এখন কেন এরকম হচ্ছে।

বর্তমান জামানায় আমার জানামতে যাত্রাবাড়ির মাহমুদুল হাসান সাহেব সম্পর্কে জানি, তিনি আমাদের মাদ্রাসা থেকে দশ বার কিলোমিটার দূরে একটা প্রোগ্রামে এসেছিলেন। সে প্রোগ্রাম শেষ করে আমাদের মাদ্রাসায় এলেন, প্রায় এক ঘণ্টা বয়ান করলেন। বয়ান শেষ করার পর আমাদের মুহতামিম সাহেব হাদিয়া দিতে উদ্যত হলেন, তিনি সাথে সাথে সে হাদিয়া গ্রহণ করতে অস্বীকার করলেন। বললেন, দেখুন! আমি যে মাদ্রাসায় প্রোগ্রামে এসেছিলাম, সেখান থেকে তারা আমাকে হাদিয়া দিয়েছে। আমার গাড়ি ভাড়া ক্লিয়ার করেছে। সুতরাং আমার আর কোন হাদিয়ার প্রয়োজন নেই। আমার কোন রাহা খরচের দরকার নেই।

কিন্তু আমাদের খেতাবধারী আল্লামাগণ ও সংগঠনের সেক্রেটারী সাহেবান তো প্রায় সময় একাধিক মাহফিল একই দিনে করেন। এক মাহফিল থেকে পঁচিশ, আরেকটা মাহফিল থেকে বিশ বা পঁচিশ। মোটকথা এক নাইটে অর্ধ লাখ কামান তারা। আবার এমনও শোনা যায়, তিনারা তিনটা প্রোগ্রাম ও করেন। অনেকে অতিরিক্ত প্রোগ্রাম করতে গিয়ে শেষটায় দৌড়ানি খান। সবগুলো থেকে হাদিয়া নেন রীতিমত। তাহলে ওনারা কি গলাকাটা দলের অন্তর্ভুক্ত হচ্ছেন না?

আল্লামা ওলীপুরী সাহেব একজন প্রখ্যাত আলেমেদ্বীন। আমাদের সকলের মাথার মুকুট। তিনি যেহেতু গলাকাটা বক্তাদের বিরুদ্ধে গর্জে উঠেছেন, সুতরাং আমি মনে করি, সকল গলাকাটা ওয়াজের বিরুদ্ধে হতে হবে তার এই মিশন। কাউকে বাদ রাখা ঠিক হবে না। আশাকরি ওলীপুরী সাহেবের এই সাহসী পদক্ষেপে একটা সুন্দর সমাধান হবে। আর সাধারণ জনতা ও মাদ্রাসার জিম্মাদারগণ পরিত্রাণ পাবেন গলাকাটা বক্তাদের রোষানাল থেকে।

আহ, কত কষ্ট করে টাকা কালেকশন করেন মাদ্রাসার জিম্মাদারগণ। কিন্তু ঐ গলাকাটা ওয়ায়েজ সব নিয়ে যায় এক দেড় ঘণ্টা আওয়াজ দিয়ে।

ওলীপুরী সাহেবকে অনুরোধ করব, আপনি যেহেতু কথা তুলেছেন, একটা ফর্মুলা দিবেন, যাতে কেউ যেন জুলুম করে টাকা না নেয়।

একজন বক্তা, গাড়ি ভাড়ার পরে আর দুই তিন হাজার টাকা হলে তো যথেষ্ট। প্রতিদিন তিন হাজার করে হলে তো মাসে নব্বই হাজার টাকা। আর কত চাই? একজন মানুষের ফ্যামেলির জন্য তো অনেক।

এরকম একটা নিয়ম করুন, গাড়ি ভাড়ার পরে যেন দুই তিন হাজার টাকার বেশী হাদিয়া না নেয়।

আরেকটা কথা, আমি কিন্তু বড় গলাকাটা ওয়ালার পক্ষে নই। আমিও তার এহেন কর্মকাণ্ডের বিপক্ষে। তবে আমার কথা হলো, একজনের অপরাধ জাহির করে আর বাকিগুলোর দোষ ত্রুটি গোপন করা ঠিক নয়। অপরাধ ছোট হোক আর বড় হোক, অপরাধ তো অপরাধই।

ওনারা কেউ দুধে ধোয়া নয়। ওনাদের আগে শাসন করুন। যেহেতু ওনাদেরকে আপনার অতি নিকটে মনে হচ্ছে।
পরিশেষে আল্লামা ওলীপুরীর মঙ্গল কামনা করি, আল্লাহ আপনাকে নেক হায়াত দান করুন। আমিন।

লেখক : শিক্ষক ও কলামিস্ট

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *