গ্রামের শীতকাল | মাওলানা আমিনুল ইসলাম
শীত আসলেই কেমন যেন গ্রামে আনন্দ বয়ে যায়। গ্রামে শীতকালটার মজাই আলাদা। শহরের মানুষ কোনদিন সেই মজাটা অনুভব করতে পারবে না। কত আনন্দ, কত যে সুখ। আবার সেই সাথে বেদনা ও আছে। তবে বেদনার মধ্যে আনন্দ ও রয়েছে। যারা কোনদিন গ্রামে বাস করেনি, তারা কখনও সে আনন্দ, আর মজা কোনদিন পাবে না।
গ্রামে শীতের মজা শুরু হয়ে যায় কার্তিক-অগ্রহায়ন মাস থেকে। হালকা- হালকা শীত। খেজুরগাছ বাছাই শুরু হয়। খেজুর গাছগুলোকে রস সংগ্রহের উপোযোগী করার জন্য, সাফাই করা হয়। কোথাও বলে ‘গাছ তোলা’। গাছ তুললে, খেজুরের “সপরা” দিয়ে সন্ধ্যার সময় তারা বাজি ফোটানো হয়।
খেজুরের ” সপরা” আগুনে পুড়িয়ে ছাই এর মত করা হত, এরপর বড় এক কচুর পাতার মধ্যে সেই আগুন ওয়ালা ছাইগুলো ঢেলে পাতার মুখ রশি দিয়ে বেঁধে, কেউ সেটাকে ঘোরাত। আর তারার মত ফুলকি পড়তে থাকত সারিদিকে। এটা সন্ধ্যার পরে করা হত। সে দৃশ্যটা ছিল এত মজার কল্পনা করা যায় না।
মানুষ কোটি কোটি টাকা খরচ করে বিভিন্ন প্রোগ্রামে তারা বাজি ফোটানোর ব্যবস্হা করে। কিন্তু গ্রামের সেই খেজুরের সপরা দিয়ে বিনা খরচে যে তারা বাজি আমরা পোড়ায়েছি, আমার মনে হয়, গ্রামের সেই তারা বাজি সব চেয়ে আনন্দের, সব থেকে বেশী আকর্ষনীয়। অগ্রহায়নে শুরু হয় নবান্ন উৎসব। নতুন ধান আসে বাড়ি বাড়ি। কি যে এক ঘ্রাণ। নতুন ধানের ঘ্রানটা কি মজার, যারা এই ঘ্রাণ পেয়েছে, তারাই জানে।
অগ্রহায়নে নতুন ধান কাটা হয়ে গেলে পৌষ মাসে গ্রাম- গঞ্জে পিঠা খাওয়ার ধুম পড়ে যায়। সবচেয়ে মজার হল, ঐ যে খেজুর গাছ তোলা হয়েছিল, সে গাছ থেকে রস সংগ্রহ করে, রসের পিঠা” গ্রাম- বাংলার সবচেয়ে আকর্ষনীয় পিঠা। সারা গ্রামে পিঠা উৎসব শুরু হয়ে যায়।
শীতে মিষ্টি খেজুরের রস। বড় আকর্ষণ। আমরা সন্ধ্যা বেলায় খেজুর গাছে উঠে, পাটকাঠির নল বা পেঁপের ডাল দিয়ে নল বানায়ে সরাসরি হাঁড়ি থেকে রস চুমুক দিয়ে পান করতাম। কি যে মজা ছিল সেটা। প্রচণ্ড ঠাণ্ডা পড়লে সকাল- সন্ধ্যায় আগুন পোহানো হত। খড়-পাতা, গাছের শুকনো পাতা দিয়ে আগুন জ্বালায়ে আমরা চারিদিকে বসে যেতাম। আগুনের তাপ নিয়ে শরীর চাঙা করতাম আমরা।
রাতে বিছানায় শোয়ার মজা ছিল অন্য রকম। তিন চার ভাই বোন মিলে এক লেপ। সে সময়ে মানুষের এত আড়ম্বরী ছিলনা। একটা পরিবারে দুটো বা তিনটের বেশী লেপ তো দেখা যেতনা। দেখা গেছে, দুই তিনজন মিলে এক লেপ গায়ে দিয়ে শীত কাটায়ে দিচ্ছে।
সে সময়ে কম্বল ও এত সচারাচর দেখা যায়নি। এখন তো বাড়ি বাড়ি দামী কম্বল। তখন এক লেপ বা মোটা কাঁথার ওপর দিয়ে শীত কেটে গেছে। আমার মনে আছে, তিন চার ভাই বোন মিলে এক লেপে আমরা গাদাগাদি করে থেকেছি। মাঝে মাঝে টানাটানি করতে করতে একবার এপাশের একজন আগলা হয়ে যেত, আবার কখনো ওপাশ থেকে আগলা হয়ে যেত।
এত টানাটানির মধ্যেও মজা ছিল খুব। ভাই বোন মিলে- মিশে মজা করে থাকা হত। কি যে এক আনন্দঘন সময় ছিল সেটা, তা ব্যক্ত করার ভাষা নেই।
সকাল বেলা ঘুম থেকে উঠে শীতে কাঁপতে থাকতাম। তাই বলে ঘরে বসে থাকা নেই। ছুটে যেতাম বাইরে। কেউ আগুন জ্বালালো কিনা সন্ধ্যান করতাম। আবার সকালের মিষ্টি রোদে বসে খেজুরের রসের সাথে নতুন ধানের মুড়ি। রসের ভিতর মুড়ি ঢেলে দিয়ে স্বাদ করে পান করতাম খেজুরের রস।
সত্যি, শীত কালে গ্রামে অন্য ধরনের এক মজা। এ মজা কাউকে বোঝানো যাবেনা। যারা গ্রামে শীতকাল কাটিয়েছে, একমাত্র তারাই বলতে পারবে।
লেখক : শিক্ষক


