শিশুর মানসিক সুস্থতা রক্ষার উপায়

শিশুর মানসিক সুস্থতা রক্ষার উপায়

স্বাস্থ্য। এম জসীম উদ্দিন

শিশুর মানসিক সুস্থতা রক্ষার উপায়

সুস্বাস্থ্য হলো শারীরিক ও মানসিক সুস্থতা। জন্ম ও মৃত্যুর মাঝে মানুষকে তার চারপাশের পরিবেশের ওপর নির্ভর করতে হয়। এই পরিবেশ মানুষের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যকে প্রভাবিত করে। স্বাস্থ্য সচেতনতা হলো কিছু কিছু আচরণ, যা দ্বারা মানুষ সুস্থ ও স্বাভাবিক জীবন যাপন করতে পারে। ‘স্বাস্থ্যই সকল সুখের মূল’ এ কথাটি আমরা সকলেই জানি এবং সুস্থ সুন্দর জীবন যাপানের জন্য এ বিষয়টি অপরিহার্য।

গত ১০ অক্টোবর পালিত হলো ‘বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবস। আন্তর্জাতিক সংস্থা ‘ওয়ার্ল্ড ফেডারেশন অভ্ মেন্টাল হেলথ’ এর নেতৃত্বে ১৯৯২ সাল থেকে বিশ্বজুড়ে পালিত হয়ে আসছে এ দিনটি। বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো আমাদের দেশেও দিবসটি পালিত হয়। এ দিনকে উপলক্ষ করে সরকারি ও বেসরকারি নানা সংস্থা ও প্রতিষ্ঠান বিভিন্ন কর্মসূচির আয়োজন করে। এ বছর দিবসটির প্রতিপাদ্য ছিলো ছিল ‘মানসিক স্বাস্থ্যের উন্নয়স ও আত্মহত্যা প্রতিরোধ।’

শরীরের কোথাও কেটে গেলে যেমন চিকিৎসা প্রয়োজন, তেমনি কোনো ব্যক্তি মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হলেও তার চিকিৎসা বা সেবা প্রয়োজন হয়। বর্তমান সময়ে অভিভাবক হওয়া খুবই কঠিন কাজ হয়ে উঠেছে। বিভিন্ন ধরনের উৎপীড়ন, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তৈরি সমস্যাসহ যৌন নির্যাতন বর্তমান শিশু-কিশোরদের আগের চাইতে অনেক বেশি প্রভাবিত করে এবং শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব ফেলে। এসকল সমস্যা থেকে সন্তানদের বাঁচিয়ে রেখে তাদের আত্মনির্ভরশীল ও বুদ্ধিমান হিসেবে গড়ে তোলার জন্য অভিভাবকদের প্রতিনিয়ত যুদ্ধ করতে হয়।

দেশ এগিয়ে যাচ্ছে, বদলে যাচ্ছে সংস্কৃতি ও আমাদের জীবনধারা। আর সেই সঙ্গে বাড়ছে মানসিক জটিলতা। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে মানসিক স্বাস্থ্য ও প্রতিবন্ধিতাকে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা হিসেবে গণ্য করার আহ্বান জানিয়েছেন। বর্তমান সরকার মানসিক স্বাস্থ্যসেবাকে মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে ও মানসিক রোগে আক্রান্ত ব্যক্তির অধিকার বা সুযোগের সমতা বিধানে বদ্ধপরিকর। এজন্য ২০১৩ সালে প্রতিবন্ধী অধিকার ও সুরক্ষা আইন সংশোধন এবং ২০১৮ সালে মানসিক স্বাস্থ্য আইন প্রণয়ন করা হয়েছে। বর্তমান সরকার আত্মহত্যা প্রতিরোধ ও মানসিক স্বাস্থ্যের উন্নয়নকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে। শারীরিক স্বাস্থ্যের মতো মানসিক স্বাস্থ্যেরও পরিচর্যা প্রয়োজন- বিষয়টি গুরুত্বের সাথে বিবেচনায় রাখতে হবে। মানসিক স্বাস্থ্যসেবাকে সবার কাছে পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যে, বিশেষ করে নারী-শিশুর মানসিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয় জাতীয়, বিভাগীয় এমনকি জেলা পর্যায়ে ন্যাশনাল-রিজিওনাল ট্রমা কাউন্সেলিং সেন্টার স্থাপন করেছে।

শিশু-কিশোর সাইকোথেরাপিস্ট কেটি হারলি বলেন, কিশোর বয়সী ছেলে মেয়েদের মধ্যে উচ্চমাত্রার মানসিক চাপ দেখতে পাওয়া যায়। মানসিক স্বাস্থ্যের উপকারিতা সম্পর্কে শিশু-কিশোরদের সম্যক ধারণা দেয়ার জন্য সাইকোলজি বিশেষজ্ঞ ও শিশুরোগ বিশেষজ্ঞরা বেশ কয়েকটি পদ্ধতির কথা বলেছেন। এ পদ্ধতিগুলোর মাধ্যমে শিশু কিশোররা মনের অনুভূতি প্রকাশ, শরীরের মতো মনেরও যতœ নেয়া এবং নিজেদের আবেগগুলোকে বুঝতে শেখার মতো বিষয়গুলো অন্তর্ভূক্ত। মনে রাখতে হবে শিশুরা নিজেদের সমস্যা বুঝতে পারে না, বলতে ও সঙ্কোচবোধ করে। শিশুরা বিভিন্ন বয়সে বিভিন্ন আচরণ করে, এগুলোর মধ্যে কোনটি স্বাভাবিক এবং কোন আচরণটি অস্বাভাবিক, তা অনেক সময় অভিভাবকরা বুঝতে পারেন না। শিশুরা পরিবারের সমস্যাগুলোকে রোগের মাধ্যমে লক্ষণ ও আচরণের মাধ্যমে প্রকাশ করে, যা অভিভাবকদের বুঝতে হবে এবং গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করতে হবে।

শিশু-কিশোরদের সমস্যাগুলো এমনভাবে প্রকাশ পায়, যাতে বোঝা যায় না যে, তারা মানসিক সমস্যায় আছে। লেখাপড়ায় অমনোযোগী, অল্পতেই রাগ করা, কান্না করা, মন খারাপ করে থাকা ইত্যাদির মাধ্যমে তাদের মানসিক সংকট প্রকাশ পায়। এছাড়াও নেশায় আসক্ত হওয়া, কারো কথা না মানা, বেশি চঞ্চলতা দেখানো, কথাবার্তা আচরণ ও ব্যবহার খারাপ করাও শিশুর মানসিক সমস্যার লক্ষণ হিসেবে বিবেচিত হয়। শিশুদের মধ্যে মানসিক সমস্যা তৈরির কারণ দারিদ্র্য, পরিবার ও বিদ্যালয়ে নির্যাতন, লেখাপড়ার অত্যধিক চাপ, মাদকাসক্তি, উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা, প্রেম বা সম্পর্কে ব্যর্থতা-বিষন্নতা ইত্যাদি। তবে কিছু নতুন উপসর্গও শিশু-কিশোরদের মানসিক সমস্যার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে ইদানিং। কম্পিউটার, ভিডিও বা স্মার্টফোন, গেমস বর্তমানে খুবই প্রকট হয়ে দেখা দিয়েছে। গেমিং নেশাকে বর্তমানে কয়েকটি দেশে প্রধান জনস্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করছে খোদ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। তারা প্রথমবারের মতো একে মানসিক রোগ হিসেবে স্বীকৃতি দিতে যাচ্ছে।

জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য জরিপ ২০১৮-১৯ এর ফলাফল পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, আমাদের দেশের ১৭ শতাংশ মানুষ নানারকম মানসিক সমস্যা বা রোগে ভুগছেন। এর মধ্যে ১৩ শতাংশই শিশু। তাছাড়া এ রোগীদের ৯৪ শতাংশ মানুষ সামাজিক প্রতিবন্ধকতার কারণে চিকিৎসা নিতে চিকিৎসকদের কাছে যান না। ফলে বহুসংখ্যক মানুষ মানসিক সমস্যা নিয়েও স্বাভাবিকভাবে চলাচল করার চেষ্টা করেন। এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য খুবই উদ্বেগের বিষয়।

জরিপে আরো জানা যায়, বাংলাদেশে ৭ থেকে ১৭ বছর বয়সী ১৪ শতাংশ কিশোর-কিশোরীর মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা রয়েছে। এসব কিশোর-কিশোরীদের ৯৫ শতাংশ কোনো চিকিৎসা নেয় না, ফলে দিন দিন তাদের সমস্যা আরো প্রকট হতে থাকে।

আমরা মানসিক সমস্যাকে তেমন একটা গুরুত্ব দেই না। মানসিক রোগ তো দূরের কথা, আমরা শারীরিক কোনো সমস্যা জটিল আকার ধারণ না করা পর্যন্ত চিকিৎসকের কাছেও যেতে চাই না। তাছাড়া মানসিক রোগ সম্পর্কে আমাদের মধ্যে ভ্রান্ত ধারণাও আছে। মনে রাখতে হবে মানসিক রোগী মানেই পাগল নয়। অথচ মানুষের অযতœ-অবহেলা আর অত্যাচারের কারণে অনেক সময় অভিভাবকরা তাদেরকেই মানসিক বিকারগ্রস্ত হিসেবে ধরে শিকল দিয়ে বেধে রাখে। এ অবহেলা-অযতেœর কারণেও শিশু-কিশোরদের মানসিক সমস্যা আরো গুরুতর আকার ধারণ করে। অন্য এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, যারা আত্মহত্যা করে তাদের ৯৫ শতাংশই কোনো না কোনো মানসিক রোগে ভোগেন।

শিশু-কিশোরদের মানসিক সমস্যা সমাধানে প্রয়োজন উপযুক্ত চিকিৎসা। তাদের সাথে ভালো ব্যবহার করে তাদের সমস্যা সম্বন্ধে জানতে হবে। এ বিষয়ে যথেষ্ট সচেতন হলেই কেবল তাদেরকে মানসিক সমস্যা থেকে রক্ষা করা সম্ভব। সম্ভব সুস্থ জীবন ফেরত দিতে।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্য উন্নয়ন ও আত্মহত্যা প্রতিরোধের জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। আশা করা যায়, এসব পদক্ষেপ শিক্ষার্থীদের হতাশা ও অস্থিরতা দূর করে তাদের মেধা ও মননকে যথাযথভাবে কাজে লাগাতে সহায়তা করবে।

মানসিক সুস্থতা নিয়ে দেশজুড়ে সচেতনতা সৃষ্টি ও জনমত গড়ে তুলতে হবে। এ ক্ষেত্রে পরিবার ও স্কুল পর্যায় থেকেই সচেতনতামূলক কার্যক্রম শুরু করতে হবে। কুসংস্কারের বদলে সহযোগিতার দৃষ্টিভঙ্গির সাহায্যে মানসিক স্বাস্থ্য ও এর সুস্থতা নিয়ে আলোচনা করতে হবে। মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে সেমিনার, আলোচনা সভা ও কাউন্সেলিং সেশনের আয়োজন করতে হবে। এ ধরনের কর্মসূচিতে সবার অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপক প্রচার চালাতে হবে আর এভাবে সবার মধ্যে মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে সচেতনতা বৃদ্ধি হবে, যা মানসিক অসুস্থতা প্রতিরোধে কার্যকরী পদক্ষেপ হবে। আমাদের সম্মিলিত প্রচেষ্টা আমাদের শিশুদের মানসিক সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করে নিশ্চয়ই সুস্থ সুন্দর মানুষ হিসেবে বেড়ে উঠতে সহায়তা করবে।

লেখক : কলামিস্ট

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *