নাগালের কাছে ফিরছে না নিত্যপণ্যের দাম

নাগালের কাছে ফিরছে না নিত্যপণ্যের দাম

নাগালের কাছে ফিরছে না নিত্যপণ্যের দাম

পাথেয় টোয়েন্টিফোর ডটকম :: মানুষকে সবার আগে নিত্যপণ্যের দাম চুকাতে হয়। এখানেই কোনো ভরসা না থাকে দিনটা কেমন যায় কেবল মধ্যবিত্তের একজন সাধারণ মানুষই বলতে পারেন। কিন্তু নিম্ন বিত্তের তো আরও বেশী যন্ত্রণা, সেটা দেখার জন্য কে আছে? বাজার নিয়ন্ত্রণ সংস্থা আছে, তদারকিও হচ্ছে, কিন্তু ফসল ঘরে উঠছে না। ম্যাজিস্ট্র্যাট গেলেই দাম আধেকে নেমে আসে, ম্যাজিস্ট্র্যাট বিদায় হলেই আবার সেই রকমফের চলতে থাকে। তাহলে বিষয়টা কোথায়? বাবসায়িক কারসাজি? বিশ্লেষকগণ বলছেন, তাই নয় কী?

দুই সন্তানের জনক সিএনজি চালক আবিদ রহমান। সবাইকে নিয়ে ভাড়া বাসায় বাস করেন রাজধানীর রামপুরা বাজার এলাকাতেই। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত সিএনজি চালিয়ে দিনে তার আয় হয় ৬০০-৭০০ বা কখনো হাজার টাকাই। এ টাকা দিয়েই মেটাতে হয় পরিবারের চার সদস্যের ভরণ-পোষণসহ অন্যান্য খরচ। কিন্তু মাস শেষে ঋণের বোঝাই কেবল বাড়তে থাকে, বাজার কারসাজিতে ত্রাহি ত্রাহি অবস্থা তাদের। বিস্ময়কর হলো, মাসে টিন শেডের দুই রুমের ভাড়া ৮ হাজার টাকা। পরিবারের চার সদস্যের জন্য মাসে চাল লাগে দুই হাজার টাকার ওপরে। মাছ-মাংস বাদেই কাঁচাবাজারের পেছনে খরচ হয় আরও প্রায় তিন হাজার টাকা। সব মিলিয়ে সংসার চালাতে তার মাসে খরচ হয় ১৫ হাজার টাকার ওপরে।

আবিদ রহমান বলেন, সকাল থেকে রাত পর্যন্ত রিকশা চালিয়ে যে আয় করি তা দিয়ে কোনো রকমে সংসার চলে। চাল, ডাল, তেল, চিনির যে দাম স্ত্রী, ছেলে, মেয়ের মুখে তিন বেলা খাবার তুলে দেয়াই কষ্টকর হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমি নিজে দুপুরের খাবার ছেড়ে দিয়েছি। তারপরও খরচের হিসাব মিলাতে পারছি না ভাই।

দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির কারণে কী ধরনের সমস্যা হচ্ছে, এ বিষয়ে গত এক সপ্তাহে এ প্রতিবেদক যাদের সঙ্গে কথা বলেছেন, তাদের প্রত্যেকেই বলেছেন, মাসে এক থেকে দুই বারের বেশি মাংস খাওয়া ছেড়ে দিয়েছেন। এদের মধ্যে ১৫ জন জানিয়েছেন তারা দুপুরে ভারি খাবার ছেড়ে দিয়েছেন। ১০ জন জানিয়েছেন মাসের খরচ মেটাতে অন্যের কাছ থেকে অর্থ ধার করেছেন।

বেসরকারি একটি জীবন বীমা কোম্পানিতে অফিসার পদে কাজ করেন আবু জান্দাল। তিনি জানান, পরিবারসহ দুই সন্তান নিয়ে মুগদায় একটি ভাড়া বাসায় তার বসবাস। দুই সন্তানই স্কুলে পড়ে। বড় ছেলে পঞ্চম শ্রেণীতে এবং ছোট সন্তান তৃতীয় শ্রেণীতে।

তিনি বলেন, সারা মাসে যে আয় করি সংসার চালাতেই তার সব খরচ হয়ে যায়। মাস শেষে কোনো টাকাই জমা থাকে না। আর গত কয়েক মাস ধরে যে হারে খাদ্য দ্রব্যের দাম বাড়ছে তাতে ঠিকমত সংসার চালানোই দুরুহ হয়ে পড়ছে। গরুর মাংস খাওয়া অনেক আগেই ছেড়ে দিয়েছি। মাঝে মধ্যে ব্রয়লার মুরগি কেনা হয়। তবে মাসে ২-৩ দিনের বেশি নয়।

এক গার্মেন্টসকর্মী বলেন, মাসে যে বেতন পাই, তা দিয়ে কোনো রকমে খেয়ে না খেয়ে বেঁচে আছি। বেশিরভাগ দিন দুপুরে কিছু খাই না। মাঝে মধ্যে বেশি ক্ষিধে লাগলে সিঙ্গারা অথব বিস্কুট খেয়ে কাটিয়ে দেই। আমরা যে কী কষ্টে আছি তা বলে বোঝাতে পারবো না ভাই। মাংস খাওয়া ছেড়ে দিয়েছি অনেক আগেই। আলু, ভর্তা-ডিম ভাজি দিয়ে পেট ভরে ভাত খাব তারও উপায় নেই। এক কেজি চাল কিনতে লাগে ৪০ টাকা। একটি ডিমের দাম ৯ টাকা। আলুর কেজি ৩০ টাকা। এবার আমার কী অবস্থা, তা একটু চিন্তা করেই বুঝে নেন।

শিম, টমেটো, গাজর, ফুলকপি, বাঁধাকপি, শালগমসহ শীতের সবজি বাজারে ভরপুর থাকলেও বেশিরভাগ সবজির দাম এখনো বেশ চড়া। শসা ৪০-৬০ টাকা, পেঁপে ৪০-৬০ টাকা, করলা ৫০-৭০ টাকা, দেশি পাকা টমেটো ৪০-৬০ টাকা, শিম ৪০-৫০ টাকা, গাজর ৪০-৫০ টাকা, মুলা ২০-২৫ টাকা, নতুন গোল আলু ২৫-৩০ টাকা, শালগম ৩০-৪০ টাকা, বেগুন ৪০-৫০ টাকা কেজি বিক্রি হচ্ছে। শীতের অন্যতম সবজি ফুলকপি ও বাধাকপি বিক্রি হচ্ছে ৩০-৩৫ টাকা প্রতি পিস।

গবেষণা প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ২০১৬ সালের খানা (একই রান্নায় খাওয়া এবং একসঙ্গে বসবাস) আয়-ব্যয় জরিপে উঠে এসেছে, খানাপ্রতি মাসিক আয় দাঁড়িয়েছে ১৫ হাজার ৯৪৫ টাকা, যা ২০১০ সালে ছিল ১১ হাজার ৩৫৩ টাকা। অর্থাৎ ছয় বছরের ব্যবধানে খানাপ্রতি মাসিক আয় বেড়েছে ৪ হাজার ৫৯২ টাকা বা ৪০ শতাংশ হারে।

অপরদিকে ২০১৬ সালের হিসাবে খানাপ্রতি মাসিক ব্যয় দাঁড়িয়েছে ১৫ হাজার ৯১৫ টাকা, যা ২০১০ সালে ছিল ১১ হাজার ২০০ টাকা। অর্থাৎ ছয় বছরের ব্যবধানে খানাপ্রতি ব্যয় বেড়েছে ৪ হাজার ৭১৫ টাকা। ব্যয় বৃদ্ধির এ হার ৪২ শতাংশ।

এরপর বিবিএস’র খানা আয়-ব্যয়’র আর কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। তবে ২০১৬ সালের তুলনায় বর্তমানে ব্যয়ের পরিমাণ যে বেশ বেড়েছে তা সহজেই বোঝা যায়। কনজ্যুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) হিসাবে, ২০১৯ সালে ঢাকার মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে ৬ শতাংশ। আগের বছরেও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির হার একই ছিল। এ হিসাবে দুই বছরে জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে ১২ শতাংশের ওপরে।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *