প্রতিবন্ধীদের সুরক্ষায় করণীয়

প্রতিবন্ধীদের সুরক্ষায় করণীয়

প্রতিবন্ধীদের সুরক্ষায় করণীয়

সাজিয়া হাফিজ :: আমাদের দেশে বহু প্রতিবন্ধী শিশু হয়েছে। কেউ দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী, শ্রবণপ্রতিবন্ধী, বাকপ্রতিবন্ধী, কোনো অঙ্গহানীর কারণে শারীরিক প্রতিবন্ধী আবার কেউ বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী। প্রতিবন্ধী জন্মগত কারণেও হতে পারে আবার বিভিন্ন রোগ কিংবা দুর্ঘটনার কারণেও হতে পারে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, বিশ্বের মোট জনসংখ্যার ১০ শতাংশ মানুষ কোন না কোনোভাবে প্রতিবন্ধী। আর বাংলাদেশ মোট ১ কোটি ৭০ লাখ মানুষ প্রতিবন্ধী। এরমধ্যে ৫২ ভাগ পুরুষ আর ৪৮ ভাগ নারী। বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার সর্বশেষ জরিপে বলা হয়েছে শারীরিকভাবে প্রতিবন্ধী ৪০ লাখ, মানসিক প্রতিবন্ধী ৩৮ লাখ, দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ৩৩ লাখ আর বাক ও শ্রবণপ্রতিবন্ধী মিলে ২৫ লাখ।

নানা আয়োজনে দেশে গত ৩ ডিসেম্বর পালিত হলো ‘আন্তর্জাতিক প্রতিবন্ধী দিবস’। ১৯৯২ সাল থেকে জাতিসংঘ ঘোষিত এ দিবসটি বিশ্বব্যাপী পালিত হয়ে আসছে। প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের মর্যাদা সমুন্নতকরণ, অধিকার সুরক্ষা, প্রতিবন্ধিতা বিষয়ে সচেতনতার প্রসার ও উন্নতি সাধন নিশ্চিতের লক্ষ্যে বাংলাদেশে প্রতিবছর নানা কর্মসূচির মধ্য দিয়ে দিবসটি পালিত হয়। এবার আন্তর্জাতিক প্রতিবন্ধী দিবসের প্রতিপাদ্য বিষয় ছলো- ‘অভিগম্য আগামীর পথে’।

প্রতিবন্ধী দিবসে বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, তৃণমূল থেকে জাতীয় পর্যায়ের বিভিন্ন উন্নয়নে প্রতিবন্ধীদের সম্পৃক্ত করা প্রয়োজন। প্রতিবন্ধিত্ব ও প্রতিবন্ধী ব্যক্তি সম্পর্কে সমাজে এখনও কিছু নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে। প্রতিবন্ধীরা তাদের মেধা ও যোগ্যতা প্রদর্শনের সুযোগ পাচ্ছে না। তাদের শিক্ষার হার বাড়লেও বেকারত্ব সেই অর্থে কমছে না। অনেক পরিবারে তাদের বোঝা হিসেবে দেখা হয়। প্রতিবন্ধী শিশুরা বিশেষ কোনো ক্ষেত্রে খুব দক্ষ হয়ে থাকে। তাই তাদের প্রতিবন্ধী হিসেবে চিহ্নিত না করে ‘বিশেষ শিশু’ হিসেবে দেখা উচিত।

জাতিসংঘে প্রতিবন্ধী ব্যক্তি অধিকার সনদ গৃহীত হওয়ার পর থেকে রাষ্ট্র ও সমাজে প্রতিবন্ধিতা ও প্রতিবন্ধী ব্যক্তি সম্পর্কে ধারণার পরিবর্তন ঘটেছে। এ সনদে স্বীকৃতি দিয়েছে, প্রতিবন্ধিতা কোনো অস্বাভাবিকতা নয়, বরং মানব বৈচিত্র্যের অংশ। প্রতিটি মানুষের সাথে অপর মানুষের মধ্যকার ভিন্নতার মত, প্রতিবন্ধিতাও ভিন্নতারই অংশ। এ সনদের মাধ্যমে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সমাজের মূল¯্রােতধারায় অংশগ্রহণ কার্যকর করার রূপকল্প ঘোষিত হয়েছে। প্রয়াস নেওয়া হয়েছে এ বিষয়ে সারাবিশ্বের মানুষকে সচেতন করে তোলার।

বাংলাদশে প্রতিবন্ধীদের প্রতি মানুষের ধারনার যে আমূল পরিবর্তন ঘটাতে সক্ষম হয়েছেন তিনি সায়মা ওয়াজেদ পুতুল। বাংলাদেশে অটিজম বিষয়ক জাতীয় কমিটির চেয়ারপারসনও তিনি। সেই সঙ্গে তাঁর পরিচালিত ‘সূচনা ফাউন্ডেশন’ বাংলাদেশে মানসিক স্বাস্থ্য উন্নয়ন ও সচেতনতা তৈরিতে কাজ করে যাচ্ছে। তিনি ডব্লিউএইচওর মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ক বিশেষজ্ঞ প্যানেলের সদস্য। মানসিক স্বাস্থ্য ও অটিজম নিয়ে কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ২০১৪ সালে তাঁকে ‘এক্সেলেন্স ইন পাবলিক হেলথ অ্যাওয়ার্ড’ প্রদান করে। বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে সৃষ্টিশীল নারী নেতৃত্বের ১০০ জনের তালিকায় স্থান করে নিয়েছেন বাংলাদেশের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কন্যা সায়মা ওয়াজেদ পুতুল।

সরকার প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার ও সুরক্ষা আইন-২০১৩ এবং নিউরো ডেভেলপমেন্টাল প্রতিবন্ধী সুরক্ষা আইন-২০১৩ নামে দুটি আইন পাশ করেছে। এ আইন অনুযায়ী কোনো প্রতিবন্ধী ব্যক্তির সম্পদ আত্মসাৎ করলে এবং প্রকাশনা ও গণমাধ্যমে প্রতিবন্ধী মানুষ সম্পর্কে নেতিবাচক শব্দ ব্যবহার করলে, তা দ-ণীয় অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে। এ ধরনের অপরাধের জন্য সর্বোচ্চ তিন বছরের কারাদ- ও পাঁচ লাখ টাকা জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে। এছাড়া কোনো ব্যক্তি অসত্য ও ভিত্তিহীন তথ্য দিয়ে প্রতিবন্ধী ব্যক্তি হিসেবে নিবন্ধিত হলে সর্বোচ্চ এক বছরের কারাদ- ও ১০ হাজার টাকা জরিমানাযোগ্য অপরাধে দ-িত হবেন। আর কোনো ব্যক্তি জালিয়াতির মাধ্যমে পরিচয়পত্র তৈরি করলে তার সর্বোচ্চ সাত বছরের কারাদ- ও পাঁচ লাখ টাকা জরিমানার বিধান রয়েছে।

প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের উন্নয়নের মূল¯্রােতধারায় সম্পৃক্ত করার জন্য ১৯৯৯ সালে জাতীয় প্রতিবন্ধী উন্নয়ন ফাউন্ডেশন গঠন করে তৎকালীন সরকার। বর্তমানে এ ফাউন্ডেশনকে প্রতিবন্ধী উন্নয়ন অধিদফতর’-এ রুপান্তর করা হয়েছে। প্রতিবন্ধী ফাউন্ডেশন ক্যাম্পাসে একটি করে প্রতিবন্ধী কর্মজীবী পুরুষ ও মহিলা হোস্টেল, অটিজম রিসোর্স সেন্টার ও অটিস্টিক স্কুল চালু করা হয়েছে। ফাউন্ডেশন থেকে ইশারা ভাষার ওপর প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। ফাউন্ডেশন ক্যাম্পাসে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ের শ্রবণ, বুদ্ধি ও দৃষ্টি প্রতিবন্ধী বিদ্যালয় চালু করা হয়েছে। দেশের ৫৫টি বুদ্ধি প্রতিবন্ধী বিদ্যালয়ের মাধ্যমে বুদ্ধি প্রতিবন্ধী ছাত্র-ছাত্রীরা শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ গ্রহণ করছে। অটিস্টিক ও বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী শিশুর বাবা-মা সন্তানের ভবিষ্যত নিয়ে চিন্তিত থাকেন। বিশেষ করে তাদের অবর্তমানে এই শিশুরা তাদের সম্পদের ব্যবস্থাপনা কিভাবে করবে তা নিয়ে। এ অবস্থা থেকে পরিত্রাণের জন্য অটিস্টিক ও নিউরো ডেভেলপমেন্টাল প্রতিবন্ধী সুরক্ষা ট্রাস্ট আইন-২০১৩ এর মাধ্যমে প্রতিবন্ধীরা তাদের অর্থ সম্পদ নিরাপদে ব্যবহার করতে পারবে।

প্রতিবন্ধী জনগোষ্ঠীর উন্নয়নে সরকার ব্যাপক প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। দেশের প্রতিবন্ধী জনগোষ্ঠীর কল্যাণে জাতীয় প্রতিবন্ধী ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে প্রতিবন্ধীদের চিকিৎসা সেবা কর্মসূচি বাস্তবায়িত হচ্ছে। এর আওতায় দেশের সকল জেলার ৭৩টি কেন্দ্রর মাধ্যমে প্রতিবন্ধী জনগোষ্ঠীকে বিনামূল্যে ফিজিওথেরাপি, অকুপেশনাল থেরাপি, হিয়ারিং টেস্ট, ভিজ্যুয়াল টেস্ট, কাউন্সেলিং প্রশিক্ষণ ও প্রতিবন্ধিতা সম্পর্কিত সমন্বিত বিশেষ শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। দেশের ৫৫টি বেসরকারি প্রতিবন্ধী বিদ্যালয়ের শিক্ষক কর্মচারীদের শতভাগ বেতন-ভাতা সরকারিভাবে পরিশোধ করা হচ্ছে। সমন্বিত বিশেষ কর্মকা-ে ফলে প্রতিবন্ধী স্কুলগুলোতে সার্বিক কর্মকা- আগের তুলনায় অনেক বেশি গতি সঞ্চার হয়েছে।

আমাদের দেশের এক বিরাট অংশ প্রতিবন্ধী। বিশেষ সুবিধা হিসেবে সরকারিভাবে তাদের প্রতিবন্ধী ভাতা চালু করা হয়েছে। সরকারি চাকুরিতে পাঁচ ভাগ কোটা প্রতিবন্ধীদের জন্য সংরক্ষণ করা হয়েছে। বেসরকারি চাকুরিতে প্রতিবন্ধীদের জন্য এ সুযোগ থাকা উচিত। কারন উন্নয়নের সুষম বণ্টন এবং তা সকল মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে না দেওয়া গেলে প্রকৃত উন্নয়ন সম্ভব হবে না। তাই প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের মূলধারার বাইরে রেখে দেশের সুষম উন্নয়ন সম্ভব নয়। তাদের শিক্ষাব্যবস্থা, বিনোদনসহ সব কার্যক্রমের প্রতি আমাদের বিশেষ নজর দিতে হবে।

প্রতিবন্ধীরা সমাজের বোঝা নয়, ওরা আমাদেরই সম্ভাবনাময় সন্তান। সরকারের পাশাপাশি সবাই একটু সচেতন হলে তারা আর পিছিয়ে থাকবে না। দেশের সমৃদ্ধি আনয়নে অবদান রাখবে। একজন সাধারণ মানুষের মতো যথার্থ সুযোগ এবং গুরুত্ব দিলে তারাও দেশের জন্য অনেক সম্মান বয়ে আনতে পারবে এবং স্ব স্ব ক্ষেত্রে প্রতিভার স্বক্ষর রাখতে পারবে। এতে বৃদ্ধি পাবে আন্তর্জাতিক পরিম-লে বাংলাদেশের মর্যাদা। সম্ভব হবে ক্ষুধা, দারিদ্র্য মুক্ত বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন পূরণ।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *