সরলকথা। রিন্টু আনোয়ার
দুষ্টুচক্রের কব্জায় ব্যাংকিংখাতে সর্বনাশ
দেশের ব্যাংক পরিচালকদের ঋণকা- এখন আর তেমন কোন অপরাধের ঘটনা নয়। সরকার বা কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে শক্ত কোনো পদক্ষেপ না নেয়ায় একে এক প্রকার অধিকারের মধ্যে নিয়ে এসেছেন তারা। এ ব্যাপারে অবশ্য পরিচালকদের পারস্পরিক বোঝাপড়া কিন্তু চমৎকার। ভাগেযোগে তাদের মধ্যে বেশ মিলমিশ। তারা পরস্পর যোগসাজশে একে অন্যের ব্যাংক থেকে ঋণ নিচ্ছেন এক প্রকার মামাবাড়ীর মতো। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্ট-বিআইবিএমের গবেষণায় দেখা গেছে, ব্যাংকিং খাতে সংঘটিত ৯০ শতাংশ অনিয়ম অপরাধে জড়িত ব্যাংকের নিজস্ব লোকজন। কারণ পরিচালকদের হাতেই রয়েছে ব্যাংকের বেশীরভাগ ক্ষমতা।
সম্প্রতি সংসদে অর্থমন্ত্রীর দেওয়া তথ্যমতে, শুধু ব্যাংক পরিচালকরাই ১ লাখ ৭১ হাজার ৬১৬ কোটি টাকার ঋণ নিয়েছেন। যা মোট বিতরিত ঋণের ১১ দশমিক ২১ শতাংশ। এর ফলে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ১ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। একই সঙ্গে সব ধরনের দায় এড়াতে এবং অনাদায়ী ঋণের পরিমাণ কমাতে ও ব্যাংকের ফিন্যানশিয়াল রিপোর্ট ভালো দেখাতে অবলোপন করা হচ্ছে হাজার হাজার কোটি টাকার ঋণ। একই সঙ্গে অর্থমন্ত্রী সংসদে ঋণখেলাপিদের তালিকাও প্রকাশ করেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের ঋণ তথ্যভান্ডারের গত সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তথ্যের ভিত্তিতে সংসদে ওই তালিকা প্রকাশ করা হয়। তালিকা অনুযায়ী ঋণখেলাপি প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ৮ হাজার ২২৩। সূত্র জানান, ব্যাংকগুলোর এখন পর্যন্ত বিতরণ করা মোট ঋণের পরিমাণ ১২ লাখ কোটি টাকা। এর মধ্যে বিভিন্ন কোম্পানির কাছে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের খেলাপি ঋণের পরিমাণ গত সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৯৬ হাজার ৯৮৬ কোটি ৩৮ লাখ টাকা। ৪ হাজার ১৯৮টি প্রতিষ্ঠান থেকে কোনো অর্থ আদায় হয়নি। বাকি প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছ থেকে মাত্র ২৫ হাজার ৮৩৬ কোটি ৪ লাখ টাকা আদায় হয়েছে। এর বাইরে একই সময় পর্যন্ত অবলোপন করা খেলাপি ঋণের পরিমাণ প্রায় ৫৫ হাজার কোটি টাকা। এ ছাড়া রয়েছে বেনামি ঋণ। এসব মিলে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)-এর তথ্যানুযায়ী, ব্যাংকিং খাতে মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ ২ লাখ ৪০ হাজার কোটি টাকা।
গোটা তথ্য খেলাপিদের জন্য আশা মোটেও জাগানিয়া। শাসন বা বাধার পরিবর্তে উল্টো প্রণোদনা পেয়ে চলছেন তারা। সভা-সেমিনারে নানা কড়া কথা বলা হলেও ঋণখেলাপিদের ছাড় দেওয়ার ব্যাপারে সরকারের পাকা সিদ্ধান্তের আলামত স্পষ্ট। তা ব্যাংক খাতকে বৈষম্যের খাদে ফেলে দিয়েছে। খেলাপিরা উৎসাহিত। আরো বেপরোয়া। এর বিপরীতে প্রকৃত বা ভালো গ্রাহকরা হচ্ছে নিরুৎসাহিত। হতাশ। ব্যাংক পরিচালকরা অন্য ব্যাংক থেকে বিপুল পরিমাণে ঋণ নিচ্ছেন না। তারা প্রত্যেকেই বড় ব্যবসায়ী। ব্যাংক ব্যবসার পাশাপাশি অন্য ব্যবসাও তাদের কব্জায়। নিজেদের ব্যবসার প্রয়োজনে তারা নিজের ব্যাংক থেকে ঋণ নিচ্ছেন ফ্রিস্টাইলে। স্বাভাবিকভাবেই এতে অন্য গ্রহীতা বঞ্চিত হচ্ছেন।
বেসরকারি ব্যাংকের পরিচালকদের বেশির ভাগই দেশের প্রভাবশালী ব্যবসায়ী। আগে পরিচালকরা নিজ ব্যাংক থেকেই বেশি মাত্রায় ঋণ নিতেন এবং পরিশোধ করতেন না। যখন খেলাপি হয়ে যেত, তখন বেনামি ঋণ সৃষ্টি করে ওই ঋণ পরিশোধ দেখাতেন। আবার অনৈতিকভাবে নিজেদের ঋণের সুদ মওকুফ করে নিতেন। পরিচালকদের এ অনৈতিক কার্যক্রম ঠেকাতে নিজের ব্যাংক থেকে কী পরিমাণ ঋণ নেওয়া যাবে তার একটি সীমা বেঁধে দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। বর্তমানে একজন পরিচালকের নিজের ব্যাংক থেকে শেয়ার পরিশোধিত মূলধনের ৫০ শতাংশ ঋণ নেওয়ার বিধান রয়েছে। তবে এক ব্যাংকের পরিচালকের অন্য ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়ার ক্ষেত্রে এ রকম কোনো সীমা টানা নেই। পরিচালকরা কাজে লাগিয়েছেন এই সুযোগ।
সম্প্রতি খেলাপি কমিয়ে আনতে এই খেলাপিদের ২ শতাংশ হারে ডাউন পেমেন্টের সুবিধা দিয়ে ঋণ নিয়মিতকরণসহ আরও নানান সুবিধা দেওয়া হয়েছে। এতে খেলাপি ঋণ কমেনি। আরো বেড়েছে। তাদের ঋণ দেওয়ার সময় যাচাই-বাছাই থাকছে না। রাজনৈতিক সংযোগ থাকা ঋণগ্রহীতারা এমনিতেই প্রভাবশালী। ব্যাংকের পরিচালক বা ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা তাদের শুধু ঋণের ব্যবস্থাই করেন না। ক্ষেত্রবিশেষে তোয়াজও করেন। নিষ্ঠুর ও তামাশাময় এ দৃষ্টান্ত ভাঙার কোনো আলামত নেই।
এ সংক্রান্ত তথ্য বড় ভয়াবহ। দেশে বর্তমানে তফসিলি ব্যাংক ৬০টি। এগুলোতে ঋণগ্রহীতা এক কোটি ছয় লাখ ৫৫ হাজার ৪৫৯ জন। আর পরিচালক এক হাজারের মতো। এর মধ্যে ৫৫টি ব্যাংকের পরিচালকরা অন্য ব্যাংক থেকে এবং ২৫ ব্যাংকের পরিচালকরা নিজ ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়েছেন। দেশে বর্তমানে মোট আমানতকারী ১০ কোটি তিন লাখ ৩৭ হাজার ১৯৬ জন। মোট আমানতকারীর তুলনায় পরিচালকের সংখ্যা একেবারে সামান্য। অথচ ঋণ হাতানোতে তারাই শীর্ষে। মাত্র গুটিকয়েক এই ব্যাংক পরিচালক বিভিন্নভাবে ও মিলেমিশে ঋণ নিয়েছেন প্রায় এক লাখ ৭৩ হাজার ২৩১ কোটি টাকা। এসব ঋণের বড় অংশ খেলাপি হলেও বছরের পর বছর তা নিয়মিত হিসেবে প্রদর্শন করে যাচ্ছেন তাঁরা। এভাবে খেলাপি হয়েও ব্যাংক পরিচালক পদে বহাল তারা। নন-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠানেও চলছে এমন ঋণ কব্জার মহাযজ্ঞ।
সাম্প্রতিক এক তথ্যে তাদের ঋণ হাতানোর ভয়ানক খবর প্রকাশ হয়েছে। এতে দেখা যায়, দেশের ১০ কোটি আমানতকারীর ব্যাংকে জমানো প্রায় পৌনে দুই লাখ কোটি টাকাই ঋণ হিসেবে নিয়ে নিজেদের পকেটে পুরেছেন মাত্র কয়েক শ ব্যাংক পরিচালক। দেশের উন্নয়নে অবদান রাখার বাহানায় ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করে এই দুস্কর্মটি চালিয়েছেন তারা। এসব ঋণের বড় অংশ খেলাপি হলেও বছরের পর বছর তা নিয়মিত হিসেবে প্রদর্শন করা হচ্ছে। তারা ব্যাংকের পরিচালক হনই ব্যাংক থেকে ঋণ হাতিয়ে নিতে। ডিভিডেন্ড পাওয়ার আশায় তারা ব্যাংকের শেয়ার কেনেন না। ডিভিডেন্ড পাওয়ার আশায় শেয়ার কিনলে তাঁরা কখনো ঋণ নেওয়ার চিন্তা করতেন না। কয়েক কোটি টাকা পুঁজি নিয়ে ব্যাংকের পরিচালক হয়েছিলেন এমন অনেকেই এখন শত শত কোটি টাকার মালিক। আর তা সম্ভব হয়েছে ব্যাংক থেকে নামে-বেনামে ঋণ বের করে নেওয়ার কারণেই। শুধু পরিচালকরা নন, ব্যাংক থেকে তাঁদের আত্মীয়-স্বজন ও বন্ধুবান্ধবও ক্ষমতার জোরে নিয়মবহির্ভূত ঋণ নিয়েছেন। অনৈতিক চাপ ও প্রভাব বিস্তার করে নেওয়া ঋণ তাঁরা ঠিকমতো ফেরতও দেন না। পুনঃ তফসিল করে বছরের পর বছর নিয়মিত রাখতে বাধ্য করেন।
সম্প্রতি আরেকটি বেসরকারি ব্যাংকের চেয়ারম্যানসহ তিনজন পরিচালকের স্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানে ২০৫ কোটি টাকা ঋণ অনিয়মের তথ্য উদ্ঘাটন করে বাংলাদেশ ব্যাংক। নিজের খেলাপি প্রতিষ্ঠান বিক্রি ও নামস্বর্বস্ব প্রতিষ্ঠান বানিয়ে নামমাত্র জামানতে এই ঋণ বের করে নেওয়া হয়েছে। বেসরকারি একটি ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে নতুন আরেকটি ব্যাংকে ১০ কোটি টাকার শেয়ারে বিনিয়োগ করার অভিযোগে সম্প্রতি মার্কেন্টাইল ব্যাংকের পরিচালক পদ থেকে একজনকে অপসারণ করে বাংলাদেশ ব্যাংক। একই ব্যাংকের আরেকজন পরিচালক অন্য দুটি ব্যাংকে খেলাপি হয়েও দীর্ঘদিন পরিচালক পদে বহাল ছিলেন। এ ছাড়া কয়েকটি ব্যাংকের আরো কিছু পরিচালক খেলাপি হলেও আদালতে রিট করে পরিচালক পদে দিব্বি বহাল আছেন। এই নৈরাজ্যের প্রভাব পড়ছে বেসরকারি বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানে। সৎ উদ্যোক্তা ও সাধারণ ব্যবসায়ীরা পর্যাপ্ত ঋণ পাওয়া থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
যারা ব্যাংকের মালিক, তারাই ব্যবসায়ী। তাদের কেউ কেউ আবার আইন প্রণেতাও। এর ফলে জবাবদিহি নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়ে। গত কয়েক বছরে ব্যাংকে পরিচালকদের হস্তক্ষেপে বেশ কিছু আলোচিত জালিয়াতির ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে কিছু পরিচালকের স্বার্থসংশ্লিষ্টতায় সোনালী ব্যাংকে ঘটেছে হলমার্ক কেলেঙ্কারি। বেসিক ব্যাংকে হয়েছে নজিরবিহীন লুটপাট। কয়েকটি ব্যাংকের পরিচালকদের সংশ্লিষ্টতায় ঘটেছে বিসমিল্লাহ গ্রুপের জালিয়াতি। পরিচালকদের হস্তক্ষেপে সরকারি ব্যাংকের সিএসআরের টাকা নিয়ে নয়ছয় হয়েছে। বিভিন্ন ব্যাংকে পরিচালকরা প্রভাব খাটিয়ে জামানতের সম্পদ ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে কয়েক গুণ বেশি দেখিয়ে শত শত কোটি টাকার ঋণ বের করে নিয়েছেন। এখনও নিচ্ছেন। সংঘবদ্ধ চক্রের সুকৌশলে ব্যাংকের টাকা লুট রুখতে তেমন বেগ পেতে হয় না। ভুয়া কাগজপত্র মর্টগেজ হিসেবে দেখিয়ে বিপুল অঙ্কের ঋণ নিয়ে যাচ্ছেন এই জালিয়াতরা। আবার কোনো মর্টগেজ ছাড়াই করপোরেট গ্যারান্টির নামে দেদার ঋণ দিচ্ছে ব্যাংকগুলো। যা যাচ্ছে তা আর ফিরে আসছে না।
ব্যাংকিং খাতকে এই আপদমুক্ত করার ইচ্ছা সরকারের আছে কি-না, এ নিয়ে সংশয়-সন্দেহ কেটে গেছে আরো আগেই। কিছুটা নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা-নমুনাও অবশিষ্ট নেই। অর্থমন্ত্রী কোনো ঋণখেলাপিকে জেলে নিতে চান না, সেটা পরিস্কার করেই বলেছেন। কথা মতো তিনি তাদের শুধু রক্ষা করছেন না। একের পর এক প্রণোদনাও দিয়ে যাচ্ছেন। এতে খেলাপিরা উৎসাহিত। আর মর্মাহত-পীড়িত হচ্ছে অন্যরা।
লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট


