তৈলমর্দন | রম্যগল্প । আব্দুল কাদির চৌধুরী বাবুল

তৈলমর্দন | রম্যগল্প । আব্দুল কাদির চৌধুরী বাবুল

রম্যগল্প । আব্দুল কাদির চৌধুরী বাবুল

তৈলমর্দন

অনেক দিন গত হইলো গল্প লিখা হয়ে ওঠে না।

দুই একটা কবিতা আর গান লিখিয়া আপনাদের নিরস আনন্দ দিবার ব্যর্থ চেষ্টা করিয়া যাইতেছি বটে। আমার নিরস লেখায় কেহ কিয়ৎ আনন্দ পাইলেও অনেকেই মুখ ভেঙচিয়া এড়াইয়া যান। কবি নজরুল বলিয়া ছিলেন, আমি গানের পাখি, অনবরত গান করিয়া যাই, কেহ শুনে আর নাহি শোনে।’ আমিও আর কী করিবো, দুই এক জনের ভালবাসা (লাইক/কমেন্ট) পাইবার নেশায় লেখিয়া যাই।

যাগগে, ভাবতেছিলাম গল্প লিখিবো, না-কি আজকের ভ্রমণ বিষয় নিয়া লিখিবো, তাহা ভাবিতেছি। গল্প না হয় রচনা হইলেও, হইবে তো! আজ যাইতেছি শিক্ষা সফরে, প্রাচীন বাংলার রাজধনী সোনার গাঁ। বিদ্যালয়ের আদরের ছাত্রছাত্রী আর সহকর্মীগণ সঙ্গে রহিয়াছেন। বাসের ভিতরে গানের খুরাক মাইকখানা ও সাউন্ড বক্সটা কেন জানি অচল হইয়া আমাদিগকে নিরস করিয়া দিলো। কী আর করি! সীটে বসিয়া আছি নিরস গানের পাখিরা। মুখটা সকলেরই গোমরা। আমাদের অন্য অগ্রজ বাসটি গানের মজমা চালিয়ে যাইতেছে, হইহুল্লোর চলিতেছে। আমাদের কর্ণকুহরে আসিয়া হতাস করিয়া যাইতেছে। আমাদের রাস্তায় আর কী-বা করারই আছে! আর গন্তব্যে পৌঁছতে পৌঁছতে বাকি সময়টা কলমই চলুক। গিলুতে একটা গল্প গতরাতে উদয় হইয়াছিলো। তাহাই লিখিতেছি।

গল্পের শিরোনাম দিয়াছি তৈলমর্দন। আগামী কল্য আজকের ভ্রমণ নিয়া যৎকিঞ্চিত গল্পের অবতারণা করিবো। আজ তৈলমর্দন নিয়াই লিখিয়া নেই, কেমন?

গল্পের বিষয়টা তৈলমর্দন। গতরাতে টি স্টলের টেবিল টকে বিষয়টি উঠিয়া আসে এক বন্ধুর মুখে। কথার পীঠের কথায় এক বন্ধু প্রস্তাব করিলেন, তৈলমর্দনে আজকাল যাহারা শ্রেষ্টত্ব অর্জন করিয়াছেন, আমরা কেনো তাহাদের সেরা কৃতিত্বের জন্য ক্রেস্ট সংবর্ধনা দিতেছি না? আমি কিছুটা নড়িয়া বসিলাম, কী ব্যাপার! বন্ধু কী আমাকে উদ্দেশ নিয়া এমন প্রস্তাব করিয়া বসিলো না-কি! আজকাল ফেসবুকের কল্যাণে তৈল মারার বিষয়টি সরাসরি নজরে পড়িয়া যায়। এখন কে কাহারে তৈলমর্দন করিয়া আপন লাভে অন্যকে বাঁশ দিতেছেন তাহাও ভাসিয়া ওঠে। তৈলমর্দনের হিসাবটা পূর্বে একান্তই নিরবে ঘটিলেও আজকাল দৃষ্টিতে পরিস্কার। তৈল বাবুদের কথা এখন সর্বত্রই চাউর হইতেছে। পাবলিকও বুঝিয়া গিয়াছে। বাপরে বাপ! পাবলিকের হিসাব! তারা বুঝিয়া গিয়াছে তৈল বাবুদের বড্ড বাড়াবাড়ির কারণে বাজারেও ভোজ্য তৈলের দাম বৃদ্ধি পাইয়াছে। বন্ধুর কথায় রসিকতা! সাংবাদিক বন্ধু বাজার প্রতিবেদন তৈরি করতে গিয়া তাহার অভিজ্ঞতার কথা শেয়ার করিতে কহিলেন, বাজারি লোকেরা বলাবলি করিতেছে, আজকাল নির্বিচারে যে হারে স্বার্থ হাসিলে বস কিংম্বা ধনকুবেরদের তৈলমর্দন চলিতেছে, তাতে নাকি ঘি’য়ের তুলনায় তৈলের দাম বৃদ্ধি পাইয়া বাজারে ভোজ্য তৈলের সংকট যাইতেছে। এতে করিয়া গরীব পাবলিকরা বাজারে নাকি তৈল সংকটের আশঙ্কায় ভোগিতেছেন। আমি বন্ধুর কথায় চিন্তা করিয়া কিছু উদ্বার করিতে পারিলাম না। বন্ধুর নিছক যুক্তি শোনিয়া অন্যরা সরব হইয়া উঠিলেন। অারেক বন্ধু সাংবাদিক বন্ধুকে সমর্থন করিয়া কহিলেন, তাহলে একটা সার্চ কমিটি অচিরেই গঠন করা অত্যাবশ্যক। আমাদের উপজেলায় যাহারা তৈলমর্দনে চমৎকার যোগ্যতার সাক্ষর রাখিয়া যাইতেছেন, তাহাদের বাছাই করিয়া অচিরেই সংবর্ধনা দেওয়া দরকার। তাহা না হইলে তৈলবাজ তৈরীতে অন্যরা নিজেকে উৎসাহীত করিবে না।

অধিকাংশ বন্ধু একমত পোষণ করিলেও আমার বেলায় উল্টোটা গঠিবে তা নয়। তবে নিম্ন আয়ের বাজারি পাবলিকের কথাটা মাথায় কটকট করছিলো।

আমি বন্ধুদের মতে একমত পোষণ করিয়া কহিলাম, তৈল না মর্দন করিলে চাকুরির বেলায় মনিবের মনে স্থান নাই, বেতন বাড়ে না, ইনক্রিমেন্ট লাগে না, সুবিধা পাওয়া যায় না, ধনকুবেরদের কাছে স্বার্থ হাসিল হয় না, নেতার কাছে সুবিধা পাওয়া যায় না। কতো কী সমস্যা ! তৈলটা কাঁচা হউক আর ভাজা হউক ঠিকমতো যাহারা সামনে বসিয়া মর্দন করিতে পারিবেন, তাহারাই নিজেকে দুই চারটা ছোটকাটো কর্ম করিয়াও তেলতেলিয়ে বামশ মাছের মতো উপরে উঠিয়া আসিতে পারিবেন। স্বার্থক জায়গায় নঞর্থক মানুষদেরও জায়গা হইয়া যায়। আমার কথা শ্রবণ করিয়া কাহারও হয়তো ভালো লাগিতেছে না। কেউ হয়তো মনে মনে কহিতেছেন হায়রে পণ্ডিত! আচ্ছা যাহাই কহিবেন, তাহাতে কী! যাহা হউক আমার কথাটা বেশী নয়।

আমি বন্ধুকে কহিলাম, তৈল ছাড়া গরিব মানুষদের রান্না হয় না। তৈলমর্দন একটা সর্বজনীন বাক্য, তাহা সমাজ হইতে উঠিয়া যাক যাহা আমিও চাই না। তা না হইলে অযোগ্য মানবদের কষ্টের কারণ হইতে পারে। যোগ্য স্থানে অযোগ্যদের স্থান কেমনে হইবে? অবৈধ সুবিধা কপোলে কেমনে জুটিবে?
আমি দাঁড়াইয়া কহিলাম, সুহৃদ বন্ধুগণ আপনারা চার্জ কমিটি গঠন করিয়া তৈল বাবুদের সংবর্ধিত করিবেন তাহাতে আমার কোনও দ্বিমতপোষণ করছি না। তবে আমার প্রস্তাব থাকিবে, তাহাদের সংবর্ধনা দেওয়ার প্রাক্কালে আমার আরজখানা আপনারা উঠাইয়া ধরিবেন। তাহারা যেন গরিব মানুষের ভোজ্য তৈল, তৈলমর্দনে ব্যবহার না করিয়া ডালডা কিংম্বা ঘি মর্দন করে। চার্জ কমিটি গঠনে সর্বসম্মতিক্রমে সকলই ঐক্যমত্য পোষণ করিলেন। কমিটি গঠন করিবার কল্পে যখন আলোচনা হইতেছিলো, আমাদের জ্যেষ্ঠ বন্ধু বিভিন্নভাবে বুঝাইতে চাইলেন যে, তাহাকে যেনো চার্জ কমিটির প্রধান করিয়া কমিটি গঠন করা হয়। সেই জ্যেষ্ঠ বন্ধু দাড়াইয়া সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করিতে লাগিলেন। তিনি কহেন, কমিটি গঠন কেন্দ্রিক যে অভিজ্ঞতা তাহার রহিয়াছে তাহা দেশের মধ্যে দশজন খুঁজিয়া বাহির করিলে তাহার নামটিও তালিকায় আসিতে বাধ্য। সংগঠন বা কমিটি গঠন বা পরিচালনা বিষয়ে সেরা অভিজ্ঞতার নানা ফিরিস্তি অনবরত বক্তব্য দিয়া যাইতে লাগিলেন। তিনি জোর গলায় কহিলেন, “শুনেন, আমি আপনাদের বলি— কমিটি গঠন করা আমার কাছে কোনও বিষয় বলিয়া মনে করিতেছি না। প্রয়োজনে কীভাবে সংগঠন গঠন করা, কিংম্বা ভাঙন তাহা আমার প্রভূত জানা রহিয়াছে। আমি বত্রিশটা সংগঠনে তেত্রিশ বার সভাপতিত্ব করিয়াছি। সংগঠনের কাজে সংসার ত্যাগ করিতে পারি” আমরা তাহার নানান অভিজ্ঞতার বর্ণনা ধৈর্যচিত্তে সকলই শ্রবণ করিতেছিলাম। তিনি শেষ বক্তব্য প্রদান করিয়া আপন আসন গ্রহণ করিলেন। তাহার বক্তব্য শ্রবণ করিতে করিতে কাহারও কাহারও তন্দ্রা আসিয়া নিদ্রায় যাওয়ার উপক্রম হইয়া গেলো। কেহ ফেসবুকে ঢোকিয়া ঘুটঘুট করিলেন। আমাকে একবন্ধু ইনবক্স করে কহিলেন, “বিকল্প নেই”।

অভিজ্ঞ জ্যেষ্ঠ বন্ধুর অনেক গুণ; তার বিকল্প আসলেই নেই। পেছনের ইতিহাস গড়গড় করিয়া বলিয়া যাইতে পারেন। যেখানেই সুযোগ হয় তাহার কির্তন বাজিয়া উঠে। জেলা উপজেলায় প্রভুত সংগঠন তাহার হস্তে জন্ম হইয়াছে সেই অর্থে তিনি বিভিন্ন সংগঠনের জনক বলিয়াও দাবী করিয়া থাকেন। এই অর্থে তাহার বিকল্প কেহ হইতে পারে তাহাও খুঁজিয়া পাওয়া মুশকিল বটে।

উপস্থিত এক সাংবাদিক বন্ধু তাহার বক্তব্যে উপর দ্বিমত করিয়া কমিটি গঠনে গণতন্ত্রিক উপায় দাবী করিয়া বসিলেন। টি টেবিলে আমরা যে কয়েক জন আড্ডায় বসিয়া ছিলাম, তাহাদের মধ্যে শিক্ষক, সাংবাদিক ও ব্যবসায়ীক বন্ধুরাও ছিলেন। এক ব্যবসায়ী বন্ধু দাড়াইয়া কহিলেন, আমরা পূঁজি খাটাইয়া ব্যবসা-বাণিজ্য করিয়া আসিতেছি। আমরা বুঝি, মাল থকিলে কাস্টমার থাকিবে। গুড় থাকিলে মাছি থাকিবে। গুণ থাকিলে কদর থাকিবে।’ আমরা তৈলমর্দন বিষয়ে অনভিজ্ঞ। তবে ভোজ্য তৈলের দাম বৃদ্ধি পাওয়ার যে সকল কারণ আমাদের হস্তে রহিয়াছে, তাহার মধ্যে তৈলবাজদের অতিরিক্ত ভোজ্য তৈলের ব্যবহার আমরা চিহ্নিত করিয়াছি। ব্যবসায়ী বন্ধু কহিলেন, তৈলমর্দনে ভোজ্য তৈলের ব্যবহার কমানোর সুপারিশের বিষয়ে আমিও একমত।

এই বিষয়ে তৈলবাজ সংবর্ধনা কমিটির সদস্য রাখিলে আমি অাপত্তি করিবো না। ব্যবসায়ী বন্ধুও চাহেন সুশীল বন্ধুদের সঙ্গে অঙ্গ মিশাইয়া রুচিশীল হইতেন। তাহারও খায়েশ, চার্জ কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত হইতেন। আরেক তরুণ শিক্ষক বন্ধু তেজদীপ্ত কন্ঠে কহিলেন, বড় একটা তৈলবাজ সংবর্ধনার আয়োজন হইবে, আমরা এই ক’জন মিলিয়া কমিটি গঠন করিলে অনেকের নিকট কমিটিটি অনাস্থায় পতিত হইতে পারে। অতএব, কমিটি গঠনের বিষয়ে আমার প্রস্তাব হইলো, শিঘ্রই মাইকিং করিয়া কমিটি গঠনের তারিখ ঘোষণা দিতে হইবে, সেই তারিখেই তৈলবাজ চার্জ কমিটি ও সংবর্ধনা কমিটি গঠন করা হইবে। অন্যতায় কমিটি গঠন লইয়া রাজনীতির সৃষ্টি হইবার আশঙ্কা রহিয়াছে। কুচক্রিমহল ঢাকায় বসিয়া এলাকায় দাঙ্গা লাগাইবার কত ফঁন্দি করিয়া বেড়াইতেছে। এই সুযোগ নিশ্চয়ই হাতছাড়া করিবে না। তাই আমার বদ্ধমূল ধারণা এলাকায় দাঙ্গা হাঙ্গামা ঘটিতে পারে। বন্ধুত্বে ফাটল আসিতে পারে। কী না অদ্ভুদ আমরা, কেহ লেজ উঠাইয়া পাঠারমতো চেড়েঙ্গি মারিলেই, বাদরেরমতো হাত তালি দিতে শুরু করিয়া দেই। বুঝে আর না বুঝে বাহ! বাহ! দিতে থাকি। আমরা প্রসংশায় পঞ্চমুখ হইয়া বলি, বাপরে! তাহার কী দৌড়! ষাড়েও পারিবে না। কিন্তু পাঠা যে শয়তানের ছায়া দেখিয়া জানবাজি চেড়েঙ্গি মারিয়াছে তাহা বিচার্য হয় না। আমাদের মধ্যেও কেহ কেহ এইরম শক্তি দেখিয়া তৈলমর্দনে ভোজ্য তৈল লইয়া দৌড়াইতে থাকেন। এখন হইতে আর ভোজ্য তৈল ব্যবহার করা যাইবে না। ইহার জন্য কঠিন আইন করিবার দরকার। প্রশাসনে স্মারকলিপি দেওয়া যাইতে পারে। গরীবের কথা চিন্তা করিয়া তৈল মর্দনে ভোজ্য তৈল ব্যবহার না করার দাবী স্থানীয় প্রশাসনের মাধ্যমে সরকারের কর্ণপাত করা যাইতে পারে। আমার কথায় তৈল গ্রহিতা ও তৈল দাতা উভয় বিরক্ত হইয়া গালমন্দ করিতেছেন, তাহা বুঝিতেছি।
আরে —! কে গালি দিলো, তাহা আমার কর্ণে না আসিলেই হইলো।

তরুন শিক্ষক বন্ধুর কথাটা কাহারও কাছে অযুক্তিক মনে হইলো না। সবাই এক বাক্যে বলিয়া উঠিলেন, ঠিক’।

ঠিক’ শব্দটিকে ঠিক ধরিয়া টেবিল টকে প্রস্তাব আসিলো কীভাবে মাইকিং হইবে, কোথায় মিটিং এর স্থান নির্ধারণ হইবে? কাহারা দাওয়াত প্রদানের দায়িত্ব গ্রহণ করিবেন, তাহা নিয়ে আলোচনায় আসা দরকার। ইতিমধ্যে টি-বয় আসিয়া জিজ্ঞাস করিলো,

____ আপনেরা আর চা- খাইবেন?

না খাইলে টেবিলখানা ছাড়িয়া দেন।”
জ্যৈষ্ঠ বন্ধু অনুরোধ করিয়া কহিলেন, আমরা গুরুত্বপূর্ণ এক মিটিং এ বসিয়াছি, আরও ঘন্টাখানেক বসিবো।

টি-বয় অনুরোধের নরম বাক্য শোনিয়া গরম হইয়া কহিলো–

—— আরে ভাই এক কাপ চা খাইয়া তিন ঘন্টা বইয়া থাকবেন, আরও সময় চাইতেছেন; এইটা কী সভাকক্ষ, যে আপনেরা বইয়া বইয়া মিটিং করিবেন!

জ্যেষ্ঠ বন্ধু চক্ষু রাঙা করিয়া কহিলেন–

——- বেটা কি কইবে ক’ দেখি?

——- স্যার, আরও নয় কাপ চা দিয়ে দেই?

জ্যেষ্ঠ বন্ধু টি-বয়কে কহিলেন, বেটা তুই শক্তের ভক্ত বুঝেছি। যা- এবার, পরে আসিস।

ইতিমধ্যে অামাদের টি-টেবিল আড্ডায় তিন প্রভাষক বন্ধু আসিয়া উপস্থিত হইলেন। জ্যেষ্ঠ বন্ধু, তিন প্রভাষক বন্ধুকে সাদরে গ্রহণ করিয়া কহিলেন—- আপনাদের আগমনে আমরা আরও সমৃদ্ধ হইলাম। বসুন!

জ্যেষ্ঠ বন্ধু, টি-বয়কে ডাকিয়া কহিলেন– চা নয়টা নয়, সংখ্যায় আরও বাড়বে। এক ডজেন চা, জলদি নিয়ে আয়!

টি-বয় মাথা নাড়িয়া কহিলো, দিতাছি, স্যার।

প্রভাষক বন্ধুগণ চেয়ার টানিয়া বসিলেন।

তিনজনই ভিন্ন ভিন্ন বিষয়ে ডিগ্রি গ্রহণ করিয়া স্থানীয় মহাবিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করিতেছেন।

সন্ধ্যার আড্ডায় আগেপাছে প্রতিদিনই সুশীল বন্ধুরা আসিয়া উপস্থিত হইবেন, তাহাতে সন্ধেহ নাই।

প্রভাষক বন্ধুগণের চলাফেরা একই সঙ্গে। কলেজে শিক্ষকজুট করিয়া একই সাথে চলিলেও মনস্তাত্ত্বিক বিষয়ে তাহাদের ঢেড় বিভেদ রহিয়াছে।

আলোচনায় আসিয়া প্রথমেই বাংলার প্রভাষক বন্ধু জ্যেষ্ঠ বন্ধুকে লক্ষ্য করিয়া কহিলেন, ভাষার মাসে ‘টেবিল কথা’ কোন্ বিষয়ের উপর উঠিয়া আসিলো?

——-নিশ্চয় ভাষা নিয়াই কথা কহিতেছেন?

জ্যেষ্ঠ বন্ধু হাসিয়া কহিলেন, সরি!

বিষয়টি তাহা নয়। আমরা তৈলবাজ সংবর্ধনা বিষয়ে যুগৎপৎ আলোচনায় লিপ্ত রহিয়াছি।

ইতিমধ্যে আপনাদের আগমন আমাদের শক্তি বৃদ্ধি পাইয়াছে।

জ্যেষ্ঠ বন্ধু আমাদের কর্মসূচীর সারাংশ বর্ণনা করিয়া তিনি বিষয়টি নিয়া আলোচনায় প্রবেশ করিবার জন্য সকলকে অনুরোধ করিলেন।

বাংলার প্রভাষক বন্ধু বিষয়টিকে তুড়ি মারিয়া ফেলিয়া না দিলেও ভাষার মাসে তৈলবাজদের সংবর্ধনার অায়োজন না করিয়া, তিনি মাসখানেক পরে আয়োজন করিবার প্রস্তাব করিলেন।

তাহার প্রস্তাব শুনিয়া আড্ডায় কিছুটি সুপ্তি ঘটিলো।

এই ফাঁকে পেঁচা নাকের টি-বয়টি চা নিয়ে হাজির। চা টেবিলে রাখিতে রাখিতে কহিলো— স্যার, দুধ চিনি অতিরিক্ত লাগলে আমারে কইয়েন, স্যার! আমি এনই খাড়া আছি—-।

টি-বয় পূর্ব থেকেই ফাঁকে ফাঁকে আমাদের আলোচনার বিষয়বস্তু শ্রবণ করিতেছিলো। দীর্ঘ আলোচনায় তাহার বোধগম্যতা যতেষ্ট হইয়াছে। সে বুঝিতে সক্ষম হইয়াছে, তৈলমর্দনে যাহারা অভিজ্ঞ তাহা দিগকে ক্রেস্ট সংবর্ধনা দেওয়া হইবে। সংবর্ধনার সাথে মাল্য দেওয়া হইবে।

টি-বয় চায়ের পেয়ালা ফেরত নেওয়ার কায়দায় আসিয়া সকলের উদ্দেশ্যে কহিলো, স্যারগণ— আমার নামটা দিয়েন, তৈলমর্দনে আমারমতো কেউ-ই পারবে না। আমি ছোট থাইকা এই মালিক সাবের চাকরি করতাছি। হেই কাল থেইকা আমার মালিকসাবের পা’য়ে তেল মালিশ কইরা দেতাছি। মালিকসাব আরাম পাইন, তাই তাইনের বিবির হাতেও মালিশ নেইন না। আমি খুব ভালা তেলমর্দন করতে পারি।’

আপনারা আমারে একখান মালা ও কেরেস্ট দিবেননি স্যার?

সবাই নিরবতা ভাঙিয়া হো হো হি হি করিয়া হাসিয়া উঠিলেন। টি-বয় বুঝিয়া উঠিতে না পারিয়া দাঁড়াইয়া কাছুমাছু খাইতেছিলো। তাহার বাক্য শুনিয়া ইংরেজির প্রভাষক কহিলেন, হাউ নাইস! ইউ হ্যাভ এ্যন এক্সেলেন্ট আইডিয়া। ইউর ডিজেয়ারড উইল বি ফিলড! বাংলার প্রভাষক বন্ধু কেমন জানি চেতিয়া কহিলেন, ভাষার মাসেও বন্ধু ইংরেজি! ছি!

বাংলায় কহিলে আমরা সকলেই বুঝিতে সক্ষম হইবো। বাংলার মর্যাদাও বৃদ্ধি পাইবে।

বন্ধু, মনে রাগ পুষিয়েন না। ভাষার মাসে অন্তত বাংলা বলার চর্চা করিতে না পারিলে ক্রমে ক্রমে আমরা হাইব্রিড বাঙালি হইয়া পড়িবো।
ইংরেজি বন্ধু কিছুটা মনক্ষুন্ন হইলেন। তিনি কহিলেন, দ্যাট’স ও-কে, আমরা ইংরেজি লিটারেচার পড়িয়াছি, বাংলা অতশত চর্চা করার সুযোগ হইয়া উঠে নাই। আমরা ইংরেজিতে বলিতে-লিখিতে অভ্যস্ত হইয়াছি। তাই বাংলা অতটা আমাদের আসে না।

ইংরেজির প্রভাষক বাংলার প্রভাষক বন্ধুকে ঠেশ দিয়ে কহিলেন, আপনিতো একটা ল্যাংগোয়েজই জানিয়া পতপত করিতেছেন, সেই বাংলা!
আমরা ইংরেজি বাংলা দু-টাই পারি!

বাংলার প্রভাষক যেনো লাল মরিচের ঝালের মতো জ্বলিয়া উঠিয়া কহিলেন, আরে কি যে শুনাইলেন না! ফেসবুকে আপনি এক লাইন বাংলা লিখিলে বানান ভুল করেন চারটা। কোনটি ই-কার, কোনটি ঈ-কার হবে তাও বুঝেন না। ‘পরীক্ষা’ সন্ধিজাত শব্দকে পরিক্ষা লিখিয়া সেদিন তুলাধুনা খেয়েছেন। তা-তো ফেসবুকে দেখেছি! যুক্তি দিয়ে বলেছেন—– সব এখন ই-কার দিয়ে লিখতে হবে। বাহ! কোথায়? কে এমন বলেছেন? ছি! আর আমার সাথে বাংলা নিয়ে যোগ্যতা দেখাচ্ছেন?

তৃতীয় প্রভাষক বন্ধু দীর্ঘক্ষণ কেবল কান পাতিয়া শ্রবণ করছিলেন। তিনি হিসাবি মানুষ হিসাবে বেহিসাবি কথাও কহেন না। তিনি দেখিলেন, ইংরেজি বাংলা লইয়া প্রভাষক দুই বন্ধুর রেষারেষি টেবিল টকেও উষ্ণ আকার ধারণ করিয়াছে।

তিনি তাহাদের থামাইয়া কহিলেন, আমরা তর্কে বহু দূর চলিয়া গিয়াছি। আমাদের মূল আলোচনা সমাপ্তি ঘটেনি।

তৈলমর্দন বিষয়ে আলোচনা ও তৈলবাজদের সংবর্ধনা কীভাবে অনুষ্ঠিত হইবে তাহা কেবল শেষ হইলে অন্য আলোচনা। নতুবা কথার পিঠে কথা চলিতে থাকিবে। কমিটি গঠনে করণীয় হিসাবে জ্যেষ্ঠ বন্ধুর দিক নির্দেশনার বিকল্প নাই। আপনি আলোচনা শুরু করুন। ফেসবুকের কল্যাণে আমাদের বিষয়টি এখন বাজারে ব্যাপক আলোচনায় আসিয়াছে। ঢাকায় মন্ত্রী, মিনিস্টার নিয়ে খেলেন এমন এক তৈলবাজ বন্ধু ফেসবুকে আমাদের কার্যক্রম নিয়া প্রশ্ন তুলিয়াছেন, তিনি লিখিয়াছেন—– আমাদের জ্ঞান বুদ্ধি কম। তৈলমর্দন করিতে পারি না বিধায়, আমরা গ্রামে পড়িয়া আছি। ঢাকায় তৈলমর্দন করিয়া তিনি বহু কিছু করিতে পারিতেছেন। আমরা না-কি তাহার ক্ষতি করিবার জন্য তাহা করিতেছি।

জ্যেষ্ঠ বন্ধু, প্রভাষক বন্ধুটির সমর্থন পাইয়া যারপর নাই লাফ দিয়া উঠিলেন। দীর্ঘক্ষণ চুপ থাকিবার মানুষ তিনি নহেন।

তিনি কহিলেন, শোনেন আপনাকে বলি— যাহারা যতই অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করিয়াছেন তাহা আমার আধাও করিতে পারেন নাই।

আমি, বর্তমানে কিছুটা চক্ষুতেও দেখিতে পাই না। ফেসবুকে হরফ দেখিতে পাই না বিধায় অনেকে লিখে পাড় পাইয়া যায়, নইলে তাহাকে ফেসবুকে কবর দিয়া দিতাম! বাহুর বলও কিছুটা শিতিল হইয়া পড়িয়াছে। তবু কহিতে আমার দিধা নাই। তৈলবাজ সংবর্ধনা কমিটি গঠন হইবেই হইবে। তৈলবাজদের খুঁজিয়া আমরা তাহাদের সংবর্ধনা দিবোই দিবো! ইহাতে কাহারও ষড়যন্ত্রে থামিবে না।

যাহারা বলিয়া বেড়ান, মন্ত্রী, মিনিষ্টার, সচিব নিয়া খেলা করিতে পারেন! আপনাকে আমি বলি, খুঁজিয়া দেখুন — তাহারা এককালে আমার শিষ্যত্ব গ্রহণ করিয়াছিলেন, এখন গুরু মারা শিষ্য বনিয়াছেন।

জ্যেষ্ঠ বন্ধু এবার চেতিয়া উঠিলেন। মুখ হইতে থুথু উড়িয়া পড়িতেছে। জ্যেষ্ঠ বন্ধুর উত্তেজনা ভাব দেখিয়া মনে হইলো এমন শিষ্যদের আচরণে তাহার প্রভূত দুঃখের সঞ্চার হইয়াছে। যাহা গোলেমালে লাগব করিতে ক্ষেপিয়া গিয়া থুথু চিটাইতেছেন।

আমি জ্যেষ্ঠ বন্ধুর গদগদ উত্তেজনা দেখিয়া তাহার রাগ সীমিত করিতে অনুরোধ করিলাম। জ্যেষ্ঠ বন্ধু বেহুঁশ হইতে হুঁশে ফিরিয়া আসিয়া আমাকে কানে কানে কহিলেন, শোনেন! আমার অভিজ্ঞতায় বলিতেছি যে, প্রভাষকগণ ভিন্ন মতলব লইয়া এখানে আসিয়াছেন! কামের কাম কিছুই করিবেন না, বরং মাতোব্বরি করিয়া যাইবেন! কমিটি গঠন লইয়া গাফিলতি করা যাইবে না। অচিরেই তৈলবাজ সংবর্ধনা কমিটি গঠন না করিলে আমাদের উদ্দেশ্য চুলোয় যাইতে পারে।’

আমিও জ্যেষ্ঠ বন্ধুর আশঙ্কার কথা অমূলক মনে করিলাম না। তবে ভাষার মাসে তৈলবাজদের সংবর্ধনার আয়োজন না করিলেও পরবর্তী মাসের প্রথম সপ্তাহান্ত সংবর্ধনার আয়োজন করিতেই হইবে। এই লক্ষ্যবেধ করা কোনভাবেই উচিৎ হইবে না।

অনলাইন নিউজ চমচম ডট কম’ এর সম্পাদক বন্ধু দাঁড়িয়ে কহিলেন, আপনারা আলোচনায় আসুন। বিলম্বে কার্যসাধন হয় না।’

সাংবাদিক বন্ধু দরাজ কণ্ঠে কহিলেন, আমি কমিটির নির্দেশে যে কোনও কার্য করিতে প্রস্তুত রহিয়াছি! আমাদের হস্তে বহুবিধ কাজ। মূল কমিটি গঠন করিবার পূর্বে সাময়িক কার্য পরিচালনায় আজই আহবায়ক কমিটি গঠন করা জরুরী মনে করিতেছি।’

আপনারা কি বলেন, আহবায়ক কমিটি গঠনে

আপনাদের মতামত কী?

সাংবাদিক বন্ধুর প্রস্তাব শুনিয়া অনেকই সরব হইয়া উঠিলেন। কেহ কেহ কহিলেন, তৈলবাজদের চিহ্নিত করিতে কী কী বিষয় বিবেচনায় আনিতে হইবে, তাহা কমিটি গঠন করিয়া আলোচনা পর্বে ঠিক করিতে হইবে। অতএব, কমিটি গঠন করা জরুরী হইয়া পড়িয়াছে।

সকলই সকলের মতো বক্তব্য দিয়া জ্যেষ্ঠ বন্ধুকে আহবায়ক করিতে প্রস্তাব করিলেন। কেহ কেহ কহিলেন, জ্যেষ্ঠ বন্ধুর অভিজ্ঞতা সকল ক্ষেত্রে আমাদের চাইতে অধিক। তিনিই এই কমিটির উপযুক্ত আহবায়ক হিসাবে মনোনিত হওয়া উচিৎ। কণ্ঠ ভোটে জ্যেষ্ঠ বন্ধুকে তৈলবাজ সংবর্ধনা কমিটির অাহবায়ক মনোনিত করা হইলো।

জ্যেষ্ঠ বন্ধুকে অাহবায়ক মনোনিত করিবার পর, সকলেই আসিয়া করমর্দন, বুকমর্দন করিয়া অভিনন্দিত করিলেন। জ্যেষ্ঠ বন্ধু খুশির হাসিতে বিগলিত হইয়া টি-বয়কে ডাকিলেন——

টি-বয় আসিয়া কহিলো, স্যার আপনে আহাব্বাক হইছেন, আমি জানি!

জ্যেষ্ঠ বন্ধু কহিলেন, বেটা কি খাওয়াবি, যা— আন গিয়ে। সবাইকে ভালো কিছু খাওয়াবি আজ!

স্যার, পোড়াবাড়ির বড়া মিষ্টি, দিনাজপুরের দৈ সবাইকে দিমু, স্যার?

জ্যৈষ্ঠ বন্ধু কহিলেন, যতো প্লেট লাগে দিয়া যাবি, বেটা। তুই কেবল হিসাব রাখবি।

জ্যেষ্ঠ বন্ধু অদ্য দায়িত্ব সমঝিয়া, সকলের উদ্দেশ্যে কহিলেন— বড়ই বিমুহিত হইলাম। তৈলবাজ সংবর্ধনা কমিটির আহবায়কের কর্তব্য গ্রহণ করিয়াছি। এখন আমার দায়িত্ব হইবে আপনাদের সঙ্গে লইয়া, সকলের সাথে আলোচনায় বসিয়া একখানা পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন করা।

জ্যেষ্ঠ বন্ধুর দায়িত্বগ্রহণের মিষ্টিান্ন সকলই কাটা চামুছে কাটিয়া কাটিয়া মুখে নিতেছিলেন; তাৎক্ষণাত টি-বয় হস্তনেস্ত, অস্থির চিত্তে ব্যস্ত হইয়া আসিয়া কহিলো——

স্যার, “শোনছেন—–! বাহিরে এক গাড়ি পুলিশ আইছে! আমরার ঘরের সামনে পুলিশ ভ্যান থামাইয়া এক গাট্টা পুলিশসাব, আমার মালিক সাবের সাথে কি কথা কইতেছে, দেখিয়া আইছি! পুলিশসাব, মিটিং মিটিং কী কথা কইতাছে! তাই শোনে আমার সন্ধেহ হইছে, ডালমে কুচবি কালা হায়! আপনারার উপর কোন অভিযোগ মনে লয়। আপনারারে এরেস্ট করতে মনে হয় আইছে।

টি-বয়ের বাক্য শ্রবণ করিয়া সকলই কর্ণ পাতিয়া ধরিলেন! কী বিষয়; বিষয় কী? পুলিশের কী বিষয় এখানে? কেহ মনে করিলেন, এইবার পুলিশের ঘা—- খাইতে হইবে। কপালে তাহাই রহিয়াছে! নইলে পুলিশ সাহেবরা আসিবে কেনো?

জ্যেষ্ঠ বন্ধু কহিলেন, একি! একি!! নিশ্চয় ষড়যন্ত্র! তাহা না হইলে পুলিশ আসিয়াছে কেনো?

যাহার যতই সাহস থাকুক না কেনো, পুলিশ দেখিলে সাহসীরাও কিছুটা সাহস হারায়। সাহস না হারাইলেও বিব্রতভাব আসিবেই। বাপরে! জোঁকের দাঁত যেমন আর পুলিশি জিজ্ঞাসাবাদ দুটিই ভয়ানক। জোঁকের কামড় হইতে রক্ষা করিতে হইলে, কয়েক ধল্লা থুঁথু ব্যয় করিতে হয়। জোঁকের কামড় ছাড়াতে না পারিলে মুখের থুঁথু খতম করিতে হয়। আর পুলিশ——!

বাপরে কী আর কহিবো!

উপস্থিত সদস্যবৃন্দ সকলই, হতভম্ব হইয়া পড়িয়েছেন।

জ্যেষ্ঠ বন্ধু সন্ধেহ করিতেছেন, তৈলগ্রহণকারী বড় কর্তা নাখোশ হইয়া নিশ্চয়ই পুলিশসাহেব প্রেরণ করিয়াছেন। তাহাই হইবে! আলবৎ, নিশ্চয়ই তাহা হইবে!

জুনিয়র এক সাংবাদিক বন্ধু ও তৈলবাজ সংবর্ধনা কমিটির অন্যতম সদস্য, তেজদীপ্ত ভাষায় কহিলেন, বিরাট ষড়যন্ত্র! আমাদের মধ্যে অনেকেই লেখালেখি করি। কেহ কেহ সংবাদপত্রে সমাজের অনাচার নিয়ে নিউজ করিয়া সত্যপ্রকাশ করি। আমাদের অনেকই শিক্ষক, কেহ শিক্ষা-সংস্কৃতি ও সামাজিক কাজে অংশগ্রহণ করিয়া তৃপ্ত হই। কিন্তু বৈশ্বয়িক ধারার হীনমন্য গুণীরা, আমাদেরকে মুনিও মনে করেন না। আমাদের স্বকীয় সংস্কৃতিকে হাস্য করে উড়াইয়া দেন। সাদা কাগজে কালো হরফের শিল্পীদের আজকাল বড়ই অবমূল্যায়ন তাহাদের কাছে। যতো বাঁধা আসিবে আমরা অগ্নি শিখারমতো প্রজ্বলিত হইবো। অামাদের কর্ম ও সৃজনশীল যোগ্যতাকে যাহারা তির্যক নয়নে দেখেন, খতম করিতে চাহেন; তাহাদের দ্বারা জগতের মানুষ কমই লাভবান হইয়াছে। তাহারা আত্মকাজে মগ্ন থাকেন।

কণিষ্ঠ সদস্যের তেজস্বী বক্তব্যে সকলের নির্জীব প্রাণে সজিবতা আসিলো।

সকলেই এক বাক্যে আওয়াজ দিলেন——

জ্যেষ্ঠ বন্ধুর কিছু হইলে,

জ্বলবে আগুন খালে বিলে।’

পরক্ষণে মিটিং এর পরিবেশ গরম হইয়া উঠিলো।

দায়িত্ব প্রাপ্ত পুলিশ সাহেব মিটিং স্থলে আসিয়া পরিবেশ পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করিয়া বুঝিলেন, সংবাদদাতার প্রেরিত নিউজ সম্পূর্ণ অমূলক হইয়াছে। গোপন বৈঠকের কোনও আলামত পাওয়া যাইতেছে না। এখানে যাহারা মিটিংএ বসিয়াছেন, তাহারা কেহই সমাজের অপরিচিত মুখ নহেন। তাহাদের সন্ধেহ করিবার কোনও কারণ নাই।

তাহাদের প্রত্যেকেরই সমাজে গ্রহণ যোগ্যতা রহিয়াছে। পুলিশ স্টেশনে যে বা যাহারা গোপন নিউজ পাঠাইয়াছে, তাহাদেরই ষড়যন্ত্রকারী বলিয়াই উল্টো সন্ধেহ করিতেছেন, পুলিশ সাহেব।

তিনি আমাদের মিটিং স্থলে প্রবেশ করিয়া জ্যেষ্ঠ বন্ধুকে কহিলেন——

আমরা ভুল নিউজ নিয়া এখানে আসিয়াছি, আপনাদের সম্বন্ধে যথাযথ জানিয়া আমরা সিদ্ধান্ত পাল্টাইয়া নিয়াছি। পুলিশ স্টেশনে ফিরিয়া গিয়া আমার বড় সাহেবকে সঠিক তথ্য প্রদান করিবো।

আপনাদের তৈলমর্দন সংবর্ধনার আয়োজন কমিটির মিটিং এর আরও অগ্রগতি হোক, প্রত্যাশা করিতেছি।

পুলিশসাহেব তাহার বক্তব্য প্রদান করিয়া মিটিং স্থল ত্যাগ করিতে চাহিলেন——।

জ্যেষ্ঠ বন্ধু, পুলিশসাহেবকে তাহার আহবায়ক পদে অধিষ্ঠিত হওয়ার মিষ্টান্ন খাইয়ে দিতে ভুল করিলেন না। তিনি কহিলেন, পুলিশসাহেব আমি আপনারে বলি—– আমাদের নিয়া মিথ্যা সন্ধেহের কোনও অবকাশ নাই। আপনাকে ধন্যবাদ। এখন আপনি আসিতে পারেন! এতক্ষণে পুলিশি অাতঙ্ক সকলেরই কাটিয়া গেলো। জ্যেষ্ঠ বন্ধু সকল সম্মানিত সদস্যগণের উদ্দেশ্য করিয়া কহিলেন। আগামী ২১শে ফেব্রুয়ারি মহান শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস পালন করিতে আমাদের কী কী কার্যসূচী গ্রহণ করিতে হইবে, তাহা নিয়ে আগামী কল্যই আবারও মিটিংএ বসিতে হইবে। যথাযথ মর্যাদায় মহান শহীদ দিবস উদযাপনে সর্ব বিষয়ে গুরু দায়িত্ব পালন করিতে আগামী কাল্য চূড়ান্ত মিটিং হইবে। আপনাদের উপস্থিত থাকিতে যেনো ভুল না হয়। সবাই কবুল কহেন।

অতপর, আগামী ২২ ফেব্রুয়ারি আমাদের তৈলমর্দন সংবর্ধনা কমিটির সর্ব শেষ মিটিং অনুষ্ঠিত হইবে। তৈলমর্দন কারী বাছাই করতে কোন কোন বিষয় বিবেচনায় আনিতে হইবে, কে কোথায় দায়িত্ব পালন করিবেন, তাহা নির্ধারণ করা হইবে।

কমিটির আহবায়ক, জ্যেষ্ঠ বন্ধু সকলকে ধন্যবান দান করিয়া মিটিং খতম করিলেন।

চলবে…
১৬/০২/১৭

বিঃদ্রঃ গল্পের চরিত্র সম্পূর্ণ কাল্পনিক। গল্পের প্রয়োজনে কিছু চরিত্র সমাজ থেকে ওঠে এসেছে, তাই কাকতালীয়ভাবে কোনও চরিত্র কারো সাথে মিলে গেলে ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখার অনুরোধ জানিয়েছেন লেখক।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *