ফুল চাষে নারীদের ভাগ্য বদল

ফুল চাষে নারীদের ভাগ্য বদল

সাফল্য। আব্দুল বাতিন বাবু

ফুল চাষে নারীদের ভাগ্য বদল

‘ফুল’ দুই অক্ষরের একটি সুন্দর শব্দ। ফুল সৌন্দর্যের প্রতীক। ফুল পবিত্রতা, শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার প্রতীক। জন্মদিন, বিবাহবার্ষিকীসহ যে কোনো উপলক্ষে কাউকে অভিনন্দন ও শুভেচ্ছা জানাতে আমরা ফুল উপহার দেই। অতীতে ফুলের উৎপাদন ও ব্যবহার ছিল খুব সীমিত। বর্তমানে পৃথিবীর উন্নত দেশগুলোর মতো বাংলাদেশেও বাণিজ্যিকভিত্তিতে ফুলের উৎপাদন ও বিপণন হচ্ছে এবং ফুলের ব্যবহারও অনেক বেড়েছে।

ফুল উৎপাদনে দেশের অর্থনীতির অপার সম্ভাবনার ফলে বাণিজ্যিকভাবে ফুল চাষে এগিয়ে এসেছে নারীরা। ঘরের কাজের পাশাপাশি এখন নারীরা উদ্যোক্তা হিসেবে ফুল চাষ করে আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী হচ্ছেন। আত্মপ্রত্যয়ী নারীরা দেশের অর্থনীতিতে ভূমিকা রাখার পাশাপাশি অভাবের সংসারে সচ্ছলতা ফিরিয়ে আনছেন।

নারায়ণগঞ্জ জেলার সোনারগাঁও উপজেলার ফরদী গ্রামের কল্পনা আক্তার ফুল চাষের পাশাপাশি ফুলের ঝোঁপা ও মালা তৈরির কাজও করেন। আগে তার অনেক কষ্টে দিন কাটলেও এখন ফুল বিক্রির পাশাপাশি ফুলের ঝোঁপা ও মালা তৈরি করে মাসে প্রায় ২৫ হাজার টাকা আয় করেন। এ উপার্জন দিয়ে সংসার ভলো চলে। ছেলেমেয়েদের লেখাপড়া করাতেও কোনো অসুবিধা হয় না কল্পনার।

বাংলাদেশে বাণিজ্যিকভিত্তিতে ফুল উৎপাদনের সূচনা হয় ১৯৮৩ সালে যশোর জেলার ঝিকরগাছা উপজেলার পানিসারা গ্রামে। বর্তমানে দেশের ২৪টি জেলায় প্রায় ছয় হাজার হেক্টর জমিতে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে ফুলের চাষ হচ্ছে। ফুল উৎপাদনে জড়িত আছেন প্রায় ১৫,০০০ কৃষক এবং ফুল উৎপাদন ও বিপণন ব্যবসায়ে অন্তত দেড় লাখ লাখ মানুষ সরাসরি নিয়োজিত রয়েছেন। এর মাধ্যমে জীবিকা উপার্জন করছেন প্রায় ৭ লাখ মানুষ। এখন বিয়ে শাদিতো বটেই, অন্যান্য সামাজিক ও জাতীয় অনুষ্ঠান মাতৃভাষা দিবস, ভ্যালেনটাইনস ডে, নববর্ষ, স্বাধীনতা দিবস, বিজয় দিবসসহ জাতীয় ও সামাজিক জীবনের অনেক ক্ষেত্রে বিবাহবার্ষিকী, জন্মদিন, ঈদ, পূজায় ফুলের ব্যবহার অনিবার্য হয়ে পড়েছে।

ভালোবাসা দিবসে প্রিয়জনের কাছে উপহার হিসেবে ফুলের বিকল্প নেই। তাইতো ভালোবাসা দিবসে দেশের বাজারে ফুলের চাহিদা বেড়ে যায় কয়েকগুণ। অধিক লাভের আশায় পহেলা ফাল্গুন, বিশ্ব ভালোবাসা দিবস, আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসগুলোর মতো উৎসবের অপেক্ষায় প্রহর গোনেন ফুলচাষীরা। ফুল ব্যবসায়ীদের কাছে পুরো ফ্রেব্রুয়ারি মাসটি ব্যবসার উৎসব হিসেবে বিবেচিত। এবার ফেব্রুয়ারি মাসেই ৭৩ কোটি টাকার ফুল বিক্রি হয়েছে।

যশোরে বানিজ্যিকভাবে উৎপাদন হচ্ছে রজনীগন্ধা, গোলাপ, জারবেরা, গাঁদা, গ্লাডিওলাস, জিপসি, রডস্টিক, কেলেনডুলা, চন্দ্র মল্লিকাসহ বিভিন্ন ধরনের ফুল। শুরু থেকেই পুরুষ চাষির পাশাপাশি নারীরাও ফুল চাষে এগিয়ে এসেছে। ফুল চাষ করে ইতোমধ্যে ভাগ্যের চাকা বদলেছেন অনেক নারী। উপজেলা কৃষি কর্মকর্তারা নারীদের উন্নত প্রশিক্ষণ দিয়ে সহায়তা করছেন। গদখালি এলাকায় বর্তমানে চার শতাধিক নারী সরাসরি ফুল চাষের সাথে জড়িত রয়েছে।

বাণিজ্যিক ভিত্তিতে ফুল চাষ করে কৃষকরা তাদের জীবন যাত্রায় অনেক উন্নতি সাধন করেছে। ফুল চাষে জড়িত কৃষকরা জানান, রবি শস্য চাষ করে যে পরিমাণ ফসল পাওয়া যায় তার চেয়ে দশগুণ বেশি লাভ হচ্ছে ফুল চাষ করে। স্বল্পসময়ে ফুল উৎপাদন করা যায় এবং খরচ অনেক কম হয়। অধিক লাভ হওয়ায় অনেকেই পেশা পরিবর্তন করে ফুল চাষে ঝুঁকেছেন। এখানকার উৎপাদিত ফুল রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় এবং বিদেশেও পাঠানো হয়। ফুল চাষ করে স্থানীয় অনেক কৃষক যেমন স্বাবলম্বী হয়েছেন অনেক নারী শ্রমিকের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হয়েছে। ফুল চাষীদের পরিবারে যুবকদের মাঝে নেই বেকারত্বের অভিশাপ।

ফুল চাষের সুবিধা হলো বছরের সব সময়ে ফুল বিক্রি হয়ে থাকে। তবে বিশেষ বিশেষ দিনগুলোতে ফুলের চাহিদা দ্বিগুণ হারে বেড়ে যায়। এ সময় দামও থাকে বেশ চড়া, লাভও হয় বেশি। জানুয়ারি থেকে মার্চ-এপ্রিল পর্যন্ত ফুলের ভরা মৌসুম থাকে। এ সময় সপ্তাহে তিন দিন ফুল সংগ্রহ করা যায়। ফুল চাষীদের মতে, এক বিঘা জমিতে ফুলের চাষ করলে খরচ বাদে লাভ হয় ৪০ হাজার টাকার কাছাকাছি। ধান বা অন্যান্য ফসল চাষে এত লাভ হয় না। বছরে প্রায় হাজার কোটি টাকার ফুলের জোগান আসছে দেশের কৃষকদের কাছ থেকে। ফুল ব্যবসায়ীদের মতে, মানুষের আয় বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দেশে ফুলের চাহিদা বাড়ছে। নানা ধরনের উৎসব বছর জুড়েই চলে। উৎসবগুলো এখন আরও জমজমাটভাবে উদযাপিত হয়। সেসব অনুষ্ঠানে ফুল আকর্ষণের মাত্রা বাড়িয়ে দেয়। বিভিন্ন ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান, রাজনৈতিক ও পারিবারিক অনুষ্ঠান ফুল ছাড়া কল্পনাই করা যায় না। এমনকি ঘরেও এখন মানুষ তাজা ফুল রাখছে ফুলদানিতে।

যশোর, ঝিনাইদহ, চুয়াডাঙ্গা, ময়মনসিংহ, ঢাকার সাভার, নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁও, মানিকগঞ্জের সিঙ্গাইর, গাজীপুর, মেহেরপুর, রাঙামাটি, টাঙ্গাইলসহ বিভিন্ন জেলায় ফুল চাষ হয়। বেশি চাষ হয় গোলাপ, রজনীগন্ধা, গাঁদা, গ্লাডিওলাস ও জারবেরার। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস)-এর তথ্যানুযায়ী, প্রতিবছর ক্রমাগতভাবে ফুলের চাষ বাড়ছে। বাংলাদেশ ট্যারিফ কমিশন ২০১৫ সালে দেশের ফুলের বাজার ও রপ্তানি সম্ভাবনা নিয়ে একটি প্রতিবেদন তৈরি করেছিল। ওই প্রতিবেদনে দেখা যায়, এক একর জমিতে জারবেরা চাষ করলে কৃষকের বছরে প্রায় ২৫ লাখ টাকা মুনাফা হয়। বাংলাদেশ ফ্লাওয়ার সোসাইটির কর্মকর্তাদের মতে, রজনীগন্ধা, গোলাপ, গাঁদা, চন্দ্রমল্লিকার মতো ফুল চাষে দেশের কৃষকেরা অনেক আগে থেকেই পরদর্শী। এখন আর মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড থেকে ফুল আমদানি করতে হয় না। এটা নিঃসন্দেহে আমাদের জন্য গর্বের।

বাংলাদেশ থেকে কিছু কিছু ফুল এখন রপ্তানিও হচ্ছে। তবে পরিমাণে কম হলেও সবজির সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশে কিছু ফুল আমাদের দেশের রপ্তানিকারকেরা পাঠিয়ে থাকেন। সম্প্রতি মালয়েশিয়া ও জাপানে বাণিজ্যিকভাবে ফুল রপ্তানির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি ফুলের বাণিজ্য হয় নেদারল্যান্ডসে। ফুলের বাজার সম্প্রসারিত হওয়ার কারণে বিশ্বের অনেক বড় বড় প্রতিষ্ঠান ফুল উৎপাদনে বিনিয়োগ করেছে। ফুল রফতানিতে আয়ের পরিমাণ ক্রমাগতভাবে বাড়ছে।

আমাদের দেশে ৮০’র দশক থেকে বাণিজ্যিকভাবে ফুল চাষ শুরু হলেও ফুল ব্যবসায়ীদের দাবি অনুযায়ী এখন পর্যন্ত এ খাতের চাষীদের জন্য প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট এবং ব্যবসায়ীদের জন্য ঢাকায় স্থায়ী ও উপযোগী কোনো জায়গা গড়ে ওঠেনি। ঢাকার শাহবাগ, আগারগাঁও ছাড়া বিভিন্ন জায়গায় অস্থায়ীভাবে ফুল কেনাবেচা হয়ে থাকে। ঢাকায় প্রায় ৫০০ এর মত ফুল বিক্রেতা রয়েছে। ১৯৯১ সালে বাংলাদেশ সরকার ফুল চাষকে রপ্তানিযোগ্য পণ্যের তালিকাভুক্ত করেছে।

বিশ্ববাজারে দিন দিন আমাদের দেশের ফুলের চাহিদা বেড়ে চলেছে। বাংলাদেশের জমি এবং জলবায়ু ফুল চাষের জন্য উপযোগী হওয়ায় ফুল চাষই হতে পারে আমাদের রফতানি আয়ের একটি বড় উৎস। অবকাঠামো ও অন্যান্য সুযোগÑসুবিধা বাড়াতে পারলে বাংলাদেশ থেকে ফুল রপ্তানি আরো বাড়ানো সম্ভব। এতে কর্মসংস্থানের সুযোগ যেমন তৈরি হবে তেমনি নারীরা অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হবেন। আর নারীদের অথনৈতিক মুক্তি নিশ্চিত করবে নারীদের ক্ষমতায়ন এবং প্রকৃত মুক্তি।

লেখক : কলামিস্ট

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *