পাথেয় টোয়েন্টিফোর ডটকম : রাজধানীর যাত্রাবাড়ী এলাকা থেকে গত অক্টোবরে পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী কুতুব উদ্দিন পাপ্পু (১৪) অপহৃত হওয়ার পর তদন্ত চালিয়ে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) জানায়, পাপ্পুকে হত্যা করে মুন্সিগঞ্জের লৌহজং নদীতে ফেলে দেয়া হয়েছে। ওই ঘটনায় রাজু নামে যে আসামি গ্রেফতার হয়েছিল, সে-ও আদালতে দেয়া জবানবন্দিতে একই দাবি করে। কিন্তু ডিবি ও রাজুর দেয়া এ তথ্য নিয়ে ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে। অপহরণের পর পাপ্পুর চোখ বাঁধা অবস্থায় তোলা একটি ছবিকে কেন্দ্র করেই তৈরি হয়েছে এই ধোঁয়াশা। ওই ছবিটি ইমোর মাধ্যমে পাপ্পুর স্বজনদের পাঠিয়েছিল অপহরণকারীরা।
ঘটনার তদন্ত শেষে ডিবি জানায়, পাপ্পুকে গত ৪ অক্টোবর হত্যা করা হয়েছে। কিন্তু পাপ্পুর জীবিত অবস্থায় চোখ বাঁধা যে ছবি অপহরণকারী পাঠিয়েছে, সেটি তোলা হয় ৬ অক্টোবর। পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) ফরেনসিক পরীক্ষায় ছবি তোলার সময় নিয়ে ভিন্ন তথ্য মেলায় এখন রাজু ও ডিবির তথ্য বিশ্বাস করতে চাইছেন না পাপ্পুর স্বজনরা। পাপ্পুর বেদনাহত মা রুনা পারভীন রুনু এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর সহায়তাও কামনা করেছেন।
শনিবার (১৪ মার্চ) দুপুরে রাজধানীর সেগুনবাগিচায় বাংলাদেশ ক্রাইম রিপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (ক্র্যাব) কার্যালয়ে এ বিষয়ে সংবাদ সম্মেলন করেন রুনা পারভীন। তার সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন স্বজনরা।
পাপ্পুর ভাই রাকিব উদ্দিন সিজার বলেন, পাপ্পু জীবিত নাকি তাকে হত্যা করা হয়েছে, তা আমরা এখনো নিশ্চিত নই। কারণ আসামির সব কথা সত্য প্রমাণিত নয়। তাছাড়া পাপ্পু হত্যার শিকার হলেও মরদেহ আমরা পাইনি। হত্যার আলামতও মেলেনি।
রুনা পারভীন বলেন, দক্ষিণ যাত্রাবাড়ীর ধোলাইপাড় বাজারের ৩০১ নং বাসা থেকে ৩ অক্টোবর বিকেলে বেরিয়ে আর ফেরেনি পাপ্পু। তার ব্যবহৃত মোবাইল ফোনও বন্ধ পাওয়া যায়। মহল্লায়, এলাকায় এবং পরিচিত স্বজনদের বাসাবাড়িতে খোঁজ করেও সন্ধান মেলেনি।
‘এ অবস্থায় ৪ অক্টোবর সকালে ছেলে নিখোঁজ হওয়ার বিষয়ে যাত্রাবাড়ী থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করি। পরদিন ৫ অক্টোবর ফেসবুকে একটি পোস্ট দিয়ে পাপ্পুর নিখোঁজের বিষয়টি জানানো হয়। ফেসবুকে পোস্ট দেয়ার পর অজ্ঞাত পরিচয় এক ব্যক্তি ‘ইমো’তে এসএমএসে জানায় যে, ‘পাপ্পু তার কাছে আছে এবং হেফাজতে আছে। ওকে ঘুমের ইনজেকশন দিয়ে অজ্ঞান করে রাখা হয়েছে।’ দুই কোটি টাকা দিলে পাপ্পুকে ছেড়ে দেয়া হবে বলেও জানায় অপহরণকারী। এত টাকা হঠাৎ করে কোথায় পাবো, এমনটি বললে পাপ্পুর নামে থাকা একটি বাড়ি বিক্রি করে দিতে বলে অপহরণকারী (পাপ্পুর নামে একটি পাঁচতলা বাড়ি রয়েছে)। এছাড়া আইনের আশ্রয় নিলে পাপ্পুকে মেরে ফেলা হবে বলেও হুমকি দেয়।’
পাপ্পুর মা বলেন, ৬ অক্টোবর সকালে অজ্ঞাত অপহরণকারী পাপ্পুর চোখবাঁধা অবস্থায় তোলা একটি ছবি পাঠায়। ওই ছবির বিষয়টি যাত্রাবাড়ী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মাজহারুল ইসলামকে জানানো হলে তিনি যথাযথ কোনো পদক্ষেপ নেননি। ৭ অক্টোবর অপহরণকারী পাপ্পুর অসুস্থতার কথা বলে ইমোতে যোগাযোগ করে ৫০ হাজার টাকা বিকাশে নেয়। ৭ অক্টোবর বিকেলে ইমোতে এসএমএস করে অপহরণকারী জানায় যে, ‘৮ তারিখে আমার এক লোক ঢাকার বাইরে পাঠাব। তোমাদের সেই জায়গা এবং সময় জানিয়ে দেয়া হবে। তোমরা নির্দিষ্ট জায়গায় গিয়ে দুই কোটি টাকা রেখে আসবে। ৮ অক্টোবর টাকা না দিলে পাপ্পুকে মেরে ফেলা হবে।’ এর মধ্যে ৮ অক্টোবর পরিচিত এক সাংবাদিক ফোন করলে এ বিষয়ে মামলা নেয় থানা পুলিশ।
রুনা পারভীন বলেন, ৮ অক্টোবর মামলার কাগজপত্র নিয়ে আমার ভাসুরের ছেলে (পাপ্পুর চাচাতো ভাই) আমাদের সঙ্গে নিয়ে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশ কার্যালয়ে যায়। সেখানে গিয়ে ডিবির সিরিয়াস ক্রাইম ইনভেস্টিগেশন বিভাগের উপ-কমিশনার (ডিসি) মীর মোদাসসের হোসেনকে বিষয়টি জানানো হয়। তখন ডিবি অপহরণকারীর মোবাইল ফোন ট্র্যাকিং করে অপহরণের সঙ্গে রাজু জড়িত বলে জানতে পারে এবং গাজীপুর থেকে তাকে গ্রেফতার করে। পরে রাজুর বাসা থেকে আমার ছেলে পাপ্পুর মোবাইল ফোন এবং তার পরনের জুতা ও বেল্ট উদ্ধার করে ডিবি। রাজু আমাদের বাসার কাছের ভাড়াটিয়া। ৯ অক্টোবর ডিসি মোদাসসের জানান, ‘পাপ্পু ও রাজু মদ পান করার পর পাপ্পু মারা যায়। পরে পাপ্পুকে বস্তার ভেতরে ঢুকিয়ে মুন্সিগঞ্জের লৌহজংয়ে একটি ডোবায় ফেলে দেয় রাজু। জবানবন্দিতে একই তথ্য দেয় রাজুও। যদিও পরে মুন্সিগঞ্জের বিভিন্ন জায়গায় তথা নদী ও ডোবায় খোঁজ করেও পাপ্পুর সন্ধান পাওয়া যায়নি। এছাড়া ডুবুরি ও স্থানীয় জেলেদের জাল দিয়ে নদীতে তল্লাশি চালিয়েও পাপ্পুর কোনো সন্ধান মেলেনি।
পাপ্পুর মামী রওশন আরা সংবাদ সম্মেলনে বলেন, গ্রেফতার রাজুর মোবাইল ও ৬ তারিখে পাপ্পুর চোখবাঁধা অবস্থায় তোলা ছবি ডিবি পুলিশকে অনুরোধ করেও ফরেনসিক পরীক্ষা করাতে পারিনি। ঘটনার দেড় মাস পর মামলাটি পিবিআইতে যায়। পিবিআই পাপ্পুর ও রাজুর মোবাইল ফোন ফরেনসিক পরীক্ষা করে জানায়, পাপ্পুর চোখ বাঁধা অবস্থার ছবিটি অপহরণকারী রাজুর মোবাইল ফোনে ৬ অক্টোবর তোলা। পিবিআই’র ফরেনসিক রিপোর্টের তথ্য মতে এটি স্পষ্ট যে, রাজুর ১৬৪ ধারায় দেয়া জবানবন্দি মিথ্যা। সে যে ৪ অক্টোবর পাপ্পুকে হত্যার কথা বলেছে, সেটা-ও মিথ্যা।
পাপ্পুর মা বলেন, আমাদের দাবি হলো যে- রাজুর পক্ষে একাকি এই অপহরণ ও খুন করা সম্ভব নয়। এর সঙ্গে আরও অনেকে জড়িত আছে। এমনকি গত বছরের ৩ অক্টোবর আমার ছেলেকে অপহরণ করা হলেও এখন পর্যন্ত সে জীবিত না মৃত অবস্থায় আছে সেটি পর্যন্ত পুলিশ খুঁজে বের করতে পারেনি। এ বিষয়ে আমি একজন বেদনাহত মা হিসাবে ছেলেকে ফিরে পেতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ সংশ্লিষ্ট সবার কাছে আবেদন জানাই।
এ ব্যাপারে যোগাযোগ করা হলে ঘটনার তদন্তকারী কর্মকর্তা পিবিআই ঢাকা মেট্রো দক্ষিণের পরিদর্শক লুৎফর রহমান বলেন, দুই দফায় রিমান্ডে নেয়ার পর রাজু ১৬৪ ধারায় দেয়া জবানবন্দিতে পাপ্পুকে হত্যার পর মুন্সিগঞ্জের লৌহজংয়ে নদীতে ফেলে দেয়ার কথাই বলেছে। এই কাজে সহযোগিতা করা ৬ জনকে আটকের পর তারাও ১৬৪ ধারায় জবানবন্দিতে একই তথ্য জানিয়েছে।
তিনি বলেন, পাপ্পুর সাথে রাজুর বয়সের ব্যবধান অনেক। ঠিক কী কারণে পাপ্পুকে অপহরণ কিংবা অপহরণের পর হত্যা করেছে, সেটি এখনো নিশ্চিত নয়। এই কাজে রাজুর পেছনে আরও অনেকে জড়িত। এর মধ্যে জিজ্ঞাসাবাদে রাজুর সাথে নাদিম নামে একজন জড়িত বলে আমরা জানতে পেরেছি, সে ইতোমধ্যে সিলেট হয়ে ভারতে পালিয়ে গেছে। পাপ্পুর নামে বাড়ি থাকাটা একটা বড় কারণ হতে পারে। সব বিষয় আমলে নিয়ে তদন্ত করা হচ্ছে। আশা করছি খুব দ্রুতই আমরা একটা প্রতিবেদন দাখিল করতে পারবো।


