একটি শব্দ স্মৃতির সাম্পান | আশরাফ উদ্দীন রায়হান
ছোট্টবেলা থেকেই মাসিক পাথেয় পত্রিকার সাথে একটা যোগসূত্র তৈরি হয়ে গিয়েছিল। আব্বা যেহেতু পাথেয়’র একনিষ্ঠ পাঠক ছিলেন আমিও খুব আগ্রহ নিয়ে পড়তাম নৈতিক মূলবোধের পতাকাবাহী মাসিক সাময়িকী পাথেয়। সময় বদলেছে। প্রেক্ষাপট আজ অভিনব। যুগের চাহিদায়ও এসেছে ব্যাপক পরিবর্তন। মাসিক পাথেয়র নতুন সংস্করণ এখন অনলাইন পোর্টাল। পাথেয়’র সম্পাদক সম্পর্কে আমার জানার কৌতূহল সেই আশৈশব। এর মধ্যে তাঁর সাহিত্যপ্রতিভা রীতিমতো বিস্ময়জাগানিয়া। আজন্ম মাদরাসা অঙ্গনের একজন মানুষের পক্ষে বাংলাসাহিত্যের উপর এতো দখল কীভাবে থাকতে পারে, ভাবিতই হই কেবল!
বরেণ্য কথাসাহিত্যিক মুহাম্মদ যাইনুল আবিদীন তো তাঁর লেখা সাহিত্যের ক্লাস বইয়ের উৎসর্গে বলেই দিয়েছেন—
ফরীদ উদ্দীন মাসঊদ
আশ্চর্য! মানুষ কীভাবে এত চমৎকার লেখে!
একদিনের ঘটনা। রমযান মাস ছিল।ঢাকা ইকরাতে হুযুর মাগরিবের নামাজ শেষে কামরায় ঢুকলেন। আমিও তাঁকে অনুসরণ করে কিছুক্ষণ পর ঢুকলাম। সালাম দিলাম। সালামের জবাব দিয়ে কুশলাদি জিজ্ঞেস করলেন। এরপর বাসা থেকে আসা খিচুরি খেতে বসে গেলেন। আমি সাহস নিয়ে অকপটে অনবরত বলে যেতে লাগলাম : হুযুর, “মাওলানা ফরীদ এখন কারাগারে” বইটিতে যে লিখেছেন “অলমতি বিস্তরণে” শব্দ দুটোর অর্থ তো কোথাও খুঁজে পাচ্ছি না? বাংলা একাডেমির ব্যবহারিক বাংলা অভিধান তন্ন তন্ন করে দেখেছি, তাও পাইনি। তাছাড়া শব্দটি “বিস্তরণে” নাকি “বিস্তরেণ”— কোনটি হবে? যাযাবরের “দৃষ্টিপাত”-এ তো “বিস্তরেণ” লেখা দেখেছি?
হুযুর মনোযোগসহকারে আমার কথাগুলো শুনছিলেন। খিচুরির দিকে ইশারা করে বললেন, খাবে তুমি? আমি ইতস্তত করে “জ্বী না” বলে ফেললাম! খিচুরির তসতরিটা আমার হাতে তুলে দিয়ে বললেন, “খেয়ে শেষ করে ফেলো।’’ তখন আর পিছুটান হইনি। অপূর্ব স্বাদের মজাদার খিচুরিটা সবটুকু খেলাম। হুযুর দেখলেন আমার খাওয়া শেষ। তারপর বললেন : “তুমি কি ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর বই পড়েছ?” আমি বললাম : “জ্বী না।” এরপর বললেন : “তাহলে তুমি তাঁর বই পড়ো, সেখানে পেয়ে যাবে।” আমি “জ্বী আচ্ছা” বলে সালাম দিয়ে চলে আসলাম। এরপর নাসির স্যারের সাথে বিষয়টি শেয়ার করে তাঁকে জিজ্ঞেস করি : হুযুর আমাকে সরাসরি অর্থটা বলে দিলেই তো পারতেন; কিন্তু তিনি বলেননি কেন? নাসির স্যার বললেন, হুযুর হয়তো অনুধাবন করেছেন যে, তুমি অনুসন্ধিৎসু ছেলে, ঘেঁটেঘুঁটে নিজেই খোঁজে বের করা শ্রেয়। তাই সরাসরি অর্থটা বলে না দিয়ে নিজে নিজেই বের করার পথ বলে দিলেন। ধরতে পারো এটা হুযুরের কোনো হেকমত!
নাসির স্যারের কথাটাকে আরও ঠিক মনে হলো যখন তামিমুল ইসলাম ফরীদী ভাইয়ের সাথে কথা বললাম। তিনি বললেন, “হুযুর আমাদের ছাত্রদের ক্ষেত্রে প্রা্য়ই প্রশ্নের সরাসরি উত্তর দেননি। প্রশ্ন করলে তিনি জানার ইচ্ছাটাকে আরও উসকে দেন নির্দিষ্ট সোর্স বলে দিয়ে।’’
লেখক : রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকপ্রশাসন বিভাগের শিক্ষার্থী
ইমেইল : auraihan3824@gmail.com


