মতামত। আমিনুল ইসলাম কাসেমী
করোনাকালে চিকিৎসক ও দাফনকারী জাতীয় বীর
কোভিড- ১৯ করোনা ভাইরাস এমন আতঙ্ক ছড়াচ্ছে বিশ্বব্যাপি, যার কারণে মানুষ একেবারে ভয়ে অস্থির। মানুষের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। এই রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের কাছে কেউ ঘেঁষতে রাজি নয়।
পুরো বিশ্বের একই হালাত। চীন থেকে নিয়ে শুরু করে ইউরোপ-আমেরিকা সব জায়গাতে এই করোনা ভীতি। বিশ্বের শক্তিধর রাষ্ট্রগুলো কাবু হয়ে পড়েছে। চিকিৎসা বিজ্ঞান মুখ থুবড়ে পড়েছে। যারা এতদিন চিকিৎসা বিজ্ঞান নিয়ে বড়াই করত, আধুনিক যন্ত্রপাতি নিয়ে নিজেদের গর্বের শেষ ছিলো না, তারাই এখন সবচেয়ে বড় অসহায়।
সবচেয়ে বড় সমস্যা হল, করোনায় আক্রান্ত রোগীর চিকিৎসা সেবা এবং মৃত্যু্বরণ কারীদের কাফন – দাফন এর ব্যবস্হাপনা। চিকিৎসা সেবায় অনেক দেশের ডাক্তার – নার্সগন এগিয়ে আসলেও করোনায় মৃত্যুবরণকারী ব্যক্তির সৎকার- কাফন দাফনে কেউ এগিয়ে আসছে না।
বিশ্বের বিভিন্ন জায়গায় করোনায় আক্রান্ত মৃত্যুবরণকারী লাশ পুড়িয়ে ফেলা হচ্ছে। ধর্মীয় মর্যাদায় তার সৎকারের ব্যবস্থা করা হচ্ছে না। কোথাও অনেক বেইজ্জতির সাথে মাটিতে পুঁতে রাখা হচ্ছে।
আরো ভয়াবহ অবস্থা হল, করোনায় আক্রান্ত হলে, তার কাছে কেউ যাচ্ছে না। চিকিৎসা সেবা এবং খাবার – দাবার দেওয়া থেকে বিরত থাকা হচ্ছে। কত জায়গায় না খেয়ে রোগীগুলো ধুঁকে ধুঁকে মারা যাচ্ছে।
আরো নিষ্ঠুর আচরণ হল, করোনায় আক্রান্ত মৃত্যু ব্যক্তিকে কেউ তাকে আর বাড়ি নিয়ে যেতে চায় না। নিজের সন্তান – আত্মীয়- স্বজন অনীহা প্রকাশ করছে। পরিচয় দিতে চাচ্ছে না। অথচ যে সন্তানদের লালন – পালন করে বড় করেছে, যাদের জন্য জীবন কোরবান করে দিয়েছে, আজ বিদায়ের মুহূর্তে কোন সন্তান, কোন আত্মীয় তার পাশে নেই। বড় নির্মমভাবে তারা বিদায় নিতে হচ্ছে।
আমাদের বাংলাদেশেও খুব অসহায় অবস্থা বিরাজ করছে। বিশ্বের অন্যান্য দেশের মত এখানেও সেই রকম পরিস্থিতি শুরু হয়েছে। বাংলাদেশে আরেকটা দুঃখজনক বিষয় হল, বিশ্বের অন্যান্য দেশে চিকিৎসা সেবায় নার্স এবং ডাক্তারগণ এগিয়ে এলেও আমাদের দেশের বহু ডাক্তার এবং নার্স চিকিৎসা সেবা দেওয়া থেকে বিরত রয়েছেন। নামি দামী ক্লিনিকগুলো বন্ধ করে রাখা হয়েছে। অনেক হসপিটালে ডাক্তার নেই।
এদেশে করোনায় মৃত্যু্বরণকারীদেরও দাফন- কাফন নিয়ে হিমশিম খেতে হয়েছে। অনেকেই সেই মহৎ কাজ করতে রাজি হননি।
সবচেয়ে আশ্চর্য বিষয় হল, মানবাধিকারের ফেরীওয়ালাগণ যেন একদম মুখে কুলুপ এঁটে রেখেছেন। বিশ্বব্যাপি এই দুর্যোগে কোন মানবাধিকার সংগঠনের ভূমিকা নেই। এমনকি আমাদের বাংলাদেশেও কোন মানবাধিকার সংগঠনের পাত্তা পেলাম না। কত সামাজিক সংগঠন, কত ধরনের মানবাধিকারের কর্মীগণ বুলি ছাড়েন, কিন্তু মানুষের এই মহা বিপদে কারোর পাশে দাঁড়াতে দেখলাম না। কারো কোন বক্তৃতা খুঁজে পেলাম না। কেউ এমন কথাও বললেন না, মানুষের এই চিরবিদায়ের সময় তাকে ধর্মীয় রীতি ছাড়া অন্য কোনভাবে বিদায় জানানো যাবে না।
আলহামদুলিল্লাহ, আল্লাহর দরবারে শুকরিয়া আদায় করি, ওলামায়ে দেওবন্দের একটি জামাত, কওমী মাদ্রাসার ছাত্র- আলেমগণ, কিছু দ্বীনদার ভাই পদক্ষেপ নিলেন, করোনায় মৃত্যুবরণকারীদের পুড়িয়ে ফেলা যাবে না। বা বেইজ্জতির সাথে মাটিতে পুঁতে রাখা যাবে না। মৃত্যু ব্যক্তিদের অবশ্যই গোসল এবং জানাযা দিতে হবে। এবং সন্মানের সাথে তাকে কবরস্থ করা হবে।
আমাদের ওলামায়ে কেরাম এবং দ্বীনি ভাইগণ দেশব্যাপি তাদের কর্মি বাহিনী তৈরী করে ফেলেছে । জেলায় জেলায় বহু আলেম এবং দ্বীনি সাথী এখন প্রস্তুত। করোনায় মৃত্যুবরণ করে কেউ যেন জানাযা আর কাফন – দাফন ছাড়া বিদায় না হয়।
একটা প্রশংসনীয় উদ্যোগ আলেমদের। এই দুর্যোগপুর্ণ মুহূর্তে জীবন বাজি রেখে মানুষের খেদমতে নিজেদের বিলিয়ে দেওয়া, এর থেকে পূণ্যের কাজ আর আছে বলে আমার জানা নেই।
এটাই ওলামায়ে দেওবন্দের বৈশিষ্ট্য। যুগে যুগে বিপদ- আপদে মানুষের সেবায় ওলামায়ে কেরাম জনতার পাশে। কোন স্বার্থ হাসিলের জন্য। কোন কিছু পাওয়ার জন্য নয়। একমাত্র আল্লাহের রেজামন্দী হাসিলের জন্য আলেমগন সব সময় মানুষের পাশে দাঁড়ায়।
যেখানে বিশ্বব্যাপি করোনায় আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণকারীদের ঘৃণার চোখে দেখা হচ্ছে। ভয়ে কেউ কাছে যেতে সাহস পাচ্ছে না। সেখানে আলেমগণ এবং মুহিব্বীন বীরের বেশে এগিয়ে যাচ্ছেন তাদের খেদমতে।
এজন্য আলেমগণই এবং ওসব দ্বীনি ভাইগণ আসল বীর। কঠিন বিপদে যারা মানুষের পাশে থাকে তারাই জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান। করোনায় আক্রান্ত মানুষের খেদমতে এবং মৃত্যুবরণকারীদের কাফন-দাফনে যারা নিজেকে নিয়োজিত রেখেছেন, তারাই জাতীয় বীর। আল্লাহ তায়ালা এই খেমদমতকে কবুল করুন। আমিন।
লেখক : শিক্ষক ও কলামিস্ট


