উত্তরে বানভাসি মানুষের দুর্ভোগ

উত্তরে বানভাসি মানুষের দুর্ভোগ

নিজস্ব প্রতিবেদক : উত্তর জনপদে শুকনো জায়গা নেই। কবরের জায়টুকু অবশিষ্ট নেই। সব কেড়ে নিয়েছে সর্বনাশা পানি। উজানের পানি আসছে হু হু করে। এরইমধ্যে শত বছরের রেকর্ড ছাড়িয়েছে যমুনা। সিরাজগঞ্চে শুকনো জয়গার অভাবে ঘরে চালে আশ্রয় নিয়েছে বানভাসি মানুষ। বিস্তীর্ণ জনপদে এখন অথই জলরাশি। বন্যাকবলিত এলাকায় বিশুদ্ধ পানীয়জল ও খাদ্য সঙ্কট প্রকট। পানিবাহী রোগে আক্রান্ত হাজারো মানুষ। সিরাজগঞ্জে যমুনায় বিপদসীমার ১২৮ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এতে ২৫৬টি গ্রাম বন্যাকবলিত হয়ে পড়েছে। সিরাজগঞ্জে পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী সৈয়দ হাসান ইমাম জানান, যমুনার পানি বৃদ্ধি একশ বছরের রেকর্ড ভঙ্গ করেছে। জেলার মোট ৭৮ কিলোমিটার বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের ৬/৭ কিলোমিটার ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। সেনাবাহিনী মেরামতকৃত বাঁধ এলাকায় কারিগরি সহযোগিতা দিচ্ছে। সর্বনাশা বানের জল ভাসিয়ে নিয়ে গেছে গবাদি পশুর সঙ্গে মানুষও! উত্তরের প্রধান নদনদী সর্বগ্রাসি হয়ে ওঠেছে। চোখের সামনে ভাসিয়ে নিয়ে গেছে সাজানো সংসার। জীবনরক্ষায় সব ফেলে নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে ছুটছে মানুষ। এ মুহূর্তে বন্যায় দেশের ২১টি জেলার ৯৬ উপজেলা প্লাবিত। এসব উপজেলার ৩২ লাখ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আর কমবেশি নষ্ট হয়েছে ১ লাখ ৭২ হাজার ২৭০ হেক্টর জমির ফসল। বুধবার দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় ভারপ্রাপ্ত সচিব গোলাম মোস্তফা সাংবাদিকদের এসব তথ্য জানিয়েছেন। উজানের দেশ ভারতের আসাম ও পশ্চিমবঙ্গের সীমান্তবর্তী জেলাগুলোও ভাসছে বানের জলে। সেখানের পানি নেমে এসে ভাটির বাংলাদেশের উত্তরজনপদ প্লাবিত করে মধ্যাঞ্চলে দিকে ধেয়ে আসছে। একারণে পদ্মাও ফুঁসে ওঠেছে। পদ্মাপারের নি¤œাঞ্চল এরইমধ্যে তলিয়ে গেছে। রাজধানীর চারদিকে উঁকি দিচ্ছে বানের জল। বুড়িগঙ্গা, শীতলক্ষা, তুরাগও এখন পূর্ণ যৌবন ফিরে পেয়েছে। টগবগ করছে মেঘনা।
রাজধানীর বৃত্তাকার নদনদীগুলো জলে টইটুম্বর। বহুদিনের জলতৃষ্ণা মিটিয়ে নিচ্ছে। এদিকে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিত বলেছেন, বন্যার ক্ষতি মোকাবেলায় সরকারের সকল প্রস্তুতি রয়েছে। আর ভারপ্রাপ্ত সচিব গোলাম মোস্তফা বলেছেন, বন্যা মোকাবেলায় সরকার আন্তরিকতার সঙ্গে সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। এই মুহূর্তে ত্রাণের কোনও অভাব নাই। স্থানীয় প্রশাসনের চাহিদা অনুযায়ী বরাদ্দ দেয়া হচ্ছে। পরিস্থিতি মোকাবেলায় মন্ত্রণালয়ে কন্ট্রোল রুম ২৪ ঘণ্টা খোলা রাখা হয়েছে। বন্যার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত প্রতিটি জেলায় মন্ত্রণালয় থেকে যুগ্ম সচিব পদ মর্যাদার একজন শীর্ষ কর্মকর্তাকে পাঠানো হয়েছে। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ সচিবের চলতি দায়িত্বে থাকা মো. গোলাম মোস্তফা বুধবার সচিবালয়ে নিজ কার্যালয়ে সাংবাদিকদের জানান, প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী এ পর্যন্ত প্রায় ৭ লাখ ৫২ হাজার পরিবার আংশিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
মারা গেছে ৩৭ জন। এখন পর্যন্ত আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে ১ হাজার ৫৯৯টি। এগুলোতে আশ্রয় নেয়া মানুষের সংখ্যা ৪ লাখ ১১ হাজার। ইতোমধ্যে ৯ আগস্ট থেকে এ পর্যন্ত ৩ হাজার ২৫৫ মেট্রিক টন চাল দেয়া হয়েছে। নগদ অর্থ দেয়া হয়েছে প্রায় ১ কোটি ৩২ লাখ। অন্যদিকে দেশের উত্তরাঞ্চলের বন্যা পরিস্থিতি ক্রমশ অবনতি হওয়ায় সরকারের নির্দেশে বন্যার্তদের সাহায্যার্থে এখন পর্যন্ত ২৯ প্লাটুন সেনাসদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। দিনাজপুর, গাইবান্ধা, রংপুর ও সৈয়দপুরে সেনাসদস্য ও উদ্ধার সরঞ্জামাদি বাড়ানো হয়েছে। বন্যার্তদের উদ্ধার ও বাঁধ রক্ষা কার্যক্রমের পাশাপাশি সেনাবাহিনী বন্যাদুর্গত মানুষের মাঝে প্রয়োজনীয় ত্রাণসামগ্রী বিতরণ ও চিকিৎসাসেবা প্রদান শুরু করেছে। এখন পর্যন্ত ওইসব এলাকা থেকে সেনাবাহিনী দুই হাজারেরও অধিক মানুষকে উদ্ধারসহ বিপুল পরিমাণ গবাদিপশু ও গৃহস্থালি সামগ্রী উদ্ধার করেছে। দিনাজপুরের চৌরঙ্গী সিনেমা হলসংলগ্ন বড়গুড়গোলা সড়কের ওপর দিয়ে বইছে পানি। অনেকে ঘর ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়ের দিকে ছুটছেন। দিনাজপুরে গত মঙ্গলবার পানিতে ডুবে আরও দুই ব্যক্তির মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে জেলায় ২৩ জনের প্রাণ কেড়ে নিয়েছে বানের জল। জেলা প্রশাসক মীর খায়রুল আলম জানান, বন্যার্তদের জন্য ৩২০টি আশ্রয় কেন্দ্র খোলা হয়েছে। সেগুলোতে প্রায় ১ লাখ ৪০ হাজার মানুষ আশ্রয় নিয়েছে। দিনাজপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপসহকারী প্রকৌশলী মো. সিদ্দিকুরজ্জামান জানান, বুধবার সকাল ৯টা পর্যন্ত দিনাজপুরের পুনর্ভবা নদীর পানি বিপদসীমার ১৬ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হয়। হু হু করে বাড়ছে পদ্মার পানি।
গত ২৪ ঘণ্টায় এ নদীর পানি রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ পয়েন্টে ২১ সেন্টিমিটার বেড়ে বিপদসীমার ৭৭ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। ভাগ্যকূল পয়েন্টে ১৭ সেন্টিমিটার বেড়ে বিপদসীমার ১৫ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে বইছে। পদ্মায় পানি বৃদ্ধির ধারা আরও তিনদিন অব্যাহত থাকতে পারে। এর ফলে রাজধানী ঢাকাসহ মধ্যাঞ্চলে বন্যা আশঙ্কা করছে বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র। অন্যদিকে কুড়িগ্রামসহ উত্তরাঞ্চলের বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছে এবং এটা অব্যাহত থাকবে। বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. সাজ্জাদ হোসেন জানান, প্রধান ২০টি নদীর ২৯টি পয়েন্টে বিপদসীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। ব্রহ্মপুত্র-যমুনা এবং গঙ্গা-পদ্মা নদীর পানি বৃদ্ধি পাচ্ছে। অপরদিকে সুরমা-কুশিয়ারা নদীর পানি কমছে। আগামী ৪৮ ঘণ্টায় যমুনা নদীর পানি বৃদ্ধি স্থিতিশীল হয়ে কমতে থাকবে। জামালপুরে ৪ লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েছে। ৩ শতাধিক অধিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ। বুধবার যমুনার পানি বাহাদুরাবাদ ঘাট পয়েন্টে বিপদসীমার ১৩৩ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। মাদারগঞ্জে চাঁদপুর-নাংলা নাদাগারী অংশে যমুনা বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ ভেঙে ৩০টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে।
ইসলামপুরে ২১০টি আধাপাকা ঘর বন্যার পানিতে নিশ্চিহ্নি হয়েছে। দিনাজপুরে জেলায় বন্যা পরিস্থিতি অপরিবর্তীত রয়েছে। জেলার ১৬টি নদীর পানি বুধবারও বিপদসীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হয়। দিনাজপুরের সাথে সারাদেশের রেল যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন রয়েছে। জেলা সঙ্গে ১১টি উপজেলার সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন। সেনাবাহিনীর দুইশ সদস্য দিনাজপুর শহররক্ষা বাঁধ মেরামতে কাজ করছে। জেলার প্রায় ৫ লাখ মানুষ গৃহহীন। লালমনিরহাটে ধরলা নদীর পানি বিপদসীমার ১০০ সে.মি উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। ৫টি উপজেলার লক্ষাধিক পরিবার পানিবন্দি। সদর উপজেলার ধরলা নদীর তীরবর্তী ৪টি বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ ভেঙে বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়েছে। রেল যোগাযোগ বুধবারও স্বাভাবিক হয়নি। ২৬ হাজার হেক্টর ফসলি জমি ও প্রায় ৫ হাজার পুকুরের মাছ ভেসে গেছে। তিনটি সেনাবাহিনীর মেডিকেল টিম জেলায় কাজ করছে। এপর্যন্ত জেলায় বন্যাজনিত কারণে পাঁচজনের মৃত্যু হয়েছে। আরিচাঘাট পয়েন্টে গত ২৪ ঘণ্টায় যমুনা নদীর পানি বিপদ সীমার ৩৭ সে.মি উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। বগুড়ায় সারিয়াকান্দি পয়েন্টে বিপদসীমার ১১৪ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়। বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের বেশকিছু স্থানে ফাটল দেখা দিয়েছে। প্রায় দেড় হাজার হেক্টর জমির ফসলের ক্ষতি হয়েছে। ৬৬টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পানি প্রবেশ করেছে।
নেত্রকোনার ৮টি উপজেলায় দুই লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দী। দুর্গাপুৃর, কলমাকান্দা উপজেলার সড়ক যোগাযোগ বন্ধ রয়েছে। জেলায় ৯৮ টি মেডিকেল টিম গঠন করা হয়েছে। কুড়িগ্রামে ব্রহ্মপুত্রের পানি বেড়ে বন্যা পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করছে। বুধবার চিলমারী পয়েন্টে ব্রহ্মপুত্রের পানি বেড়ে বিপদসীমার ৮৫ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে এবং সেতু পয়েন্টে ধরলার পানি বিপদসীমার ১০১ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। ভূরুঙ্গামারী-সোনাহাট স্থল বন্দরের সাথে সব ধরনের যোগাযোগ বন্ধ রয়েছে। কুড়িগ্রাম-নাগেশ্বরী পাকা সড়কের কয়েকটি স্থান ভেঙ্গে ও পানি প্রবাহিত হওয়ায় বিচ্ছিন্ন রয়েছে সড়ক যোগাযোগ। কুড়িগ্রামের টগরাইহাটে রেলওয়ে সেতুর গার্ডার ধসে যাওয়ায় রেল যোগাযোগ বন্ধ রয়েছে। সুনামগঞ্জে সুরমার পানি বিপদসীমার ৪৪ সে.মি. উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল।
নওগাঁর আত্রাই নদীর বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ ১৪টি স্থানে ভেঙে গেছে। ছোট যমুন নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়ে নওগাঁ শহর রক্ষা বাঁধ উপচে নওগাঁ শহরের বেশ কিছু এলাকা প্লাবিত। ধামইরহাটে আত্রাই নদীতে ২০০ সেন্টিমিটার, পতœীতলায় ২২০ সেন্টিমিটার, মান্দায় ১১১ সেন্টিমিটার বিপদসীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হয়। নীলফামারী পানির তোড়ে ভেঙে যাওয়া সৈয়দপুর শহর রক্ষা বাঁধের ভাঙন বুধবারও রোধ করা সম্ভব না হওয়ায় উপজেলার নতুন নতুন এলাকা জলমগ্ন হয়ে পড়ছে। সেনাবাহিনীর সদস্যরা ভাঙনরোধে বিরামহীনভাবে কাজ করে চলেছেন। সৈয়দপুর ১০০ শয্যা হাসপাতালের নিচতলায় পানি ঢুকে পড়ায় বন্ধ রয়েছে।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *