আলেমদের বন্ধু ছিলেন ধর্ম প্রতিমন্ত্রী শেখ আব্দুল্লাহ
আমিনুল ইসলাম কাসেমী :: আহ্, কষ্টে বুকটা ফেটে যাচ্ছে! হৃদয়ে রক্তক্ষরণ হচ্ছে! আমি যেন বাকরুদ্ধ। শুধু নির্বাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে তাঁর স্মৃতিময় জীবনের দিকে। একজন আওয়ামী লীগের নেতা, একজন ধর্ম প্রতিমন্ত্রী-এত উদার, এত প্রশস্থ হৃদয়ের অধিকারী, এত সৎ-নির্ভিক! এমন আর কি পাওয়া যাবে! আপাদমস্তক যার নূরানী শোভায় সুশোভিত। সেই কবে তিনি ঐতিহ্যবাহী গওহরডাঙ্গা মাদ্রাসায় পড়েছিলেন, তারপর বিভিন্ন স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়েও সময় দিয়েছেন, কাটিয়েছেন দীর্ঘ রাজনৈতিক ও কর্ম জীবন; তারপরেও তিনি সেই কওমী তথা ইসলামী ধ্যান-ধারণার উপর গভীরভাবে নিবিষ্ট ছিলেন। পুরো জীবনের সময়গুলো আলেম-উলামার খেদমতে সপে দিয়েছিলেন তিনি।
ধর্ম প্রতিমন্ত্রী শেখ মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সারা জীবন আওয়ামী লীগের রাজনীতি করেছেন। একজন নিষ্ঠাবান রাজনীতিক হিসেবে তাঁর পরিচিতি সব জায়গায়। অসৎ রাজনীতি, কালোটাকা, রাজনীতিকে ভিন্ন খাতে ব্যবহার করা, একদমই অপছন্দ ছিল উনার। বিশেষ করে হিংসার রাজনীতি কী জিনিস সেটা জানতেন না তিনি। ভদ্র-মার্জিত ব্যবহার তাঁর সব সময়। সেই রাজনীতি জীবনের শুরু থেকে দেশ ও দশের খেদমতে নিজেকে নিয়োজিত রেখে ছিলেন।
শেখ আব্দুল্লাহ ছিলেন আলেম-উলামার বন্ধু। মন্ত্রী হওয়ার পরে নয়, জীবনের শুরু থেকে আলেম ও দ্বীনদার লোকদের সাথে তাঁর উঠা-বসা। অবশ্য তাঁর এই আলেমবান্ধব হওয়ার মূলে এক জিনিস কাজ করেছে। তিনি ছিলেন কোরআনের হাফেজ। মুজাহিদে মিল্লাত আল্লামা শামসুল হক ফরিদপুরী (রহঃ)-এর প্রতিষ্ঠিত গওহরডাঙ্গা মাদ্রাসায় তিনি হেফজ সমাপন করেছিলেন। এবং আল্লামা ফরিদপুরী (রহঃ)-র সোহবাতে সময় পার করেছিলেন, যার কারণে তাঁর জীবনের মোড় ঘুরে যায়।
হেফজ সমাপন করার পর জেনারেল লাইনে বিস্তর লেখাপড়া করেছিলেন তিনি। স্বীকৃতি পেয়েছিলেন খ্যাতিমান আইনবিদ-এর। একদিকে তুখোড় রাজনীতিবিদ অন্যদিকে বিশিষ্ট আইনজ্ঞ। তবে রাজনীতি করুক আর আইন পেশায় থাকুক, শেখ মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ সততাকে ছাড়েননি কোনোদিন। হক-হক্কানিয়্যাতের পর্দাকে কামড়ে রেখেছিলেন আজীবন। যত সমস্যা আসুক, নির্ভিক সৈনিকের মতো পথ চলা ছিল তাঁর। কিঞ্চিৎ পরিমাণ হকের মিশন থেকে সরে যাননি তিনি।
তাই তো তিনি বলতেন, আমি রাজনীতি শিখেছি বঙ্গবন্ধুর কাছ থেকে, আর আমার তাসাউফ-আধ্যাত্মিকতার গুরু হলেন আল্লামা শামসুল হক ফরিদপুরী (রহঃ)। তিনি এটাও বলতেন, আল্লামা ফরিদপুরী (রহঃ) তাঁকে তবলীগে পাঠিয়েছেন।
আসলে শেখ আব্দুল্লাহ সাহেব যে আল্লামা শামসুল হক ফরিদপুরী (রহঃ)-র সোহবত পেয়েছিলেন, সেটা বোঝা যেত তাঁর চাল-চলন, কথা-বার্তা, লেন-দেন, ওঠা-বসা, সবকিছুতে একজন আল্লাহওয়ালা মানুষের সান্নিধ্য পাওয়ার সিফাত ফুটে উঠত। তাঁর সবকিছু আলেমদের মতো ছিল। ঘুষ-দুর্নীতির বিরুদ্ধে সদা সজাগ। এত বড় ক্ষমতার অধিকারী, তারপরেও বিচ্যুত হন নি সততার মশাল জ্বালিয়ে রেখেছিলেন। পরিচ্ছন্ন ও ঝুট-জঞ্জালবিহীন পরিবেশ তৈরী করেছিলেন সর্বত্র। তাঁর বিচরণ ক্ষেত্রগুলো ছিল নিষ্কলুষ।
শেখ আব্দুল্লাহ সাহেবের পরিচয় জেনেছিলাম বহু বছর আগে হাটহাজারী মাদ্রাসার ওলামা সন্মেলনে। তখন তিনি মন্ত্রীত্ব লাভ করেন নি। আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় ধর্মবিষয়ক সম্পাদক তখন। আওয়ামী লীগ সরকার আলেমদের সন্মেলনে তাঁকে প্রেরণ করেছিল। এক পর্যায়ে তিনি বক্তৃতা করলেন। অত্যন্ত প্রাঞ্জল ভাষায় কথাগুলো ছিল তাঁর। সেদিন বুঝলাম, তিনি শুধু জেনারেল শিক্ষায় শিক্ষিত নয়, এ্যারাবিক লাইনে তাঁর যথেষ্ট দখল রয়েছে। সেই সাথে আরও ফুটে ওঠেছিল, একজন আদবী-আখলাকী মানুষ তিনি।
বিগত ২০১৯ সালে ধর্ম মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত হন শেখ মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ সাহেব। এই প্রথম তিনি মন্ত্রী। আগে কখনো দায়িত্ব পান নি। কিন্তু তিনি ছিলেন সফল। ইতিপূর্বে ধর্ম মন্ত্রণালয়ে বহু মন্ত্রীর আগমন ঘটেছে এই বাংলাদেশে। কিন্তু শেখ আব্দুল্লাহর মতো সফলতার সাথে কেউ মন্ত্রণালয় চালাতে পারেন নি। অনেক সুনাম অর্জন করেছেন। তাঁর কর্ম দক্ষতা, সততা, ন্যায়-নীতি সবার নজর কেড়েছিল। বিশেষ করে ঘুষ-দুর্নীতি ও সকল প্রকার অনিয়মের বিরুদ্ধে তাঁর কঠোর অবস্থান ছিল। কোনো ধরনের অনিয়মকে তিনি পাত্তা দেন নি।
ধর্ম মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত হওয়ার পর তাঁর বহু সফলতা। অনেক সুনামের সাথে তিনি আঞ্জাম দিয়েছেন। যে সেক্টরগুলোতে অনিয়ম এবং অব্যবস্থাপনা ছিল, তাঁর দক্ষতায় সেসব সেক্টরগুলো গতি ফিরে পেয়েছে, শৃঙ্খলা ফিরে পেয়েছে। তাঁর ছোঁয়ায় অনেক এগিয়েছে। যেমনঃ
(এক) হজ্জ্ব ব্যবস্থাপনা : হজ্জ্ব ব্যবস্থাপনায় তিনি ছিলেন সফল। যুগের পর যুগ হজ্জ্ব ব্যবস্থাপনায় অনিয়ম-অভিযোগ চলে আসছিল। হজ্জ্বের মৌসুমে হাজার হাজার হাজী সাহেবকে ঢাকা এয়্যারপোর্ট, মক্কা-মদীনায় নানান অভিযোগ দায়ের করে কাঁদতে দেখা গেছে। কতজন হারিয়েছে সহায়-সম্বল। অসাধু এজেন্সির কবলে পড়ে খুঁইয়েছে সবকিছু। এমন কোনো বছর ছিল না হাজীদের অভিযোগ ওঠে নি।
ধন্যবাদ এবং দুআ করতে হয়, মাননীয় ধর্ম প্রতিমন্ত্রী শেখ মোহাম্মদ আব্দুল্লাহর জন্য। তিনি দায়িত্বগ্রহণ করার পর হজ্জ্ব ব্যবস্থাপনায় আমূল পরিবর্তন করে ফেলেছিলেন। একদম স্বচ্ছতা নিয়ে এসেছিলেন প্রতিটি কাজ-কর্মে। তিনি প্রথমে এসেই যে হুঙ্কার ছেড়ে ছিলেন, তা সত্যি প্রশংসনীয়। তিনি বলেছিলেন, হাজীরা আল্লাহর মেহমান, যে তাদের চোখের পানি বের করবে, আমিও তাদের চোখের পানি বের করে ছাড়ব।
হজ্জ্ব ব্যবস্থাপনায় এক যুগান্তকরী পদক্ষেপ ছিল, সৌদি আরবের ইমিগ্রেশন বাংলাদেশে হওয়া। এটা কিন্তু দুরূহ ব্যাপার। ভিন্ন দেশের ইমিগ্রেশন নিজ দেশে করা চাট্টিখানি কথা নয়। মাননীয় মন্ত্রীর দক্ষতায় সেটা সম্পাদন হয়েছিল। আমরা দেখেছি, গত বছরে যাঁরা হজ্জ্বব্রত পালনের জন্য গিয়েছেন, তাঁদের অধিকাংশের সৌদির ইমিগ্রেশন হয়েছে ঢাকায়।
(দুই) মসজিদ মাদ্রাসায় ব্যাপক অনুদান : সারাদেশের জেলা-উপজেলায় আধুনিক মডেলের মসজিদ নির্মাণের কাজে হাত দিয়েছিলেন তিনি। দেশের এমন কোনো জায়গা নেই, যেখানে ধর্ম মন্ত্রণালয়ের সাহায্য সহযোগিতা পৌঁছে নি। ইসলামিক ফাউন্ডেশনের কার্যক্রম অনেক গতিশীল করেছিলেন তিনি। ইসলামিক ফাউন্ডেশনে আলেম-উলামাদের প্রাধান্য দিতেন। বহু আলেমকে ইসলামী ফাউন্ডেশনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে কাজের সুযোগ করে দিয়েছেন।
(তিন) দ্বীনী কাজে ওলামায়ে কেরামকে প্রাধান্য : আব্দুল্লাহ সাহেব দ্বীনী কাজে ওলামায়ে কেরামকে আন্তরিকভাবে প্রাধান্য দিতেন। বিশেষ করে সংকটময় সময়গুলোতে আলেমদের শরণাপন্ন হয়েছেন। নিজের ইচ্ছে মতো কিছু করেন নি। আলেমগণের পরামর্শ মোতাবেক করার চেষ্টা করতেন।
চাঁদ দেখা, ঈদের চাঁদ, রমজানের চাঁদ, শবে বরাত, এসব বিষয়ে আলেমদের পরামর্শের বাইরে তিনি যান নি। কখনো হয়তো চাঁদ দেখা নিয়ে নানান সমস্যা দেখা দিয়েছে। এক অস্থিতিশীল পরিবেশ তৈরীর পথে। সেসব সময়ে তিনি আলেমদের সাথে পরামর্শ করে সিদ্ধান্ত নিতে দেখা গেছে।
(চার) কওমী সনদ প্রসঙ্গ : কওমী সনদের স্বীকৃতির বিষয়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ছিলেন গভীরভাবে আন্তরিক ও দৃঢ়চেতা। কওমী সনদের বিষয়ে আমলা এবং বিভিন্ন পক্ষের ও বিভিন্ন রাজনৈতিক ব্যক্তিদের যে বিভিন্নভাবে বাধা ছিল না তা নয়। কিন্তু তখন একজন মন্ত্রীর কথা বিশেষ করে বলতে হবে যিনি দৃঢ়তার সাথে কওমী সনদের স্বীকৃতির পক্ষে অর্থাৎ এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর মনোবল দৃঢ় রাখতে বিশেষভাবে উৎসাহ দিয়ে গেছেন এবং ১৪ দলের কোনো কোনো নেতার ও সরকার বিরোধীদের বক্তব্যের যুক্তিপূর্ণ জবাব দিয়ে গেছেন তিনি শেখ মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ। কওমী সনদের স্বীকৃতির বিষয়ে তাঁর অবদানের কথা বলে শেষ করা যাবে না। আলেমদের এক প্লাট-ফরমে এনে তিনি কওমী মাদ্রাসার দাওরায়ে হাদীসের সনদকে মাষ্টার্স-এর সমমান দেওয়ার ব্যাপারে সরকার এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তিবর্গের সাথে তাঁর দৌড়ঝাপ যে কী পরিমাণ ছিল, তার ইয়ত্তা নেই। তিনি যেন নিজেকে কোরবান করে দিয়েছিলেন।
সর্বোপরি সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের শোকরানা মাহফিল বাস্তবায়নে তাঁর ছিল অপরিসীম অবদান।
(পাঁচ) আলেমগণের পরামর্শ : শেখ মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ সাহেব আলেমদের কাছে মশওয়ারা চাইতেন যেকোনো বিষয়ে। জটিল কোনো বিষয়ের সমাধানের জন্য বিজ্ঞ আলেম-মুফতিদের সাথে পরামর্শ করে নিতেন। কখনো মনগড়া কোনো কাজ করতে তাঁকে দেখা যায় নি। কোনো মাসয়ালা জানতে হলে সরাসরি আলেমদের সাথে ফোন করে জেনে নিতেন। কোনো অহংকারবোধ দেখা যায় নি তাঁর মধ্যে।
মোটকথা, ধর্ম প্রতিমন্ত্রী শেখ আব্দুল্লাহ একজন আলেমদের নিষ্ঠাবান বন্ধু ছিলেন। যার ধ্যান- জ্ঞান ছিল আলেমদের মতো। দেশের শীর্ষ আলেমদের সাথে তাঁর ছিল বিশাল সখ্যতা। মরহুম আল্লামা আশরাফ আলী (রহঃ) যখন অসুস্থ হয়ে হসপিটালে, তখন দেখা গেছে, তিনি আল্লামা আশরাফ আলী সাহেবের মুখে খাবার তুলে দিচ্ছেন। তিনি তাঁর কাজের মধ্য দিয়ে আলেমগণের মন জয় করে নিয়েছিলেন।
আরেকটি বড় বিষয় হলঃ আন্তর্জাতিক কুরআন প্রতিযোগিতায় বিজয়ী হাফেজদের ইতিপূর্বে কোনো মন্ত্রীকে এ রকম উৎসাহ-উদ্দীপনা দিতে দেখা যায় নি। যেমনটি শেখ আব্দুল্লাহ সাহেব বিজয়ী হাফেজদের সন্মান আর ভালবাসা দেখায়েছেন। তিনি খ্যাতিমান হাফেজদের বুকে জড়িয়ে ধরতেন। তাদের এত ভালবাসা দিতেন যা ব্যক্ত করার ভাষা আমার নেই।
হক-হক্কানিয়্যাত প্রতিষ্ঠিত করার সৈনিকদের ভালবাসার মানুষ ছিলেন তিনি। নবীর ওয়ারিছদের প্রিয় ব্যক্তিত্ব ছিলেন তিনি। মনে পড়বে তাঁকে চিরদিন। বিশেষ করে এ দেশের আলেমদের হৃদয়ে চিরদিন গেঁথে থাকবে শেখ আব্দুল্লাহর নাম।
মহান আল্লাহর কাছে কায়মনোবাক্যে দুআ করি, আল্লাহতালা তাঁকে ক্ষমা করুন, জান্নাতুল ফিরদাউসে সমাসীন করুন। আমিন।
লেখক : শিক্ষক


