দেওবন্দের স্মৃতি ও কোরবানী
আমিনুল ইসলাম কাসেমী :: কোরবানীর ঈদ এলে ছাত্রজীবনের দারুল উলুম দেওবন্দের স্মৃতিগুলো ভেসে ওঠে বারবার। সেই সাথে আরো ভেসে ওঠে ঢাকায় পড়াকালীন সময়ের স্মৃতি। বড় মজার সে স্মৃতি ভোলা যাবে না কোনদিন।
যখন ঢাকায় ছিলাম, কোরবানীর ঈদ এলে যেন আনন্দের বন্যা বয়ে যেত। বিশেষ করে কোরবানী উপলক্ষে বিশেষ অনুষ্ঠানগুলো ছিল আকর্ষণীয়। নানান অনুষ্ঠান, হামদ-নাত, আবৃত্তি, কোরবানী সম্পর্কে বক্তৃতা, প্রতিযোগিতা, কোরবানীর কাজের বাস্তব অভিজ্ঞতা বর্ণনা করা, এরকম অনুষ্ঠানগুলো ছাত্রদের হৃদয় ছুঁয়ে যেত। সাহিত্যপ্রেমিদের মিলন মেলা বসত। কোরবানী উপলক্ষে মাসিক দেয়ালিকার বিশেষ সংখ্যা প্রকাশ পেত। তাতে সাহিত্যপ্রেমিদের বিভিন্ন লিখনী, গল্প, প্রবন্ধ- নিবন্ধ, কবিতা, ছড়া স্থান পেত।
পুরো দেয়ালিকা সাজত নতুন এক সাজে। কলমের আচঁড়, সেই সাথে তুলির আঁচড়ে সৌন্দর্য বৃদ্ধি পেত অনেকগুণ। দেয়ালিকার সামনে দাঁড়ালে যে কোন পাঠকের মনে দোলা দিয়ে ওঠত।
এরপর কোরবানীর দিনে ছুরি নিয়ে বেরিয়ে পড়া। আল্লাহর নামে পশু কোরবানী করা। কত যে পশু জবাই করার তাওফিক হয়েছে, সেটার হিসাব নেই। আল্লাহ তায়ালা সবচেয়ে বেশী ভাল জানেন।
কোরবানীতে দারুল উলুম দেওবন্দের স্মৃতি ভেসে ওঠে সবচেয়ে বেশী। বাংলাদেশ থেকে প্রায় দু হাজার কিলোমিটার দুরের রাস্তা দেওবন্দ মাদ্রাসা। আমরা ঈদে বাড়ি আসতে পারিনি। মাদ্রাসাতেই ছিলাম। ভারতের প্রায় বেশীর ভাগ ছাত্ররা বাড়িতে চলে যায়। বাংলাদেশের দু চারজন ছাত্র বাড়ি ফিরে আসে। কিন্তু আমরা বছর না পেরুলে বাড়িতে আসার নাম নেই নি কখনো। যার কারণে ঈদে মাদ্রাসাতে অবস্থান করতে হয়েছে। তবে মাদ্রাসাতে অবস্থান করে যে মজা পেয়েছি, তা ভোলা যাবে না কোনদিন।
দেওবন্দ মাদ্রাসা সবসময় ছাত্রদের সুবিধা এবং স্বার্থ সংরক্ষণে সচেতন। তারা ছাত্রদের যেভাবে মেহমানদারী করে, থাকা- খাওয়ার ইন্তেজাম করে, সেটা অনেকটা রাজকীয় হালাত বলা যায়। যে উন্নত মানের খাবার, সকালে ডাল রুটি, অত্যান্ত সুস্বাদু ঘন ডাল, যার স্বাদ যেন এখনো মুখে লেগে আছে। বিকেলে মহিষের গোস্ত আর রুটি। আবার মাসে তিন দিন খুবই উন্নত মানের বিরিয়ানী। যে সুস্বাদু বিরিয়ানীর কথা কোন ছাত্র কোনদিন ভুলতে পারবে না।
খাবারের এ রুটিন সারা বছরের জন্য,কোনদিন ব্যতয় ঘটেনি। যে রকম অবস্হা হোকনা কেন, খাবারের এই সিষ্টেম সারা বছর ঠিক থেকেছে। আরো রয়েছে, ছাত্রদের মাসিক ওজিফার ব্যবস্থা। মানে অত্যন্ত চমৎপ্রদ সিষ্টেম।
কোরবানীর সময় দারুল উলুম বন্ধ থাকে। ছাত্ররা সব বাড়ি চলে যাওয়ার পরেও দুই থেকে আড়াই হাজার ছাত্র সবসময় ছাত্রাবাসগুলোতে দেখা যায়।
কোরবানী উপলক্ষে ছাত্রদের জন্য উন্নত মানের খাবার তো থাকেই, সেই সাথে শত শত মহিষ জবাই করে রাখা হয় ছাত্রদের জন্য। একটা দুটো নয়। শত শত জবাই হয়। পুরো তিন দিন।
আমার মনেহয় জিলহজ্জের দশ তারিখে চার/ পাঁচশত, জিলহজ্জের এগার তারিখে আরো চারপাঁচ শত, ঠিক বার তারিখে আরো সমসংখ্যক মহিষ জবাই করে, চামড়া ছিলে চার টুকরা করে রাখা হয়। সবই ছাত্রদের জন্য। আর ছাত্ররা সেগুলো কাঁধে করে নিজ নিজ ছাত্রাবাসে নিয়ে কেটে টুকরো টুকরো করে নিজের ইচ্ছেমত রান্না করে খেতে পারে। এক মহা আনন্দে সময় কাটে।
কোরবানীর আগের দিন হঠাৎ দেখলাম, একটা বড় ট্রাক কাঠের ছোট ছোট টুকরা বিভিন্ন ছাত্রাবাসের সামনে ফেলে গেল। পুরনো ছাত্রদের দেখলাম, একটা করে কাঠের টুকরা নিজ নিজ কক্ষে নিয়ে যেতে। বিষয়টা আমরা আগে বুঝতে পারিনি। ঈদেরদিন যখন শত শত মহিষ জবাই করে মাজবাহখানায় (কসাইখানা) গোস্তের স্তুপে ছাত্রদের আহবান করছিল, তখন বুঝে আসল কাঠের টুকরাটার মর্ম। যাক তবুও পাওয়া গেল। আমরাও মহিষের রান বা অন্য কোন অংশ অতি কষ্টে ছাত্রাবাসের সামনে নিয়ে আসলাম। সারাদিন সেটার উপরে মেহনত চলল।
আমরা দুই বন্ধু প্রায় তিনমণ গোস্ত কেটে সাইজ করে খাবারের উপযুক্ত করেছিলাম। তখনতো ফ্রিজ ছিল না আমাদের কাছে। গোস্তগুলো ছাত্রাবাসের ছাদে রোদ্রে শুকিয়ে বস্তা ভরে রেখেছিলাম। শশমাহী ইমতেহান পর্যন্ত সেগুলো আমরা রান্না করে খেয়েছি। বহু বন্ধুদের হাদিয়া দিয়েছি।
সে এক আজব স্মৃতি। বিস্ময়কর। গোস্ত শুকানো। আবার গোস্তগুলো বস্তায় ভরে রাখা, বড় মজার স্মৃতি। যেগুলো কোনদিন ভোলা যাবেনা। কোরবানী আসলে স্মৃতির পাতায় ভেসে ওঠে সবকিছু। ভুলতে পারিনা সেগুলো। দারুল উলুম দেওবন্দের বিষ্ময়কর স্মৃতি। যা কোনদিন ভুলব না।
লেখক : শিক্ষক


