সাব্বাশ প্রিন্সিপাল সাহেব

সাব্বাশ প্রিন্সিপাল সাহেব

সাব্বাশ প্রিন্সিপাল সাহেব

মুহাম্মাদ আইয়ুব :: শিক্ষকতার জীবনে প্রবেশ করতে গুরুর দোয়া লাগে, তাই ওয়াদুদ সাহেব এই ময়দানে নামার আগে আপনা গুরুর দোয়া নিতে ছুটে গেলেন বারিধারায়। দীর্ঘ আলাপ আলোচনার পর গুরু মশাই ওয়াদুদ সাহেবকে নসিহত করলেন, ওয়াদুদ! ছাত্রদেরকে আপন সন্তান মনে করে পড়াবে, কখনো পরের সন্তান মনে করে পড়াবে না।

প্রচন্ড রাগী মানুষ হওয়া সত্ত্বেও ওয়াদুদ সাহেব দশ বছরের শিক্ষকতা জীবনে গুরুর নসিহত অক্ষরে অক্ষরে পালন করলেন। উনি যে ডিপার্টমেন্টের শিক্ষক সেই ডিপার্টমেন্টের নাম ‘হিফজ বিভাগ’। সারা দুনিয়াতে এমন হাড়ভাঙা খাটুনির ডিপার্টমেন্ট আর নেই। মর্ত্যের আসল অগ্নি পরীক্ষাটা এখানেই দিতে হয়। এখানে ধৈর্য্যকে আয়ত্তে রাখা বিরাট সাধনার ব্যাপার, এক কথায় অসম্ভব! তা সত্ত্বেও তিনি গুরুর নসিহতকে সবসময় প্রাধান্য দিয়ে থাকেন।

ছাত্রদের উল্টাপাল্টা নীরবে সয়ে যান তারপরও নিজের রাগের বহিঃপ্রকাশ কালেভদ্রে ছাড়া ঘটান না! তবে বহিঃপ্রকাশটা ঘটে নিজ বাসায় অবলা বউটার সাথে। বউটাও বড় লক্ষ্মী সবকিছুই চুপচাপ হজম করে ফেলে। কারণ, ওয়াদুদ সাহেব রাগের বিষয়টা আগেই তাকে হাতে-কলমে বুঝিয়ে দিয়েছে।

চৈত্র্যের এক ভ্যাপসা সন্ধ্যায় হিফজখানার সবাই যখন পাগলের মতো সবক মুখস্থ করায় ব্যস্ত, তখন দুষ্ট নাসির তার পাশের জনের মাথার টুপি নিয়ে কেঁচি দিয়ে টুপির বাড়তি সুতো একমনে কেটে যাচ্ছে। দৃশ্যটা ওয়াদুদ সাহেবের চোখে পড়ে গেল। হিফজখানার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও মূল্যবান সময় হচ্ছে বাদ মাগরিব, অথচ এই হতচ্ছাড়াটা এ সময় কিনা বাঁদরামিতে মেতে আছে?

ওয়াদুদ সাহেব নিজেকে আর সংবরণ করতে পারলেন না, নাসিরকে ডেকে আচ্ছামত শাসন করে দিলেন। শাসন করার পর নিজেকে নিজে ধরে রাখতে পারলেন না। গুরুর নসিহত বদের হাড্ডি নাসিরের বদকে আড়াল করে ফেলল। ন্যায়সঙ্গত শাসন। তারপরও বিবেক তাকে কুরে কুরে খাচ্ছিল, নিজেকে নিজে অভিসম্পাত দিচ্ছিলেন আহ! কি দরকার ছিল মারার, কেন এভাবে মারতে গেলাম, একটু শাসিয়ে দিলেই তো পারতাম! মনের অজান্তেই শিক্ষকের গণ্ড বেয়ে অশ্রু ঝরঝর করে পড়তে লাগল।

দেয়ালে শ্যেন দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকা সিসি ক্যামেরা বড় তৃপ্তি নিয়ে শাসনের দৃশ্য নিজের বুকে ধারণ করে ফেলল। মুহুর্তেই সেই ভিডিও ছড়িয়ে পড়ল দেশময়। চতুর্দিক হতে মাসীদের দরদ উপচে পড়তে লাগল। অতি উৎসাহী সাংবাদিক বন্ধুরা ভিডিওটায় রংচং লাগিয়ে মাদ্রাসা শিক্ষাকে প্রশ্নবিদ্ধ করার মহান ব্রতী নিয়ে দলবদ্ধভাবে ময়দানে ঝাপিয়ে পড়লেন। এদিকে ভিডিও আর আশপাশের দয়ালু মাসীদের প্ররোচনায় নাসিরের বাবা লিপ্টন দাঁড়িয়া রেগেমেগে আগুন। দলবলসহ মাদ্রাসায় ছুটে আসল প্রতিশোধ নিতে!

প্রিন্সিপাল সাহেবের রুমে যেয়ে গলা উঁচিয়ে হুংকার ছাড়ল ওই হুজুর! জানোয়ার ওদুইত্যা কই? আমার পুলারে কি পিডানোর লাইগ্যা আপনেগো গারদে দিছিলাম? সবাই মিইল্যা এভাবে পিডাইয়া পুডাইয়া পুলাপাইন মাইরা ফালানোর ফন্দী করছেন? লিপ্টন দাঁড়িয়ার ঔদ্ধত্য ভাব আর হামতাম দেখে প্রিন্সিপাল সাহেব থ খেয়ে গেলেন। স্মৃতিতে জমা হওয়া পুরনো নথি পত্র হাতড়ে একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেললেন। নায়কদের ভিলেন হওয়া ইতিহাসের গোড়াপত্তন কি আজ থেকেই শুরু হতে চলল?! এই যে সেই লিপ্টন না! যে মাঘের এক সকালে যবুথবু হয়ে মাদ্রাসার অফিসে এসে হাউমাউ করে কেঁদে কেটে বলেছিল, ‘হুজুর! বড্ড আশা নিয়া আইছি, গরীব মানুষ, এই শহরে মাথা গুঁজবার ঠাই নাই। পুলাডারে নিয়া বড় চিন্তায় আছি হুজুর! আল্লাররস্তে এডারে একটু মানুষ কইরা দেন। যেখানে নিই সেখান থেইকাই হারামজাদাট চুরি কইরা পলান দেয়। অমানুষটারে নিয়া আর পারতাছি না হুজুর!’

আরে এই যে তো সেই লিপ্টন! যে তার এই ছেলের যন্ত্রণায় অতিষ্ঠ হয়ে রেলের নিচে ফেলে দেওয়ার সংকল্প করেছিল! ও লিপ্টন ভাই! মাঘের সেই সকালের কথা মনে আছে? অতীত এত তাড়াতাড়ি বেমালুম ভুলে গেলেন? যে ‘ওয়াদুইত্যারে’ মারার জন্য দলবল নিয়ে এসেছেন সেই ওয়াদুদ সাহেবের তিন বছরের হাড়ভাঙা খাটুনির পর আজ আপনার ছেলে হাফেজ হওয়ার দ্বারপ্রান্তে! সেদিন আপনার এই দলবল ছিল কোথায়, এই তিন বছর কাউকেই তো দেখি নাই?!

লিপ্টন সাহেব! মনে কি পড়ে নাসিরের ভর্তি, থাকা-খাওয়া বাবদ আপনার কাছ থেকে আমরা এক পয়সাও গ্রহণ করেনি! বিনা পয়সায় নিরন্তর প্রচেষ্টায় গাছে ফল এনে দিলাম, আর আজ ফল পাড়ার সময় যখন হল তখন মালিক বাগানের মালি ধমক খায়! বড় আজিব এই দুনিয়া!

প্রথম যেদিন এই অফিসে আমার সামনে এসেছিলেন সেদিনের চিত্র কি মনে আছে? আপনার মুখের সে কথা কি বেমালুম ভুলে গেছেন যে, ‘হুজুর! পুলাডারে দিয়া গেলাম পড়ালেখার জন্য। যদি মাইরাও ফালান তাইলেও আমার কোন আপত্তি নাই। আমার স্বপ্ন, পুলাডারে হাফেজ বানানো, আমি হাফেজের বাবা হতে চাই।’

মাত্র তিন বছরের ব্যবধানে সব ভুলে গেলেন?! আপনার ছেলে অন্যায় করেছে তাই হুজুর শাসন করেছেন। তারপরও ছাদ থেকে বা রেলের নিচে ফেলে দিয়ে আসার মতো অমানুষিক কাজ করিনি। লিপ্টন দাঁড়িয়ার উঁচু মাথা নিচু হতে হতে হাঁটুর সাথে মিশে যাওয়ার দশা।

শোনেন ভাই! ইসলামে অমানুষিক শাসনের কোন সাপোর্ট করে না এ ধরনের শাসনের নজির ইসলামে নেই। শাসনের মাত্রা বেশি হওয়ায় আমরা ওয়াদুদ সাহেব হুজুরকে মাদ্রাসা থেকে সসম্মানে বিদায় করে দিয়েছি। উপরে যেয়ে আপনার নাসিরের খোঁজ নিন। এখন সে ভালোই আছে। আমার মনে হয় আপনি নাসিরকে যে পরিমাণ মেরেছেন ওয়াদুদ সাহেব তার দশ ভাগের এক ভাগও মারেনি, রক্তারক্তি কান্ড ঘটায়নি! কান্ড যা ঘটানোর তা আপনিই ঘটালেন!

যাকগে ওসব, মনে হয় আপনার নাসিরকে পড়ানোর মতো সক্ষমতা আমাদের আর নেই। আর মাত্র চার পারা মুখস্থ করলে সে হাফেজ হয়ে যাবে। যান! চেষ্টা করে দেখুন, মাসীরা নাসিরকে হাফেজ বানিয়ে দিতে পারে নাকি?

লেখক: শিক্ষক ও প্রাবন্ধিক

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *