বিজয় দিবস উদযাপিত: অপশক্তি রুখে দেয়ার শপথ
পাথেয় টোয়েন্টিফোর ডটকম : যাদের রক্তের বিনিময়ে আমরা পেয়েছিলাম বিজয়, বিশ্বের মানচিত্রে অভ্যুদয় ঘটেছিল বাংলাদেশের, বিজয়ের ৪৯তম বার্ষিকীতে সেই বীর সন্তানদের স্মরণ করছে জাতি। নানা কর্মসূচির মধ্য দিয়ে বুধবার মহান বিজয় দিবস উদযাপিত হয়েছে।
হৃদয় নিংড়ানো ভালোবাসায় মুক্তিযুদ্ধে ৩০ লাখ শহীদ আর দুই লাখ সম্ভ্রমহারানো মা-বোনের প্রতি জানানো হয়েছে পরম শ্রদ্ধা। কৃতজ্ঞচিত্তে জাতি স্মরণ করেছে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে, যার বলিষ্ঠ নেতৃত্বের মধ্য দিয়ে অর্জিত হয়েছে বাংলাদেশের স্বাধীনতা।
ঘন কুয়াশা আর ঠাণ্ডা বাতাস উপেক্ষা করে সাভারে জাতীয় স্মৃতিসৌধে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেছেন নানা বয়সী মানুষ। বৈশ্বিক মহামারী করোনাকালেও ফুল, পতাকা, বাহুবন্ধনী আর প্ল্যাকার্ড হাতে দেশের স্মৃতিসৌধগুলোয় এদিন ছুটেছেন আবালবৃদ্ধবনিতা।
ব্যক্ত করেছেন মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় লালিত বাংলাদেশে মৌলবাদসহ সব অপশক্তি রুখে দেয়ার প্রত্যয়। সব বৈষম্য দূর করে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে এক উন্নত বাংলাদেশ গড়ে তোলার শপথ নিয়েছেন তারা।
প্রায় দুই যুগের পাকিস্তানি শাসন এ দেশের জনজীবনকে পরিণত করেছিল নরকে। বাঙালির হাজার বছরের লালিত স্বাধীন দেশের স্বপ্ন এই শোষণের মধ্য দিয়েই তীব্র থেকে তীব্রতর হয়ে ওঠে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বলিষ্ঠ নেতৃত্বে।
পাকিস্তানি শোষণ-বঞ্চনার অবসান ঘটাতে ১৯৭১ সালে নয় মাস রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের ফলাফল ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের বিজয়। তাই প্রতিটি বাংলাদেশির কাছে বিজয় দিবস মানে অন্যরকম একদিন, অন্যরকম আনন্দ।
এই অনুভূতির সঙ্গে অন্য কোনো কিছুর তুলনা হয় না। করোনা মহামারীর সময়েও বিজয়ের এদিনে উৎসবমুখর ছিল সারা দেশ। পাড়া-মহল্লায় বেজেছে দেশাত্মবোধক গান ও বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণ। বিভিন্ন ভবনে তোলা হয় জাতীয় পতাকা।
ঝাড়বাতি আর রং-বেরঙের পতাকায় উজ্জ্বল হয়ে ওঠে ভবন, বাড়ি, সড়ক, সড়কদ্বীপ। শহীদদের আত্মার শান্তি, জাতির সমৃদ্ধি কামনা করে সব ধর্মের উপাসনালয়ে বিশেষ মোনাজাত ও প্রার্থনা অনুষ্ঠিত হয়।
হাসপাতাল, জেলখানা, বৃদ্ধাশ্রম, এতিমখানায় পরিবেশন করা হয় উন্নত মানের খাবার। নানা আয়োজনে ফুটিয়ে তোলা হয় বহু মানুষের আত্মত্যাগ।
তবে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকীতে স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীকে সামনে রেখে বাংলাদেশে এবারের বিজয়ের উৎসব আরও বড় পরিসরে উদ্যাপনের কথা থাকলেও তাতে বাদ সেধেছে করোনাভাইরাস মহামারী।
বুধবার ভোর সাড়ে ৬টায় জাতীয় প্যারেড স্কয়ারে ৩১ বার তোপধ্বনির মাধ্যমে শুরু হয় বিজয় দিবসের আনুষ্ঠানিকতা। একই সময়ে সাভারে জাতীয় স্মৃতিসৌধে শুরু হয় শ্রদ্ধা নিবেদনপর্ব।
জাতীয় স্মৃতিসৌধে পুষ্পস্তবক অর্পণ করে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের বীর শহীদদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করেছেন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
রাষ্ট্রপ্রধানের পক্ষ থেকে তার সামরিক সচিব এসএম শামিম-উজ-জামান ভোর ৬টা ৩৪ মিনিটের দিকে সূর্যোদয়ের সময় জাতীয় স্মৃতিসৌধের বেদিতে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন।
পরে রাষ্ট্রপতির প্রতিনিধি বীর শহীদদের স্মৃতির প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা জানাতে সেখানে কিছু সময়ের জন্য নীরবে দাঁড়িয়ে থাকেন।
এরপর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পক্ষ থেকে তার সামরিক সচিব মেজর জেনারেল নকিব আহমেদ চৌধুরী জাতীয় স্মৃতিসৌধের বেদিতে পুষ্পস্তবক অর্পণ করে দেশের মহান বীরদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান।
রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর শ্রদ্ধা নিবেদনের সময় বিউগলে বেজে ওঠে করুণ সুর। শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে গার্ড অব অনার প্রদান করে সশস্ত্র বাহিনীর একটি চৌকস দল।
রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর পক্ষে শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে জাতীয় সংসদের স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরীর পক্ষেও শহীদ বেদিতে ফুল দেয়া হয়।
মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হকের নেতৃত্বে মন্ত্রিসভার পক্ষ থেকে স্মৃতিসৌধে শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয়। সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী কেএম খালিদ, দুর্যোগ ও ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী এনামুর রহমানও এ সময় তার সঙ্গে ছিলেন।
শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয় বীরশ্রেষ্ঠদের পরিবার, যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা, প্রধান বিচারপতি ও তিন বাহিনীর পক্ষ থেকে। ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের পক্ষ থেকে শ্রদ্ধা জানান মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপস।
বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের শ্রদ্ধার ফুলে ফুলে ভরে ওঠে শহীদ বেদি।


