মুহাম্মাদ আইয়ুব : চীর শান্তি, মহানুভবতা, কল্যাণকামিতা ও মানবতার ধর্ম ইসলাম। মহানবীর মহান শিক্ষা, চিরন্তন বাণী সুমহান চরিত্র সমুজ্জ্বল আদর্শে শান্তি ও মানবতার দিকটাই বারবার, শতবার, হাজার বার প্রস্ফুটিত হয়েছে। ইসলাম মক্কার গন্ডি পেরিয়ে পৌঁছে গেছে সুদূর আফ্রিকা, এশিয়ায় অথচ আজ চিত্র উল্টো। আজ সেই শান্তি ও মানবতার ললাটে ধর্মের নামে হিংস্র, নৃশংস, বর্বর, উগ্রবাদী, জঙ্গিবাদীরা এঁটে দিচ্ছে কালো পর্দা।
গত পরশু পুলিশের আইজিপি মহোদয় গত পরশু (১৫ মার্চ) এক অনুষ্ঠানে আংশিক চমৎকার কথা বলেছেন, ‘জঙ্গিদের হাতেই সবচেয়ে বেশি মুসলমানরা নিগৃহীত হয়েছে, সবচেয়ে বেশি মুসলমানদের রক্ত ঝরেছে, সবচেয়ে বেশি খুন হয়েছে।’ আর আমার মতে জঙ্গিদের হাতেই ইসলামের সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে । আজ এই সন্ত্রাসী জঙ্গিদের কারণেই বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ইসলামের কৃষ্টি কালচার, পোশাকাশাকের উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হচ্ছে। যার সর্বশেষ জ্বলন্ত প্রমাণ সুইজারল্যান্ড ও শ্রীলঙ্কা।
গত ৭ই মার্চ সুইজারল্যান্ডে এক গণভোটে মুসলিম নারীদের বোরখা বা নিকাবসহ প্রকাশ্যস্থানে মুখ-ঢাকা পোশাকের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের পক্ষে ভোট পড়েছে।
গণভোটের সরকারি ফলাফলে দেখা যায়, সামান্য ব্যবধানে এই নিষেধাজ্ঞা অনুমোদিত হয়। নিষেধাজ্ঞার পক্ষে ৫১.২% এবং বিপক্ষে ৪৮.৮% ভোট পড়েছে। দক্ষিণপন্থী সুইস পিপলস পার্টি এই গণভোটের প্রস্তাব করেছিল এবং তাদের প্রচারাভিযানে নিকাব-পরা মুসলিম নারীর ছবি দিয়ে ‘উগ্র ইসলাম প্রতিহত করার’ শ্লোগান দেয়া হয়েছিল।
অন্যদিকে শ্রীলঙ্কা সরকার গত ১৩ ই মার্চ জাতীয় নিরাপত্তার যুক্তি দেখিয়ে জনসমক্ষে বোরখা ও নিকাবসহ সবধরনের মুখ ঢাকা পোশাক পরা নিষিদ্ধ করার গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিয়েছে।
দেশটির জন নিরাপত্তা মন্ত্রী সারাত উইরাসেকারা বলেছেন, বোরখা নিষিদ্ধ করার এক নির্দেশে তিনি সই করেছেন। সেটি কার্যকর করতে পার্লামেন্টের অনুমোদন লাগবে।
মন্ত্রী বলেন, খুব দ্রুত এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন হবে বলে তিনি আশা করছেন।
মি. উইরাসেকারা বলেন যে, বোরখা ‘দেশটিতে সাম্প্রতিক কালে মাথা চাড়া দেয়া ধর্মীয় উগ্রবাদের একটা লক্ষণ’। তিনি আরও বলেন যে এটা ‘জাতীয় নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকি’ তৈরি করছে এবং স্থায়ী ভাবে এই নিষেধাজ্ঞা জারি করা জরুরি হয়ে পড়েছে। তিনি বলেন এটা আরও আগে স্থায়ী ভাবে বলবৎ করা দরকার ছিল। আসতাগফিরুল্লাহ।
এবার আসি পর্যালোচনায়। সুইজারল্যান্ড বোরখা নিষিদ্ধের কারণ দর্শিয়েছে ‘উগ্র ইসলাম প্রতিহত করা’র ধুয়ো তুলে। আর শ্রীলঙ্কা বলছে ‘বোরখা দেশটিতে সাম্প্রতিক কালে মাথা চাড়া দেয়া ধর্মীয় উগ্রবাদের একটা লক্ষণ’ এবং এটা ‘জাতীয় নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকি’। নাউজুবিল্লাহ।
যেখানে নিরাপত্তার ঝুঁকিতে থাকার জন্য মহিলাদের বোরখার বিধান সেখানে নাকি বোরখা ই হয়ে দাঁড়িয়েছে। নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকি, কিন্তু কেন আজ অভিধান পাল্টে গেল! কারণ এই বোরখাকে কলুষিত করেই জঙ্গিরা নিরীহ জনপদে নিরাপরাধ, সাধারণ জনতার উপর ধ্বংসাত্মক ও নৃশংস হামলা চালায়। গতপ্রায় দু বছর আগে খ্রিস্টানদের ইস্টার সানডে পরবের দিন শ্রীলঙ্কায় হোটেল ও কয়েকটি গির্জার ওপর সমন্বিত কয়েকটি হামলা হয়।
ওই হামলায় আত্মঘাতী বোমাহামলাকারীরা ক্যাথলিকদের গির্জা ও পর্যটকদের হোটেল টার্গেট করে হামলা চালায়। ২০১৯ সালে এপ্রিল মাসের ওই হামলায় প্রাণ হারায় আড়াইশ’র বেশি মানুষ। ইসলামিক স্টেট জঙ্গী গোষ্ঠী এই হামলার দায় স্বীকার করে। যে ধর্মে অযথা একটা গাছের পাতা পর্যন্ত ছেঁড়া মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিষেধ করেছেন সেই সে ধর্মের নাম নিয়ে, সেই ধর্মের নিরাপত্তায় মোড়ানো পোশাক নিয়ে আত্মঘাতী হামলা যারা চালায় তারা কি মদীনার ইসলাম প্রচারে ব্রতী হয়ে হামলা করে নাকি পেন্টাগনের ইশারা ও মদদে তা দূরদর্শী ইসলামী চিন্তাবিদদের মাথায় ধরলেও ধরে না আমার দেশের মাথামোটা তথাকথিত বিশিষ্ট ইসলামী চিন্তাবিদ অথর্বদের মাথায়। এরা মাহফিলে মাহফিলে যেয়ে গলা ফাটিয়ে জঙ্গিবাদের সমর্থন আদায়ে হৈচৈ করবে, ফেসবুকে স্ট্যাটাস প্রসব করবে আর বিরাট বিরাট ব্যানার, মিছিল, মাইক দূতাবাস ঘেরাওয়ের কর্মসূচি দিবে মুক্তাঙ্গন, পল্টন, বায়তুল মুকাররম চষে বেড়াবে আর পরদিন অফারে আইসক্রিম খেতে লা মেরিডিয়ানে ঘন্টার পর ঘন্টা লাইনে দাঁড়িয়ে ইশকে নবীর হৈচৈকে জলাঞ্জলি দিবে!
আরও পড়ুন: আমরা আজও এক দেহ | মুহাম্মাদ আইয়ুব
সুইজারল্যান্ড আর শ্রীলঙ্কার মত ধীরে ধীরে একদিন খৃষ্ট, বৌদ্ধ ও হিন্দু শাসিত দেশের পর মুসলিমদের দেশ থেকেও বোরখা নাই হয়ে যাবে জঙ্গিদের কারণে তারপরও নাবালকরা ‘জঙ্গি জঙ্গি জিন্দাবাদ’ বলে গলা ফাটাবে কারণ গলা ফাটাতে পয়সা লাগে না। অবাক লাগে আজকে দাড়ি ইস্যুতে ‘বয়কট আড়ং’ শুরু হয়ে গেছে কিন্তু যারা বয়কটের ডাক দিয়েছে খোঁজ নিলে দেখা যাবে তাদের সবারই প্রায় বিকাশ এক্যাউন্ট আছে মরে গেলেও এক্যাউন্ট ব্লক করবে না অথচ বিকাশ আর আড়ং তো এক ব্র্যাকের!
এখানে বোধহয় কিছুটা স্বার্থ আছে, দাড়ি প্রেম আর নবী প্রেম না হয় ফেসবুকের এক স্ট্যাটাসে আদায় হয়ে যাবে। তাই বলে বছরের পর বছর ধরে চলা মশহুর এক্যাউন্টটাকে কি অত তাড়াতাড়ি ব্লক করা যায়?! (
জঙ্গিবাদের সাথে ইসলামের দূরতম সম্পর্কও নেই : জঙ্গিদের নৃশংসতা আর ইসলামকে হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহার করার প্রবণতার পথ চিরতরে বন্ধ করার জন্য মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মক্কা বিজয়ের দিন চমৎকার বলেছিলেন, ‘আল ইয়াউমু ইয়াউমুল মারহামাহ’।
ঘটনা হলো, মক্কা বিজয়ের দিন আউস গোত্রপতি হযরত সাদ বিন উবাদা (রাঃ) আবু সুফিয়ানকে লক্ষ করে বললেন- ‘আল ইয়াউমু ইয়াউমুল মালহামাহ’ তথা আজ রক্তপাতের দিন। এ সংবাদ হুজুর (সাঃ) এর কানে পৌঁছতেই তিনি হযরতের সাদের কাছ থেকে ঝান্ডা নিয়ে তাঁর ছেলেকে দিয়ে দিলেন আর বললেন ‘আল ইয়াউমু ইয়াউমুল মারহামাহ’। আজ তো ক্ষমার দিন, ভালবাসার দিন, রহমের দিন। (বুখারী শরীফ,কিতাবুল মাগাজী, হাদিস নং- ৪০৩০)
কি সুন্দর ইসলাম! কত সুন্দর মহানবীর শিক্ষা!! হলফ করে বলতে পারি মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এ শিক্ষা যদি আজকের জঙ্গিরা বাস্তবায়ন করত তাহলে আত্মঘাতী হামলা,পথে ঘাটে চোরাগোপ্তার হীন দর্শনের পথে হাঁটতে হত না। আল্লাহ পাক হযরত আবূ সুফইয়ান রা. এর উপর রহম করুন যে, এ যুগের দস্যু সদৃশ জঙ্গিরা সেসময় ছিলনা নইলে বেঘোরে কল্লাটা দিয়ে আসতে হত।
জঙ্গিবাদ ভালো কিছু নয় : জঙ্গিবাদ যদি এই সমাজে, পৃথিবীতে শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে পারত তাহলে আইএস বধূ শামীমা জঙ্গিদের একসময়কার স্বর্গভূমি সিরিয়া ছেড়ে ব্রিটেনে পাড়ি জমানোর প্রানন্তকর প্রচেষ্টা চালাত না। মিডিয়ার কল্যাণে গতকাল ( ১৬ মার্চ) জঙ্গিবধূ শামীমাকে বোরকা ছেড়ে পশ্চিমা পোশাকে দেখা গেছে। ফ্যাশনেবল সানগ্লাস, চুলের ভিন্ন স্টাইল আর পশ্চিমা পোশাকে তাকে যেন চেনাই যাচ্ছিল না।ব্রিটেনে ফিরে যাওয়ার জন্যে আগের অবস্থানে ফিরিয়ে নেয়ার চেষ্টা করে যাচ্ছেন চেষ্টা করছেন শামীমা।
কেন? জঙ্গিরা তাকে শান্তির জীবন দিতে পারেনি? নিশ্চয়ই নিশ্চয়ই না না না। যদি দিতে পারত তাহলে হযরত সুমাইয়া রা. এর মত মৃত্যু মঞ্চেও গেয়ে উঠত জীবনের জয়গান। জঙ্গিরা শামীমাকে মদীনার জীবন দিতে পারেনি বিধায় বৃটেনের জীবন ফিরে পেতে সে বোরকা ছেড়ে পশ্চিমা জীবনের পায়ে মাথা ঠুকছেন। আত্মসমালোচনার জন্য আজ আমাদের মন্ত্র দরকার। তাই আসুন সমস্বরে বলে উঠি- ‘কি হবে বেঁচে থেকে/অযথা বিদ্যা শিখে। যদি না গড়তে পারি/জঙ্গিবিহীন সমাজটাকে।’
লেখক : শিক্ষক ও প্রাবন্ধিক


