কোন দিকে যাচ্ছে কওমীর সন্তানরা?

কোন দিকে যাচ্ছে কওমীর সন্তানরা?

আমিনুল ইসলাম যশোরী : কতিপয় মানহাজী-চরমপন্থী লোকের নগ্ন থাবায় দিশেহারা আজ কওমী মাদ্রাসাগুলো। ওরা কওমীর দুধ খেয়ে বড় হয়েছে। সেই আলিফ, বা, তা, ছা, থেকে তারা কওমীতে। এখন কিন্তু হৃষ্ট-পুষ্ট। কিন্তু কিভাবে যে তারা এখন এমন হয়ে উঠল কিছুই বুঝে আসে না। ঐ কওমীতে পড়ে মোটাতাজা হয়ে এখন কওমী মাদ্রাসা তথা আকাবিরে দেওবন্দ এর প্রতি তারা বিদ্বেষ পোষণ করে। এখন নিজের উস্তাদ এবং মুরুব্বীদের গোমরাহ মনে করে। যেটা অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়।

বড় দুঃখের সাথে লিখতে হচ্ছে, কওমীর অবুঝ সন্তানেরা এখন কোন দিকে যাচ্ছে? তাদের যাত্রা এখন কোন দিকে? তাদের আদব-লেহাজ কোথায় গেল? তারা তো আগে এরকম ছিল না। কিন্তু হালজামানায় এরকম অবস্থা কেন? কওমী মাদ্রাসার ছাত্র বলতে সবাই বোঝে তারা অত্যন্ত আদবী-আখলাকী। তারা কোন বেয়াদব নয়। কিন্তু এখন কি আর বলা যাচ্ছে? কওমীর উস্তাদগণ আগে নিজের সন্তানদের নিয়ে গর্ব করতেন, এখন কি আর গর্ব করার কোন জায়গা আছে? বরং এখন এমন হালাত তৈরী হচ্ছে, এখন যদি ওলামা-মাশায়েখগণ নজর না রাখেন, তাহলে অচিরেই আমাদের সন্তানেরা বিপদগামী হবে তাতে কোন সন্দেহ নেই।

অদুর ভবিষ্যতে স্পষ্ট চিন্তা-চেতনা তথা আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাতের দৃষ্টি ভঙ্গি লালনকারী কোন আলেম খুঁজে পাওয়া যাবে বলে মনে হয় না। আকাবির- আছলাফের বাতলানো পথে চলার মত কোন আলেম আর তালাশ করে পাওয়া যাবে বলে মনে হচ্ছে না। কেননা, যেভাবে নগ্ন থাবা শুরু হয়েছে কওমীর সন্তানদের উপর, তাতে লেবাসে দেওবন্দী থাকতে পারে, তবে তাদের চিন্তা–চেতনায় আর দেওবন্দীয়্যাত এবং আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামাতের ধারক-বাহক পাওয়া যাবে না।

অত্যন্ত সুক্ষ ভাবে ঢুকিয়ে দেওয়া হচ্ছে আমাদের সন্তানদের জেহেনে। কিশোর এবং কম বয়সী ছাত্রদের জেহেন থাকে স্বচ্ছ। সেই স্বচ্ছ জেহেনে ঢুকিয়ে দিচ্ছে ওরা। অনেক কৌশলে অবুঝ তালেবুল ইলমদের অন্তরে সেটা বসায়ে দেওয়া হচ্ছে। অথচ বেশী দিন আগের কথা নয়, দু এক বছর আগে নিজের উস্তাদ এবং আকাবিরে দেওবন্দ এর প্রতি সুধারণা ছিল, কিন্তু ঐ লোবাসধারীদের সংস্পর্শে গিয়ে এখন আর নিজের উস্তাদদের ভাল চোখে দেখতে পারে না। বরং নিজের উস্তাদ এবং মুরুব্বীদের প্রতি তাদের কুধারণা সৃষ্টি করে দেওয়া হয়েছে।

আমাদের আকাবির –আছলাফগণ এবং তাদের অনুসারী যারা আছেন, এরা নাকি কিছুই বোঝে না।

আকাবির-আছলাফ এবং তার অনুসারীদের গোমরাহ মনে করে এখন। এখন উস্তাদের কথায় কাউন্টার দেওয়া শিখেছে তারা। বরং অত্যন্ত জঘন্য কায়দায় এখন নিজের উস্তাদ-মুরুব্বীদের হেয় করে। আরো বড় অবাক হই, কোন আলেমই যেন তাদের পছন্দের নয়। সকলের বেলায় ইশকাল আর ইশকাল। পাকিস্তানের আল্লামা তকী উসমানী সহ বাংলাদেশের মুফতী আব্দুল মালেক , দেওবন্দ এর মাহমুদ মাদানী, বাংলাদেশের মাওলানা ফরীদ উদ্দীন মাসঊদ, মুফতী ফয়জুল করীম (পীর সাহেব চরমোনাই) কাউকে তারা মানতে চায় না। এসব ব্যক্তিগণ তাদের কাছে বড় অপছন্দের। এমন কৌশলে ছাত্রদের কাবু করা হচ্ছে, তারা এখন আর কিছুই বোঝে না।

ওই সব মানহাজী –চরমপন্থী শায়েখগণ নাকি সব জ্যান্তা! তারা নিজেদেরকে সব জ্যান্তা মনে করে। আর আমাদের আকাবির –আছলাফগণ এবং তাদের অনুসারী যারা আছেন, এরা নাকি কিছুই বোঝে না। এরা নাকি বাতিলের ধ্বজাধারী। বিশ্ববরেণ্য আলেম যেখানে তকী উসমানী, বাংলাদেশের সকল আলেম মুফতী আব্দুল মালেক সাহেবকে সমীহ করে। আর ফরীদ উদ্দীন মাসঊদ সাহেব তো অনেক মেধাবী আলেম এবং ইসলামী
স্কলার, এমনিভাবে ফয়জুল করীম সাহেব একজন জনপ্রিয় আলেম এবং পীর, কিন্তু চরমপন্থী মানহাজী ভায়েরা এঁদের যেন গুনতেই চায় না। এদের নজরে, মুফতি হারুন এজহার, মাওলানা যুবায়ের, সফী উল্লাহ ফুআদ, আলী হাসান উসামা ও মাহমুদ হাসান গুনাহভী আলেম আর বাকী সবাই জালেম! (নাউযুবিল্লাহ)

মানে কওমীর ঘরে বসে এরা ইঁদুরের মত শিকড় কাটছে। শিক্ষা ব্যবস্থা এবং চিন্তা-ধারার মাঝে ফাটল সৃষ্টি করার অপকৌশল তাদের। ওদের টার্গেট কওমী অঙ্গনের মেধাবী মুখগুলো। যেখানে ওরা যাবে, সেখানকার মেধাবী ছাত্রদের টার্গেট করে জেহেন ধোলাই করা হয়। স্লো-পয়জন দিয়ে ছাত্রদের কাবু করা হয়। বর্তমানের শিক্ষা ব্যবস্থা, রাজনৈতিক ব্যবস্থার উপর আপত্তি আরোপ করে ছাত্রদের ভুলিয়ে-ভালিয়ে ভিন্ন দিকে নেওয়া হয়। তারা তো এসব আকাবিরদের উপর কালিমা লেপন করে তারা নতুন কোন জাগরণ তৈরী করার চিন্তা চেতনায় গড়ে তোলার জন্য ফন্দি-ফিকির আঁটা হয়। আর এভাবে বহু কওমী মাদ্রাসায় এসব রোগে জর্জরিত।

মাদ্রাসার মোহতামিমগণ বড্ড বিপাকে আছেন। গিলতেও পারছেন না আবার ফেলতেও পারছেন না। অনলাইনে বিশাল এক বাহিনী তাদের। নামে-বেনামে বহু আইডি খুলে বসে আছে। মানুষ যদি ওরা একজন হয়, কিন্তু আইডি ওদের এক গাদা। কেউ যদি তাদের মতের খেলাফ কথা বলে, বা তদের মতের বিরুদ্ধে লেখে, তাহলে ওদের তৈরী করা শত শত লোক এক সাথে ঝাপিয়ে পড়ে। যিনি তাদের মতের বিরুদ্ধে পোষ্ট করেছেন, তাকে নাস্তানাবুদ করে ছাড়ে। মানে পরিকল্পিত বাহিনী তারা গড়ে তুলেছে।

কিছু মানহাজী শায়েখ আছেন, তিনি বিভিন্ন সময়ে দেশের বিভিন্ন জায়গাতে অবস্থান করেন। একেক ডিষ্টিকে একেক সময়। আর এক জায়গাতে বেশী দিন তারা অবস্থান করেন না। এটাও তাদের এক কৌশল। একেক জায়গাতে গিয়ে তাদের লোক তৈরী করা। ভবিষ্যতের দিকে লক্ষ্য করে।

মানহাজী শায়েখদেরকে কোন ভাবে লাইনে না আনতে পারলে, অদুর ভবিষ্যতে আর কিন্তু সহী আকিদা বিস্বাসের কোন আলেম খুঁজে পাওয়াটা দুস্কর হবে।

মোটকথা চেতনার বাতিঘর দারুল উলুম দেওবন্দ এবং সেখানকার বুর্জুগদের ব্যাপারে তারা নবীন আলেম এবং তালেবুল ইলমদের ভিন্ন মতবাদের দিকে ধাবিত করছে। এবং আকাবিরদের প্রতি অনাস্থা তৈরী করে কওমী মাদ্রাসাগুলোকে ধ্বংসের দ্বার প্রান্তে তারা নিতে চায়। অথচ এদেশে বহু ফেরাকে বাতেলা রয়েছে, তাদের ব্যাপারে যেন তারা মুখে কুলুপ এঁটে রাখে। তারা বেদআতের বিরুদ্ধে কথা বলে না, তারা কাদিয়ানীদের বিরুদ্ধে কথা বলে না, তারা মওদুদীবাদের বিরুদ্ধে কথা বলে না। ওরা হক্কানী আলেম এবং হক্কানী খানকার বিরুদ্ধে তারা ওঠে পড়ে লেগেছে। ওরা বয়ান বক্তৃতায় শুধু দেওবন্দী আলেম এবং পীর মাশায়েখ যেন তাদের টার্গেট।

এজন্য মুরুব্বী আলেম-উলামাদের অচিরেই কোন সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত। ওসব মানহাজী শায়েখদেরকে কোন ভাবে লাইনে না আনতে পারলে, অদুর ভবিষ্যতে আর কিন্তু সহী আকিদা বিস্বাসের কোন আলেম খুঁজে পাওয়াটা দুস্কর হবে। ওরা কিন্তু ঘাপটি মেরে বসে আছে আমাদেরই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে। ওদের বাগে আনতে না পারলে জাতিকে চরম মু্ল্য দিতে হবে। তাই সাবধানতা জরুরী। আল্লাহ তায়ালা সকলকে সহী বুঝ দান করুন। আমিন।

লেখক: কওমী মাদ্রাসা শিক্ষক ও কলামিষ্ট

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *