নিজস্ব প্রতিবেদক : নির্বাচনের জন্য বিএনপি তৈরি হচ্ছিল, সেটা বাধাগ্রস্ত করতেই খালেদা জিয়াকে সরকার মিথ্যা মামলায় সাজা দেয়ার ষড়যন্ত্র করছে- কূটনীতিকদের এমনটাই অবহিত করেছে দলটি। মঙ্গলবার বিকালে ঢাকায় নিযুক্ত বিভিন্ন দেশের কূটনীতিকদের সঙ্গে জরুরি বৈঠকে খালেদা জিয়ার মামলাসহ আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন, দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি, মানবাধিকার পরিস্থিতি, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডসহ সার্বিক বিষয়ে কূটনীতিকদের অবহিত করেন দলের জ্যেষ্ঠ নেতারা। নেতাকর্মীদের নামে মামলার পরিসংখ্যানও তাদের হাতে তুলে দেয়া হয়।
গুলশানে চেয়ারপারসনের রাজনৈতিক কার্যালয়ে এক ঘণ্টার বৈঠকে জাপান, নেদারল্যান্ডস ও নেপালের রাষ্ট্রদূত ছাড়া ব্রিটেনের ডেপুটি হাইকমিশনারসহ জার্মানি, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, স্পেন, ডেনমার্ক, সুইজারল্যান্ড, মরক্কো, ভারত, পাকিস্তান, সৌদি আরব, থাইল্যান্ড, ফ্রান্স, তুরস্ক, কুয়েত, ভ্যাটিকেন সিটি, ভিয়েতনামসহ ৩০টিরও বেশি দেশের কূটনীতিক ও দাতা সংস্থার প্রতিনিধিরা অংশ নেন।
সূত্র জানায়, বৈঠকে উপস্থিত একাধিক কূটনীতিক আগামী নির্বাচন নিয়ে বিএনপির অবস্থান জানতে চান। এ সময় বিএনপির পক্ষ থেকে স্পস্ট জানানো হয়, তারা নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। কিন্তু সরকার আবারও একতরফা নির্বাচনের ষড়যন্ত্র করছে। মিথ্যা মামলায় দলের চেয়ারপারসনসহ সিনিয়র নেতাদের হয়রানি করা হচ্ছে।
বিএনপির মহাসচিব ছাড়া বৈঠকে দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ, ড. আবদুল মঈন খান, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, ভাইস চেয়ারম্যান ইনাম আহমেদ চৌধুরী, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা রিয়াজ রহমান, সাবিহ উদ্দিন আহমেদ, সুপ্রিমকোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট জয়নাল আবেদীন, সাবেক অ্যাটর্নি জেনারেল এজে মোহাম্মদ আলী, বিশেষ সম্পাদক ড. আসাদুজ্জামান রিপনসহ আন্তর্জাতিকবিষয়ক সম্পাদক অ্যাডভোকেট ফাহিমা নাসরীন মুন্নি ও ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।
পরে বিএনপি মহাসচিব সাংবাদিকদের বলেন, দেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিসহ সার্বিক বিষয় নিয়ে কূটনীতিকদের সঙ্গে তারা মতবিনিময় করেছেন। বিএনপির রুটিন মতবিনিময়েরই অংশ এটি। এটা বিএনপি প্রায়ই করে থাকে। খালেদা জিয়ার মামলার রায় সম্পর্কে আলোচনা হয়েছে কিনা জানতে চাইলে বিষয়টি এড়িয়ে যান তিনি।
বৈঠকে অংশ নেয়া একাধিক নেতা জানান, রাজনৈতিক ও মানবাধিকার পরিস্থিতি, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে কূটনীতিকদের অবহিত করা হয়। তবে চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মামলার বিষয়টি বেশি গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। সরকার প্রতিহিংসামূলকভাবে খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে মামলা সাজিয়ে বিচার কাজ চালাচ্ছে, বিশেষ করে জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলায় খালেদা জিয়াকে সম্পৃক্ত করার কোনো তথ্য-প্রমাণ না থাকার বিষয়টি কূটনীতিকদের কাছে বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হয়। একই সঙ্গে নির্বাচনকে সামনে রেখে তড়িঘড়ি করে এ মামলার রায়ের তারিখ ঠিক করার বিষয়টিও তুলে ধরা হয়েছে তাদের কাছে। এ ব্যাপারে কিছু ডকুমেন্ট তাদের দেয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। এছাড়া জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে করা, বর্তমান সংসদ ভেঙে দিয়ে নির্বাচন করা, সবার জন্য লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরি করা, নির্বাচন সামনে রেখে বিএনপি কর্মীদের বিরুদ্ধে মামলা-হামলা বেড়ে যাওয়ার বিষয়গুলোও কূটনীতিকদের সামনে তুলে ধরেন জ্যেষ্ঠ নেতারা। বৈঠক সূত্রে জানা গেছে, ডেনমার্ক, ফ্রান্সসহ কয়েকটি দেশের কূটনীতিকরা চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মামলাসহ একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে বিএনপির অবস্থান জানতে চান। এ সময় মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ, আবদুল মঈন খান ও আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী দলের অবস্থান তুলে ধরেন। চেয়ারপারসনের বিরুদ্ধে কেন মামলা করা হয়েছে এ ব্যাপারেও কূটনীতিকরা জানতে চান।
জবাবে বিএনপি নেতারা জানান, ওয়ান-ইলেভেনের সরকার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিরুদ্ধেও দুর্নীতির মামলা করেছিল। কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর সেই মামলাগুলো প্রত্যাহার করে নেয়া হয়েছে। অথচ ওয়ান-ইলেভেনের সরকারের দেয়া মামলাসহ বিএনপির চেয়ারপারসনের বিরুদ্ধে আরও ২৪টি মামলা দেয়া হয়েছে। সব মামলাই মিথ্যা ও রাজনৈতিক প্রতিহিংসামূলক। বলা হয়েছে, বিএনপির নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে ২০০৭ থেকে ২২ জানুয়ারি, ২০১৮ সাল পর্যন্ত সারা দেশে ৫০ হাজার ৭৪টি মামলা হয়েছে। এসব মামলায় ১১ লাখ ৯১ হাজার ৪৪৯ জনকে আসামি করা হয়েছে। এছাড়া ৩ হাজার ৯৪৭ জন নেতাকর্মী এখন কারাগারে আছেন। এ সময় কয়েকজন কূটনীতিক খালেদা জিয়ার আদালতের প্রতি শ্রদ্ধা এবং সেখানে গিয়ে তার বক্তব্য তুলে ধরার প্রশংসা করেন।


