পাথেয় টোয়েন্টিফোর ডটকম : পারিবারিক কলহের জেরে গত তিন মাসে ৬৬ জন নারী ও ৩১ শিশু খুন হয়েছে। এর মধ্যে ৪৮ জন নারী স্বামীর হাতে খুন হয়েছেন বলে অভিযোগ এসেছে। হয়েছে মামলাও। নিহতদের ১৪ জনের বয়স ২৫ থেকে ৩০ বছরের মধ্যে।
এই সময়ে ২৪ জন নারী আত্মহত্যাও করেছেন।
বেসরকারি সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) গত রবিবার প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে এই তথ্য পাওয়া গেছে। সংস্থাটি জানিয়েছে, গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবর ও নিজস্ব অনুসন্ধানের ভিত্তিতে তারা এই তথ্য পেয়েছে।
দেশে সার্বিক অপরাধপ্রবণতার কোনো একক চিত্র পাওয়া যায় না। নেই কোনো সমন্বিত জরিপও। এর পরও সাম্প্রতিক বেশ কিছু ঘটনা, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর তথ্য এবং বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি সংস্থার প্রকাশিত তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে বিশেষজ্ঞরা বলেন, পারিবারিক সহিংসতা বৃদ্ধির পেছনে পারিবারিক বন্ধন শিথিল হওয়া, যৌতুক, মাদক, বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক, প্রযুক্তির অপব্যবহার, ব্যক্তিগত স্বার্থ, সুস্থ বিনোদনের অভাব, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং সামাজিক অবক্ষয়ের প্রভাব কাজ করছে। পরিবারে শারীরিক-মানসিক নির্যাতনের পাশাপাশি হত্যাকাণ্ডের মতো ঘটনা উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সর্বশেষ রবিবার রাতে নরসিংদীর রায়পুরায় বৈদ্যুতিক মিটার নিয়ে দ্বন্দ্বের জেরে বড় দুই ভাইয়ের হাতে ছোট ভাই শফিকুল ইসলাম (২৬) খুন হয়েছেন। একই দিন পারিবারিক কলহের জেরে বাগেরহাটের মোরেলগঞ্জে ছেলের লাঠির আঘাতে বাবা চান্দে আলীর (৭০) মৃত্যু হয়েছে। এর আগে ২৬ মার্চ চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে যৌতুকের টাকার জন্য স্ত্রী আমেনা বেগমকে দুই বছরের শিশুসন্তানের সামনে গলা টিপে হত্যার অভিযোগ উঠেছে স্বামী মো. রাসেলের বিরুদ্ধে।
আসকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত তিন মাসে নিহত নারীদের মধ্যে ১০ জন নিহত হয়েছেন স্বামীর পরিবারের সদস্যদের হাতে। এসব ঘটনায় মামলা হয়েছে চারটি। বাকি আট নারী নিজ পরিবারের সদস্যদের হাতে খুন হয়েছেন। এসব ঘটনায় মামলা হয়েছে দুটি। এই সময়ে ১১ জন নারী স্বামীর হাতে এবং দুজন স্বামীর পরিবারের অন্য সদস্যদের হাতে নির্যাতিত হয়েছেন।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত তিন মাসে পারিবারিকভাবে নির্যাতিত হয়ে ৩১ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। শিক্ষিত, অশিক্ষিত, ধনী, দরিদ্র নির্বিশেষে সমাজের সব স্তরে পারিবারিক সহিংসতা লক্ষ করা গেছে। তথ্য বিশ্লেষণে আরো দেখা গেছে, এসব সহিংসতার বেশির ভাগ শিকার হচ্ছে নারী ও শিশুরা।
পারিবারিক সহিংসতায় পুরুষরাও খুন হচ্ছেন। গত ২ এপ্রিল স্ত্রীর সঙ্গে সম্পর্কের অভিযোগে রংপুরের কাউনিয়ায় স্বামী রফিকুল ইসলামের হাতে তাঁর চাচাতো ভাই সাইদুল ইসলাম খুন হন। ৩ এপ্রিল কুড়িগ্রামের রাজারহাট উপজেলায় পারিবারিক কলহের জেরে ছেলের ছুরিকাঘাতে বাবা পয়ার উদ্দিন মারা যান। মা জুলেখা খাতুন আহত হয়ে হাসপাতালে মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছেন।
সাভারের বনগাঁও ইউনিয়নে পারিবারিক কলহের জেরে স্ত্রী ভাড়াটে সন্ত্রাসী দিয়ে স্বামী আনোয়ারকে হত্যা করিয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। গত ১৭ ফেব্রুয়ারি এই ঘটনা ঘটে। গত ১০ মার্চ ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কের কারণে মিষ্টির সঙ্গে বিষ মিশিয়ে ইয়াসিন (৭) ও মুরছালিন (৫) নামের দুই শিশুসন্তানকে হত্যার অভিযোগ উঠেছে মায়ের বিরুদ্ধে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধবিজ্ঞান বিভাগের সভাপতি খন্দকার ফারজানা রহমান বলেন, ‘আমাদের দেশে বেশির ভাগ পরিবারে ব্যক্তির মানসিক সমস্যাগুলো সেভাবে চিহ্নিত করা হয় না। এ কারণে তাঁরা মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের কাছেও যান না। ফলে মানসিক সমস্যা ও সমাজের বিভিন্ন বিশৃঙ্খল পরিবেশ পারিবারিক অপরাধ বৃদ্ধিতে সহায়তা করছে। ’
পারিবারিক সহিংসতা বৃদ্ধির প্রবণতা
মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশনের গত মার্চের তথ্য মতে, নারী ও শিশুদের প্রতি সহিংসতা, ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনা আগের তুলনায় বাড়ছে। গত মার্চে সারা দেশে ৩৯৭টি নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে। ফেব্রুয়ারিতে এই সংখ্যা ছিল ৩৫৬।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর জেনোসাইড স্টাডিজের তথ্য মতে, চলতি বছর জানুয়ারির চেয়ে ফেব্রুয়ারিতে পারিবারিক সহিংসতা বেড়েছে ৩৩ শতাংশ। এর আগে ২০২০ সালে ৫৩ জেলার ৬৫ হাজার মানুষের ওপর জরিপ চালায় ‘মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন’। সংস্থাটি নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতা পর্যবেক্ষণ, প্রতিরোধ ও প্রতিকারে সাড়ে পাঁচ মাস ধরে জরিপ চালায়। এতে দেখা যায়, ৪৮ হাজার ২৩৩ জন নারী ও শিশু পারিবারিক ও অন্যান্য সহিংসতার শিকার হয়েছে। এর মধ্যে ৯৮.৫ শতাংশ নারী এবং ৬৭ শতাংশ শিশু।
ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) ৫০টি থানায় ২০২০ সালে নারী ও শিশু নির্যাতনের অভিযোগে দুই হাজার ১৯৮টি মামলা হয়েছে। ২০২১ সালে হয়েছিল দুই হাজার ২১৮টি মামলা।
বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সাধারণ সম্পাদক মালেকা বানু বলেন, নারীর প্রতি সহিংসতা আগেও ছিল, এখনো আছে। তবে পারিবারিক সহিংসতার ধরন পাল্টেছে এবং সহিংসতা বাড়ছে।


