গযওয়া উহুদ । পর্ব-৫

গযওয়া উহুদ । পর্ব-৫

নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের তলোয়ারের দাবী

উভয় বাহিনীর কাতারবন্দির পর নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একটা তরবারি হাতে নিয়ে বললেন, ‘এই তরবারিটির হক আদায়ের অঙ্গীকার করে এটি হাতে নেয়ার মতো কে আছো?’ উদগ্রীব হয়ে অনেক আত্মত্যাগীই হাত বাড়ালেন। বিখ্যাত বাহাদুর সাহাবী হযরত আবূ দুজানা রা. উঠে দাঁড়ালেন। বললেন, হে আল্লাহর রাসূল, এই তরবারির কী হক?

নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন,

এর হক হল, কোনো মুসলমানের শরীরে এ দ্বারা আঘাত করা যাবে না, তাকে হত্যা করা যাবে না। আর কোনো দুশমন কাফিরের মোকাবিলায় পলায়ন করা যাবে না।

অন্য এক বর্ণনায় আছে যে, এর হক হল, আল্লাহর দুশমনদের আঘাত করে খতম করে দিতে হবে।

হযরত আবূ দুজানা রা. বললেন, হে আল্লাহর রাসূল, আমি এর হক আদায়ের অঙ্গীকারে এটি গ্রহণ করছি। নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তরবারিটি আবূ দুজানার হাতেই তুলে দিলেন।

হযরত আবূ দুজানা রা. যুদ্ধের সময় লাল পাগড়ি বেঁধে নিতেন এবং গর্বভরে পদবিক্ষেপ করতেন। নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হাত থেকে সেই বিশেষ তরবারিটি নিয়ে তিনি অভ্যাসমত মাথায় লাল পাগড়িটি বাঁধলেন এবং গর্বভরে পদবিক্ষেপে অগ্রসর হলেন। আনসারীরা তাঁকে দেখে বলতে লাগলেন, আজ আবূ দুজানা মৃত্যুপরওয়ানার পাগড়ি বেঁধেছেন।

হযরত যুবায়র রা. বলেন, আমি নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আপন ফুফাত ভাই হওয়া সত্ত্বেও তিনি আমাকে তরবারিটি না দিয়ে আবূ দুজানাকে দিলেন। তাই আমি লক্ষ্য করছিলাম আবূ দুজানা কী করে? তিনি অদম্য বিক্রমে কাফিরদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়লেন, এমনকি তাদের কয়েকজন বিখ্যাত বীরকে ধরাশায়ী করে তাদের ব্যূহ ভেদ করে ফেললেন। হঠাৎ দেখি তার সামনে পড়ল আবূ সুফয়ানের স্ত্রী হিন্দা বিনত ‘উৎবা। সে চিৎকার করে উঠল কিন্তু কোনো সাহায্যকারী পেল না। হযরত আবূ দুজানা উদ্যত তরবারি নামিয়ে ফেললেন এবং সরে এলেন।

আমি বললাম, সরে এলেন কেন? তিনি বললেন, ‘নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দেয়া তরবারি একজন অসহায় নারীর গায়ে লাগবে তা আমার পছন্দ হয়নি।’ অথচ এই হিন্দা-ই পরে হযরত হামযা রা. শহীদ হলে তাঁর কলিজা চিবুতেও দ্বিধা করেনি।

দ্বন্দ্ব যুদ্ধ

কাতারবান্ধি হয়ে ব্যূহ রচনার পর তৎযুগের রীতি অনুসারে প্রথমেই শুরু হল দ্বন্দ্ব যুদ্ধ। সবার আগে ময়দানে দর্পভরে এগিয়ে এল শত্রুপক্ষের আবূ আমির আল ফাসিক। সে ছিল মদীনার আওস গোত্রের সর্দার। জাহিলী যুগেই সে একজন ধর্মপরায়ণ সন্ন্যাসী হিসাবে প্রসিদ্ধ ছিল। কিন্তু নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হিজরতের পর তাঁর প্রতি মানুষের আনুগত্য দেখে সে হিংসান্বিত হয়ে ওঠে। শেষে কিছু অনুসারী নিয়ে মক্কায় চলে আসে এবং নানাভাবে কুরাইশদেরকে মুসলিমদের বিরুদ্ধে উত্তেজিত করে তোলে। উহুদ যুদ্ধের উসকানিদাতাদের মধ্যে সে ছিল অন্যতম প্রধান। সে কুরাইশদের আশ্বস্ত করেছিল যে, আওস গোত্রের লোকেরা আমাকে দেখলে পক্ষত্যাগ করে তারা আমার কাছেই চলে আসবে।

এই অলীক ভরসায় সে উহুদের সময় সবার আগে ময়দানে এগিয়ে আসে এবং বলতে থাকে, হে আওস সম্প্রদায়, আমি আবূ আমির। আল্লাহ তোমাদের চক্ষু শীতল করুন।

কিন্তু আনসারীরা এক বাক্যে বললেন,

ওহে ফাসিক, ওহে দুষ্কৃতকারী, আল্লাহ কখনও যেন তোমার চক্ষু শীতল না করুন।

আবূ আমির লাঞ্ছিত ও হতাশ হয়ে ফিরে গেল। কুরাইশদের বলল, আমার স্বজাতি নষ্ট হয়ে গেছে, এদের আস্থা বিগড়ে গেছে।

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সেদিন আনসারীদের পতাকাতলে অবস্থান নিলেন। এরপর কুরাইশদের পতাকাবাহী সর্দার তালহা ইবন আবী তালহা দ্বন্দ্ব যুদ্ধের ডাক ছেড়ে ময়দানে ঝাঁপিয়ে পড়ল। উদ্ধতভাবে সে ব্যঙ্গ করে বলল,

হে মুহাম্মদের সাথীরা, তোমরা মনে করো তোমাদের তরবারি আমাদেরকে দ্রুত জাহান্নামে পৌঁছায় আর আমাদের তরবারি তোমাদেরকে জান্নাতে পৌঁছায়। তোমাদের মাঝে এমন কেউ কি আছে যার তরবারি আমাকে দ্রুত জাহান্নামে নিয়ে যাবে বা আমার তরবারি তাকে বেহেশতে নিয়ে যাবে?

এই কথা শুনে কালবিলম্ব না করে হযরত আলী এগিয়ে এলেন এবং এমনভাবে তালহার উপর আঘাত করলেন যে, তার পা কেটে আলাদা হয়ে গেল। সে উপুড় হয়ে মাটিতে পড়ে গেল আর পিছনদিকে তার সতর খুলে গেল। সতুর খোলা দেখে হযরত আলী শরম পেয়ে পেছনে চলে এলেন। নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, পেছনে সরে এলে কেন? হযরত আলী রা. বললেন, এর সতুর খুলে যাওয়ায় শরম লাগল।

ইবন সা’দ বর্ণনা করেন, হযরত আলী রা. তালহার মাথা লক্ষ্য করে তলোয়ার চালালেন। এতে তার মাথা দ্বিখণ্ডিত হয়ে গেল। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম খুশিতে ‘আল্লাহু আকবর’ ধ্বনি দিলেন। সাহাবীগণও তাঁর সাথে ‘আল্লাহু আকবর’ ধ্বনি দিলেন। তারপর একে একে ‘উছমান ইবন আবী তালহা, আবূ সা’দ ইবন আবী তালহা, হারিছ ইবন তালহা, শুরাইহ ইবন কারিষ-সহ বাইশ জন কুরাইশী সর্দার দ্বন্দ্ব যুদ্ধে আসে আর সাহাবীগণের হাতে ইহলীলা সংবরণ করে।

Related Articles