পাথেয় টোয়েন্টিফোর ডটকম : বাংলাদেশের জ্বালানি খাতে নতুন এক সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হলো। হবিগঞ্জ জেলার বাহুবল উপজেলার রশিদপুর গ্যাসফিল্ড থেকে জাতীয় গ্রিডে আরো ৮ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ শুরু হয়েছে। গতকাল সোমবার থেকে জাতীয় গ্রিডে এ গ্যাস যুক্ত হওয়ায় দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন ও শিল্প খাতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে আশা করা হচ্ছে। এ সংযোগ বাংলাদেশের দীর্ঘ দিনের জ্বালানি সঙ্কট নিরসনে আংশিক হলেও সহায়ক হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
গত রোববার পেট্রোবাংলার পরিচালক (অপারেশন) রফিকুল ইসলাম আনুষ্ঠানিকভাবে এই নতুন স্তরের উদ্বোধন করেন। এ সময় সিলেট গ্যাসফিল্ডস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী আবদুল জলিল প্রমাণিক এবং বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম এক্সপ্লোরেশন অ্যান্ড প্রোডাকশন কোম্পানি লিমিটেডের (বাপেক্স) ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো: ফজলুল হক উপস্থিত ছিলেন। রশিদপুর গ্যাসফিল্ডের ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার (ডিজিএম) সুমন বিকাশ দাস জানান, নতুন স্তর থেকে প্রতিদিন ৮ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা হবে।
সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, রশিদপুর গ্যাসফিল্ডে নতুন স্তরের সন্ধান পাওয়া ছিল একটি দীর্ঘ পরিকল্পনার অংশ। বাপেক্স গত ১২ জুলাই থেকে কূপটির অনুসন্ধান কার্যক্রম শুরু করে। প্রায় ৭৩ কোটি টাকা ব্যয়ে সংস্কার ও উন্নয়ন কার্যক্রম পরিচালিত হয়। অবশেষে ৫ সেপ্টেম্বর নতুন স্তরে গ্যাসের সন্ধান মেলে। বাপেক্স ও সিলেট গ্যাসফিল্ডস লিমিটেড (এসজিএফএল) যৌথভাবে সংস্কার কার্যক্রম সম্পন্ন করে এবং সফলভাবে জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করার ব্যবস্থা নেয়। এই সফলতায় দেশের জ্বালানি খাতের বিশেষজ্ঞরা আশাবাদী হয়েছেন। নতুন স্তর থেকে প্রতিদিন জাতীয় গ্রিডে ৮ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ধারণা, আগামী ১০ বছরে এ কূপ থেকে প্রায় ২৫.৫৫ বিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উত্তোলন করা যাবে। শুধু গ্যাসই নয়, এর পাশাপাশি উপজাত হিসেবে কনডেনসেটও পাওয়া যাবে, যা দেশের জ্বালানি ও পেট্রোকেমিক্যাল খাতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে। বর্তমানে রশিদপুর গ্যাসফিল্ডে ১১টি কূপের মধ্যে সাতটি সচল রয়েছে। এগুলো থেকে প্রতিদিন গড়ে ৬২ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ হচ্ছে। নতুন সংযোগের ফলে দৈনিক সরবরাহ আরো বৃদ্ধি পাবে, যা বিদ্যুৎকেন্দ্র, সার কারখানা এবং শিল্প কারখানাগুলোতে গ্যাস সরবরাহে সহায়ক হবে।
খাত সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, বাংলাদেশ দীর্ঘ দিন ধরেই গ্যাস সঙ্কটে ভুগছে। বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্প খাত ও সার কারখানার জন্য নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করা সব সময়ই সরকারের বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ পরিস্থিতিতে রশিদপুর গ্যাসফিল্ডের নতুন কূপ থেকে জাতীয় গ্রিডে অতিরিক্ত গ্যাস সরবরাহ শুরু হওয়ায় স্বল্পমেয়াদে হলেও স্বস্তি মিলবে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই সংযোজন দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা বৃদ্ধিতে সহায়ক হবে। তবে তারা একই সাথে সতর্ক করেছেন যে, ক্রমবর্ধমান চাহিদার কারণে শুধু এ ধরনের নতুন কূপ সংযোজন যথেষ্ট নয়। দেশের অভ্যন্তরে আরো অনুসন্ধান কার্যক্রম জোরদার করতে হবে এবং বিদ্যমান কূপগুলোর সংস্কার ও উৎপাদন বৃদ্ধি করতে হবে। পাশাপাশি তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানির ওপর নির্ভরশীলতা কমাতে হবে। অপর দিকে সরকারি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, নতুন কূপ থেকে যে পরিমাণ গ্যাস উত্তোলন সম্ভব হবে, তা আগামী এক দশক দেশের জ্বালানি খাতে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখবে। এর ফলে দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা বাড়বে এবং শিল্প খাতের প্রবৃদ্ধি টেকসই হবে। পাশাপাশি কনডেনসেটের উৎপাদন স্থানীয় বাজারে পেট্রোকেমিক্যাল ও জ্বালানি খাতে নতুন সম্ভাবনা সৃষ্টি করবে।
রশিদপুরে গত রোববার রাত থেকে উৎপাদনে যাওয়ার আগ পর্যন্ত দীর্ঘ সময় নিয়মানুযায়ী ‘প্রোডাকশন টেস্টিং’ চলছিল। এসজিএফএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী আবদুল জলিল প্রামাণিক নয়া দিগন্তকে এ তথ্য নিশ্চিত করে জানান, এক সপ্তাহ আগে আমরা পুরনো এ কূপ থেকে প্রতিদিন ৮-১০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস প্রাপ্তির সম্ভাবনা দেখছিলাম। আলহামদুলিল্লাহ এখন তা বাস্তবে পরিণত হয়েছে। তিনি জানান, রোববার রাত ৮টা ৫৭ মিনিটে রশিদপুর-৩ কূপ ওয়ার্কওভার শেষে আনুমানিক ৮ মিলিয়ন ঘনফুট হারে ১৩৩০ পিএসআইজি প্রেসারে গ্যাস ফ্লো হচ্ছিল। ক্লিনআপ শেষ করে সোমবার থেকে জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হলো।
এসজিএফএল সূত্র জানিয়েছে, রশিদপুর-৩ এর পাশাপাশি সিলেটের গোলাপগঞ্জ উপজেলা সদরে কৈলাশটিলা-১ ও বিয়ানীবাজার-২ কূপের ওয়ার্কওভারের কাজ চলমান রয়েছে। রশিদপুর গ্যাস ফিল্ডের সবচেয়ে সুবিধাজনক বিষয় হচ্ছে, পাইপলাইন ও প্রসেস প্ল্যান্ট বিদ্যমান রয়েছে। গ্যাস উত্তোলন ও সরবরাহের ক্ষেত্রে কূপটিতে অন্য কোনো জটিলতা নেই। এর আগে গত ১২ জুলাই পুরাতন এ কূপটিতে অনুসন্ধান শুরু করে বাপেক্স।


