অনলাইন দারস জামিয়া ইকরার যুগান্তকরী পদক্ষেপ

অনলাইন দারস জামিয়া ইকরার যুগান্তকরী পদক্ষেপ

অনলাইন দারস জামিয়া ইকরার যুগান্তকরী পদক্ষেপ

মাওলানা আমিনুল ইসলাম :: অনলাইনে দরস প্রদান এখন সময়ের দাবি। যুগের চাহিদানুসারে এখন আমাদের সেভাবে এগিয়ে আসতে হবে। এক সময় মানুষের হাতে কাগজ- কলম ছিলো না। চামড়ার উপর লিখত। গাছের ছাল, পাথর, গাছের পাতা, কাঠের তক্তা এরকম বহু জিনিসের ওপর মানুষ লেখালেখির কাজ করেছে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর যুগে যখন কুরআনুল কারীম নাযিল হয়, তখনও কাগজের উপর কুরআন লেখার প্রবণতা হয়নি। তখনকার মানুষ ও চামড়া বা অন্যান্য দ্রব্যের উপরে লিখে হেফাজত করেছে। বর্তমানে আমাদের সামনে ভলিউম আকারে কোরআন। কত সুন্দর ভাবে এক জায়গা করে আধুনিক প্রিন্টিং-প্রেসে ছাপিয়ে আমাদের সামনে তুলে ধরা হয়েছে। সেই জামানায় এত সুন্দর ব্যবস্থাপনা তখন হয়নি। কুরআনুল কারীম পেয়ারা হাবীব সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের উপর নাযিল হওয়ার সাথে সাথে তাঁরা মুখস্থ করে নিতেন এবং কেউ কেউ লিখে রাখতেন, তাদের সেই সময়কার লেখার বস্তুর উপর। আর এভাবেই সংরক্ষণ করা হতো কুরআন।

আমি যখন ছোট, তখন আমার বড় আপুকে দেখতাম, তালপাতার উপরে বাংলা স্বরবর্ণ- ব্যঞ্জনবর্ণ লিখত। কলম ছিল বাঁশের কঞ্চি দিয়ে বানানো। কালি ছিল হাঁড়ির পাছার কালো অংশ। যেটা পানির সাথে মিশিয়ে কালি বানানো হত। আবার কালির দোয়াতও বাজারে কিনতে পাওয়া যেত। সে কালি দিয়েও লেখা হত তালপাতার উপরে।

দেওবন্দে পড়াকালীন সময়ে আরবী ক্যালিগ্রাফি শেখার জন্য একজন উস্তাদের স্মরণাপন্ন হয়েছিলাম। তিনি আমাকে কঞ্চির কলম কিনতে বললেন। সে অনুযায়ী কঞ্চির কলম ও কালির দোয়াত কিনে এনে কিছুদিন আরবী আর্ট শেখার প্রাকটিস করলাম।

এখন তো অনেক কিছু নেই। ছোট বেলায় সেই ফাউন্টেন পেন (কালিভরা কলম) এখন তো মনেহয় যাদুঘরে গিয়ে খুঁজতে হবে।কলমের পাছা ছিদ্র হয়ে কালি নির্গত হয়েছে অগণিতবার। আর বাপের টাকায় কেনা জামা গুলোতে দাগ লেগে নষ্ট হয়েছে তার হিসেব নেই।

এখন সেই কালিভরা কলম আর কঞ্চির কলম দেখলে বর্তমানের ছেলে- মেয়েরা হাসতে হাসতে তাদের পেটে খিল ধরবে। অথচ সেটাই ছিল সে যুগের সবচেয়ে উন্নত মানের লেখার পদ্ধতি। একটা দামি কলম, ভাল কালির দোয়াত কাছে থাকা ভাল একজন ছাত্রের বৈশিষ্ট্য ছিল।

এখনকার প্রবীণ অফিসার, মন্ত্রী- মিনিস্টার, বিজ্ঞ আলেম- উলামাগণ সেই কালির কলম আর তালপাতায় লিখে বড় পণ্ডিত হয়েছেন। একটু বয়স্ক যারা তাদের অনেকেই সেই পুরনো পদ্ধতির ছাত্র।

বর্তমান আমাদের কি অবস্থা? কেউ কি আর তালপাতার কথা ভাবতে পারেন? কত সুন্দর আধুনিক কলম, কত ধবধবে সাদা কাগজ। অফসেট পেপার। কাগজ গুলো দেখলে মনটা ভরে যায়। আমরা ছোট বেলায় এত সুন্দর কাগজ দেখিনি। আমাদের সময় ছিল, কর্ণফুলি মিলের কাগজ আর পাকশী মিলের কাগজ। কর্ণফুলি কাগজ লালচে ধরনের আর পাকশী একটু সাদা ধরনের পাতলা। তারপর আবার খুলনা থেকে নিউজপ্রিন্ট কাগজ আসত। সেটাতে লিখেছি।

এখন সব কিছুতে আধুনিকতা। কলমের আর কাগজের লেখাও কিন্তু বিদায় নিচ্ছে। কদিন পর মনেহয় কাগজ আর কলমের ইতি ঘটবে। কেউ কি ভেবেছেন? কিবোর্ড আর কম্পিউটরে লেখার কথা। প্রাথমিক পর্যায়ে কম্পিউটর আসলে কত আইন, ওরে আল্লাহ! জুতা নিয়ে কেউ কম্পিউটর রুমে ঢুকবেন না। কম্পিউটরের দোকানে সাইনবোর্ড ঝুলানো থাকত। কখনো ভুল করে কেউ কম্পিউটর রুমে জুতা নিয়ে ঢুকলে কত যে গালমন্দ শুনতে হয়েছে! বর্তমান তো কম্পিউটর যেখানে – সেখানে পড়ে থাকে। খোলা জায়গায় বসানো হয়েছে। কেউ আর জুতা খোলার কথা বলে না।
এরপর কম্পিউটর ঢুকে গেছে আমাদের পকেটে। এখন কম্পিউটর এর মতো এত্ত বড় একটা বোঝা আর কেউ কাছে রাখতে চায় না। কদিন তো ল্যাপটপ চলল। ব্যাগে করে ল্যাপটপ নিয়ে ঘুরত। এখন দেখি ল্যাপটপকে না বলা শুরু করেছে মানুষ। এখন এন্ড্রয়েট মোবাইল সেট। প্রায় প্রতিটি মানুষের হাতে পৌছে গেছে। মোবাইলের মাধ্যমে এখন লেখালেখি।

বহু মানুষ আছে, কাগজ আর কলমকে গুডবাই জানিয়েছেন। সবকিছুতে এখন মোবাইল, কম্পিউটর, ল্যাপটপ এ লিখে থাকেন। দিনে দিনে মানুষের জীবন যাত্রার মান বাড়ছে। মানুষ আধুনিকতার ছোঁয়ায় উপরে উঠে যাচ্ছে। বিদায় জানাচ্ছে পুরনো জিনিস।

আগে খবর শোনার জন্য দোকানে ভিড় করত। বিবিসির খবর, ভয়েজ অফ আমেরিকার খবর শোনার জন্য কোন এলাকার দোকানে বা কারো বাড়ি যদি রেডিও থাকত, সেখানে মানুষের ভিড়। এক রেডিওর সামনে শত শত মানুষ। এখন কি আর রেডিও দেখা যায়? কেউ কি খবর শোনার জন্য কারো বাড়ীতে ভিড় করে?

এখন সবার হাতে খবরের বাক্স। একদম রেডিও,টেলিভিশন, ভিসিআর, এবং বিশ্বে যত খবরের চ্যানেল আছে, সব কিছুর গুরু হলো ইন্টারনেট সংযোগ। সেই সংযোগ প্রত্যকের মোবাইলে। যখন যার যা ইচ্ছা তাই সে শুনতে পাচ্ছে। কারো কাছে আর ধরনা দিতে হয় না।

সবকিছুতে এখন আধুনিকতার ছোঁয়া। কোন কিছুতে বাদ নেই। হজ্জ করতে যাবেন? সেটাও এখন অনলাইন সিষ্টেম। অনলাইনে রেজিস্ট্রেশন করতে হয়। অনলাইনে রেজিঃ ছাড়া এখন আর কারো হজ্জে যাওয়ার সুযোগ নেই। হাজীদের বাড়ি ভাড়া, হাজীদের ভিসা প্রসেসিং সব কিছু অনলাইনে। এমনকি মক্কা-মদীনায় হাজী সাহেবগণ কোথায়, কোন হোটেলে -কয়দিন থাকবে,সবকিছুর তথ্য অনলাইনে পাওয়া যায়।

আর কিছুতে বাদ নেই। অনলাইন নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে মানুষ। এজন্য আমাদের কওমী মাদ্রাসা গুলো অনলাইনের আওতায় নিয়ে আসতে হবে। বিশ্বের অন্যান্য দেশে কিন্তু অনলাইনে লেখাপড়া চলছে। ভর্তি,পাঠদান,পরীক্ষা, ফলাফল ইত্যাকার বিষয় অনলাইনে চালু হয়ে গেছে। আমাদের দেশে অনেক সরকারী-বেসরকারী প্রতিষ্ঠানে অনলাইনে ভর্তি কার্যক্রম হচ্ছে। নামী-দামী বিশ্ববিদ্যালয়, স্কুল এবং কিছু কিছু দ্বীনি মাদ্রাসা তাদের অনলাইন সিষ্টেমে ভর্তি কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। এটা অত্যন্ত প্রশংসনীয়। যুগের চাহিদানুযায়ী তারা যে ব্যবস্থা করেছেন, ধন্যবাদ পাওয়ার যোগ্য তারা।
আমাদের বাংলাদেশে এই প্রথম অনলাইন পদ্ধতিতে ক্লাশ চালু হল। প্রখ্যাত আলেমে-দ্বীন, দারুল উলুম দেওবন্দের এক সুর্য সন্তান, আল্লামা ফরীদ উদ্দীন মাসউদ সাহেব, তাঁর জামিয়া ইকরাতে অনলাইনে বুখারী শরীফের দরস শুরু করতে যাচ্ছেন। আগামী ১৭ জুন।সন্ধ্যা ৭.৩০ মিনিটে অনলাইনে বুখারীর দরস হবে।

একটা প্রসংসনীয় উদ্যোগ। যুগান্তকরী পদক্ষেপ। বর্তমান যুগ- জামানার চাহিদা। সময়ের দাবী। এই পরিস্থিতিতে ছাত্রদের ঘরে বসে থাকলে অপূরণীয় ক্ষতি হবে। অনলাইনের মাধ্যমে দরস প্রদান করলে এগিয়ে যাবে আমাদের সন্তানেরা।

আমরা জানি, হাদীসের সবচেয়ে প্রসিদ্ধ কিতাব হল, বুখারী শরীফ। সেই গুরুত্ব পুর্ণ কিতাব অনলাইনে শুরু করতে যাচ্ছেন, একজন জাঁদরেল মুহাদ্দিস, আলেমদের শিরোমণি আল্লামা মাসউদ সাহেব।

তিনি অনলাইনের ফাউন্ডার। অনন্য উচ্চতায় ওঠে যাবে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা। এখন থেকে এ পথে পা- বাড়াবেন অনেকেই। আল্লামা মাসউদ সাহেব এমনই। কওমী মাদ্রাসার উন্নতি- অগ্রগতির পিছনে তিনি অসামান্য অবদান রেখেছেন। তাঁর জীবনের শুরু থেকে তিনি এ শিক্ষাব্যবস্থার তরক্কির জন্য মেহনত করে যাচ্ছেন।

কওমী মাদ্রাসাতে বাংলা ভাষায় দরস, বাংলা সাহিত্য চর্চা, সনদের স্বীকৃতি, এরকম বহু কাজে আল্লামা মাসউদ সাহেব সর্বাগ্রে শুরু করেছেন। তাঁর দেখাদেখি এগিয়ে এসেছে অন্যরা।এখন অনলাইনে বুখারী শরীফের দরস। নিঃসন্দেহে তাঁর এই পদক্ষেপ প্রসংসার দাবী রাখে। এবার এগিয়ে যাবে ওলামায়ে কেরাম। কলাল্লাহ- কলার রাসুলের ধ্বনি বেজে ওঠবে আধুনিক যন্ত্রপাতির ছোঁয়ায়।

আল্লাহ কবুল করুন। আমিন।

লেখক : কলামিস্ট

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *