আজ কবির কণ্ঠে সেই অমর কবিতা উচ্চারণের দিন
পাথেয় টোয়েন্টিফোর ডটকম : ‘অতঃপর কবি এসে জনতার মঞ্চে দাঁড়ালেন।/ তখন পলকে দারুণ ঝলকে তরীতে উঠিল জল,/ হৃদয়ে লাগিল দোলা,/ জনসমুদ্রে জাগিল জোয়ার/ সকল দুয়ার খোলা।/ কে রোধে তাঁহার বজ্রকণ্ঠ বাণী?/ গণসুর্য্যরে মঞ্চ কাঁপিয়ে কবি শোনালেন তাঁর অমর কবিতাখানি :/‘‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম,/ এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’’ [কবিতা : ‘স্বাধীনতা, এই শব্দটি কীভাবে আমাদের হলো’, কবি : নির্মলেন্দু গুণ]
আজ ঐতিহাসিক ৭ মার্চ। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের যুগান্তকারী ভাষণের স্মারক হিসেবে দিনটি অবিস্মরণীয় হয়ে আছে। ১৯৭১ সালের এই দিনে তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানের (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) বিশাল জনসমাবেশে দেওয়া ভাষণে ‘রাজনীতির কবি’ বাঙালি জাতিকে স্বাধীনতা যুদ্ধের চূড়ান্ত প্রস্তুতি নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন। বিশাল জনসমুদ্রে দাঁড়িয়ে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’
অমোচনীয় ইতিহাসের অনন্য এ দিনটি এবার জাতীয়ভাবে পালিত হচ্ছে। এ জন্য একটি পরিপত্র জারি করেছে সরকার। এরই অংশ হিসেবে রাজধানীসহ দেশের প্রতিটি জেলা-উপজেলায় ব্যাপক কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। এ ছাড়া আজ দিনব্যাপী নানা কর্মসূচি পালন করবে আওয়ামী লীগ এবং এর অঙ্গসহযোগী সংগঠনগুলো। নানা সামাজিক সাংস্কৃতিক সংগঠনও দিবসটি উদযাপনে বিভিন্ন কর্মসূচির আয়োজন করেছে। ৭ মার্চ উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাণী দিয়েছেন।
আজ অনুষ্ঠেয় কর্মসূচির মধ্যে রয়েছেন সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে জাতীয় পতাকা উত্তোলন এবং ধানমন্ডির ৩২ নাম্বারে বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘর প্রাঙ্গণে জাতির পিতার প্রতিকৃতিতে পুষ্পস্তবক অর্পণের মধ্য দিয়ে শুরু হবে আয়োজন। এতে আরও থাকছে আবৃত্তি, সংগীত, নৃত্য, বঙ্গবন্ধুর কর্মময় জীবন নিয়ে নাটক মঞ্চায়ন, বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে প্রামাণ্যচিত্র, চলচ্চিত্র ও আলোকচিত্র প্রদর্শনী; এবং স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণে সব জেলায় বিভিন্ন প্রতিযোগিতার (বঙ্গবন্ধুর ভাষণ, আবৃত্তি, চিত্রাঙ্কন, সংগীত ও নৃত্য) আয়োজন, দেশের গুরুত্বপূর্ণ সড়কদ্বীপ সজ্জিতকরণ, সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের বিভিন্ন স্থানে আতশবাজি ইত্যাদি।
গতকাল শিল্পকলা একাডেমির জাতীয় নাট্যশালার সেমিনারকক্ষে অনুষ্ঠিত সংবাদ সম্মেলনে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে এসব জানানো হয়। এতে উপস্থিত ছিলেন সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী কেএম খালিদ, মন্ত্রণালয়ের সচিব বদরুল আরেফীন, একাডেমির মহাপরিচালক লিয়াকত আলী লাকী প্রমুখ।
লিখিত বক্তব্যে সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী কেএম খালিদ বলেন, বাংলাদেশের স্বাধীনতার প্রেক্ষাপটে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণের তাৎপর্য অনেক গভীর। দিনটিকে ঐতিহাসিক ৭ মার্চ দিবস হিসেবে ঘোষণা এবং দিবসটিকে ‘ক’ শ্রেণিভুক্ত হিসেবে পরিপত্র জারি করা হয়েছে। এই আয়োজন উদযাপনে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে সংযুক্ত করা হয়েছে। কেন্দ্রীয় অনুষ্ঠান বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে ৭ মার্চ বিকাল ৩টায় আয়োজন করা হবে। এতে প্রধান অতিথি হিসেবে ভার্চুয়ালি উপস্থিত থাকবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
উদীচীর প্রতিবাদী সাংস্কৃতিক সমাবেশ : ১৯৯৯ সালের ৬ মার্চ ছিল যশোর টাউন হল মাঠে উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর দ্বাদশ জাতীয় সম্মেলনের শেষ দিনে বাউল গানের আসরে বোমার বিস্ফোরণ ঘটিয়ে হত্যাকা- চালায় উগ্রবাদীরা। এতে প্রাণ হারান ১০ শিল্পী-কর্মী ও সাধারণ মানুষ। ২২ বছর কেটে গেল সেই হামলার বিচার এখনো হয়নি। আর বিচারহীনতার ২২ বছর পালনে প্রতিবাদী সাংস্কৃতিক সমাবেশের আয়োজন করেছে উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী।
গতকাল বিকালে শাহবাগ প্রজন্ম চত্বরে অনুষ্ঠিত এই আয়োজনে বক্তৃতা করেন উদীচী কেন্দ্রীয় সংসদের সাধারণ সম্পাদক জামসেদ আনোয়ার তপন, সহসাধারণ সম্পাদক অমিত রঞ্জন দে, সংগীতা ইমামসহ উদীচীর নেতৃবৃন্দ।
ওই হত্যাকােন্ড নিহতদের স্মরণে স্থাপিত অস্থায়ী বেদিতে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ এবং আলোক প্রজ্বালন করা হয় আলোচনা শেষে সাংস্কৃতিক পর্বে পরিবেশিত হয় দলীয় ও একক সংগীত, আবৃত্তি ও নৃত্য। বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণকে ২০১৭ সালের ৩০ অক্টোবর বিশ্ব প্রামাণ্য ঐতিহ্য হিসেবে স্বীকৃতি দেয় জাতিসংঘের শিক্ষা বিজ্ঞান ও সাংস্কৃতিকবিষয়ক সংস্থা ইউনেস্কো।
রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাণী দিয়েছেন। রাষ্ট্রপতি তার বাণীতে বলেন, ‘৭ মার্চের বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষণ বাঙালি জাতির স্বাধীনতার দলিল। এদিন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান রেসকোর্স ময়দানে বজ্রকণ্ঠে যে ঐতিহাসিক ভাষণ দিয়েছিলেন, তার মধ্যে নিহিত ছিল স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশের ডাক।’
আরও পড়ুন: বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ জাতিসংঘের সব দাপ্তরিক ভাষায় প্রকাশ
৭ মার্চের ভাষণের আবেদন আজও অটুট আছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী তার বাণীতে বলেন, ‘বাঙালির বীরত্বপূর্ণ সংগ্রাম ও সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধে জাতির পিতার এই ভাষণের দিকনির্দেশনাই ছিল সেই সময় বজ্রকঠিন জাতীয় ঐক্যের মূলমন্ত্র। অসীম ত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের অমিত শক্তির উৎস ছিল এই ঐতিহাসিক ভাষণ।’
দিনটি উপলক্ষে আওয়ামী লীগের কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে- আজ ভোর সাড়ে ৬টায় বঙ্গবন্ধু ভবন, দলীয় কার্যালয়ে জাতীয় ও দলীয় পতাকা উত্তোলন, সকাল ৯টায় বঙ্গবন্ধু ভবন প্রাঙ্গণে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতিকৃতিতে শ্রদ্ধা নিবেদন। রাজধানীর ২৩ বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউয়ে বিকাল ৩টায় ৭ মার্চের আলোচনাসভা অনুষ্ঠিত হবে। এতে আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সভাপতিত্ব করবেন। শেখ হাসিনা এমপি ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে বক্তব্য রাখবেন।
এ ছাড়া ছাত্রলীগ, যুবলীগ, কৃষক লীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগসহ দলের সব সহযোগী সংগঠন স্বাস্থ্যবিধি মেনে বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করছে। এ ছাড়া বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক সংগঠনও কর্মসূচি গ্রহণ করেছে।


