আত্মঘাতী হামলা আর আত্মোৎসর্গ এক নয়
মাওলানা আমিনুল ইসলাম : আত্মোৎসর্গ হল, নিজেকে উৎসর্গ করা। যুদ্ধের ময়দানে শত্রুর মোকাবিলা করতে করতে নিজেকে উৎসর্গ করে দেওয়া। দুশমনের মোকাবিলায় প্রাণপণ লড়াই করা। এটা তো না-জায়েজ নয়। বরং উত্তম। কিন্তু আত্মঘাতী হামলা? — এটা তো একদম কাপুরুষতা। যাকে বলে চোরাগোপ্তা হামলা। ইসলাম এটাকে কখনো সমর্থন করে নি।
বর্তমান বিশ্বে আত্মঘাতী হামলার প্রবণতা দেখা দিয়েছে। বিভিন্ন দেশে আত্মঘাতী হামলা চালাচ্ছে, একদল বিভ্রান্ত লোক। যার ফলে, ইসলাম ও মুসলমানদের নানা প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হচ্ছে। এভাবেই ওরা শান্তি বিনষ্ট করছে, সস্প্রীতি বিনষ্ট করছে।
এসব আত্মঘাতী হামলার কারণে ইসলাম যে এক শান্তির ধর্ম, সে কথাটা যেন এখন অনেকে বিশ্বাস করতে চাচ্ছেন না। বড়ই পরিতাপের বিষয়, শুধু মাত্র কতিপয় লোকের এসব সিদ্ধান্তে আজ শান্তির ধর্ম ইসলাম নানান প্রশ্নের মুখোমুখি।
একটা বিষয় তাদের বুঝার বড় ভুল। ওরা জিহাদ আর সন্ত্রাসকে গুলিয়ে ফেলেছে। অথচ এই দু’টো জিনিস কিন্তু এক নয়।
জিহাদের উদ্দেশ্য হল— অনাচারের বিরুদ্ধে লড়াই করে হক প্রতিষ্ঠিত করা। শান্তি কায়েম করা। আর সন্ত্রাস তো শুধু বিশৃংখলা ঘটানো। ওর কোনো সমাধান নেই, শুধু ফাসাদ সৃষ্টি করে সমাজের মধ্যে।
আত্মঘাতী হামলা সন্ত্রাসী কার্যকলাপের নামান্তর। এর দ্বারা কখনো কোনো সমাধান আজ পর্যন্ত হয় নি এবং হবেও না।
ওরা আত্মঘাতী হামলা চালায় বিভিন্ন উপসানালয়ে। ওরা হামলা করে নিরীহ মানুষের উপর। ওরা আক্রমণ করে, অবলা নারী-মাছুম শিশুর উপর। অথচ ইসলাম এর কোনোটাই সমর্থন করে না। কোনো নারী-শিশু-বৃদ্ধ-নিরপরাধ মানুষ মারার সার্টিফিকেট কিন্তু ইসলামে দেয় নি।
এবং আত্মঘাতী হামলা— এটা তো একদম আত্মহত্যার নামান্তর। নিজেকে নিজে হত্যা করা ইসলাম তো কখনো অনুমোদন দেয় নি।
পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হয়েছে, ” ওয়ালা তুলকু বি আইদিকুম ইলাত তাহলুকা”
অর্থঃ ” তোমরা নিজেকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিওনা।( সুরা বাকারা- ১৯৫)
ইচ্ছাকৃত ভাবে নিজেকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেওয়া, একটা জাতিকে বিপদের দিকে ধাবিত করা, একটা সুস্হ, সুন্দর পরিবেশ বিনষ্ট করা, এতে ইসলামের কোন সাপোর্ট নেই। বরং নিষেধ করা হয়েছে।
কোন এক যুদ্ধে এক মুসলিম ব্যক্তি বীরত্বের সাথে যুদ্ধ করে যাচ্ছিলেন। লোকেরা তার ব্যাপারে রাসুলুল্লাহ ( সাঃ) কে বলতে লাগল, লোকটা জান্নাতি? কিন্তু রাসূল্লাহ ( সাঃ) বললেন, লোকটা জাহান্নামী। কেননা সে আত্মহত্যা করেছে।
জিহাদের ময়দানে প্রানপণ লড়াই না করে নিজেকে আত্মো হত্যার দিকে ঠেলে দেওয়া, বড় বেমানান।
যুদ্ধের ময়দানে শত্রুর সম্মুখে যুদ্ধ না করে খামাখা জীবন দেওয়া তো আত্মোহত্যার শামিল।
হালজামানায় যারা আত্মোঘাতি হামলা চালাচ্ছে, এরা তো সেরকমই নিজেকে খামাখা হত্যা করছে। কোন যুদ্ধ নয়। কোন সংগ্রাম নেই। নিজেই নিজেকে ধ্বংস করে যাচ্ছে।
এ জন্য এই আত্মঘাতী হামলা ইসলামে বিন্দুমাত্র সমর্থন করে না।
এরপর আরেকটা বিষয় হল, আধুনিক তথ্য-প্রযুক্তিতে সমৃদ্ধ বিশ্বায়নের এই যুগে, যেখানে প্রকাশ্যে ইসলামের দাওয়াত মানুষের কাছে পৌঁছনো যাচ্ছে। নির্বিঘ্নে দ্বীন ইসলামের কথা মানুষের কাছে বলা যায়, সেখানে কেন পিছনের দরজা দিয়ে আসতে হবে? কেন চোরাগোপ্তা হামলা চালিয়ে ইসলাম ও মুসলমানদেরকে অস্থিরতায় ফেলতে হবে?
আজ মুসলমান যে অস্থিরতায় দিন পার করছে, এর জন্য এই বিভ্রান্ত বাহিনী সবচেয়ে বেশী দায়ী। এরাই ইসলামকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। একটা শান্তির ধর্মকে নাস্তানাবুদ করে ছাড়ছে ওরা।
আজ ঐসব সন্ত্রাসী-জঙ্গী বাহিনীর আচরণের কারণে আলেমসমাজ এবং নিরীহ মুসলমান কোণঠাসা হচ্ছে। আলেমসমাজ যে শান্তির মিশন নিয়ে বিশ্বব্যাপী কাজ করছে, সেটা এখন বাধাগ্রস্ত। ওদের কারণে আলেমদের ‘জঙ্গী’ খেতাব লাগানো হচ্ছে। আলেমদের কাজে আজ পদে পদে বাধা।
ওরা যুদ্ধের ময়দানে আত্মোৎসর্গকে আত্মঘাতীর সাথে তুলনা করছে। অথচ দু’টো কিন্তু ভিন্ন জিনিস। আত্মোৎসর্গ তো শত্রুর মোকাবিলায় প্রাণপণ লড়াই করা। সেখানে মুখোমুখি যুদ্ধের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু আত্মঘাতীর এই চোরাগোপ্তা হামলা তো হামলা নয়। এটা সম্পূর্ণ চোরের মতো গিয়ে হামলা করে সমাজে বিশৃংখলা ঘটানো, এটা বড়ই নিন্দনীয়।
তাই সতর্ক হওয়া চাই সকলের। বুঝতে হবে আমাদের। শুধু গলাবাজি নয়। নিজেকে মজবুত করতে হবে। নিজেদের সংগঠন, নিজেদের চিন্তা-চেতনা মজবুত করা জরুরী।
কিছু মানুষ তো শুধু ‘সাউন্ড’-এর বিজনেস নিয়েই আছেন। ব্যাস, আর কিছু চায় না…!
কিন্তু মানুষ তৈরী করা দরকার আগে। কাকে নিয়ে আপনি এই সমাজ, এই বিশ্বের পরিবর্তন ঘটাবেন? সে লোক কি তৈরী আছে আপনার?
আর আচমকা একজন মানুষের উপর হামলে পড়বেন, তাকে কি দ্বীনের সঠিক বাণী শোনানো হয়েছে? তাকে কি যথার্থভাবে দ্বীনের দাওয়াত দেওয়া হয়েছে?
রাসূল্লাহ ( সাঃ) আগেই কারো উপর তরবারী ধরেন নি। দীর্ঘ তেরটা বছর প্রথমে দাওয়াতের কাজ করেছেন। তারপর আস্তে আস্তে অবস্থা ভেদে মানুষকে এই মহান ইসলামের সুশীতল ছায়াতলে আনার চেষ্টা করেছেন। বহু চেষ্টা তদবীরের পর যখন আর কোনো উপায় ছিল না তখন যুদ্ধ করেছেন। তবে সেটা ছিল শান্তি কায়েমের জন্য।
আল্লাহ আমাদের সহী বুঝ দান করুন। আমিন।
লেখকঃ শিক্ষক ও সমাজ বিশ্লেষক


