আন নাযারাত || পর্ব-৩

আন নাযারাত || পর্ব-৩

  • মুফতি আব্দুস সালাম ইবন হাশিম

ভূমিকা

এই উপলব্ধি ও রুচি গঠনে আমার একমাত্র সহায় ছিল আমার অনুভূতি—হৃদয়ের সেই সূক্ষ্ম সাড়া, যে কখনো আনন্দে ধ্বনিত হয়, কখনো বেদনায় কেঁপে ওঠে—যখন আমার সামনে দিয়ে ভেসে যায় কোনো মনোহর বাক্য, কিংবা অসুন্দরের ক্লেদময় ধ্বনি। অথচ আমি জানতাম না সেই প্রভাব কোথা থেকে আসে, কী তার উৎস। আমি ছিলাম ঠিক সেই প্রকার শ্রোতার মতো, যার অন্তর সাড়া দেয় কোনো সুরে, বিমর্ষ হয়ে ওঠে আরেকটিতে, অথচ সে জানে না সংগীতের ছন্দ বা সূত্র; তবু একটিতে সে বিহ্বল হয়ে ওঠে, আর অন্যটিতে শঙ্কিত।

আমি কেবল সেই সাহিত্যই পড়তাম, যা আমি বুঝতে পারতাম; আর সেই লেখাই বুঝতাম, যা অনুভব করতাম—যেন তা লেখকের হৃদয় থেকে বেরিয়ে এসেছে ঠিক তীরের মতো, ধনুকের তন্ত্রী ছাড়িয়ে গিয়ে বিধেছে লক্ষভেদে—ভাবের কেন্দ্রে, অনুভূতির নিঃসন্দিগ্ধ কেন্দ্রবিন্দুতে।

আর যখনই দেখতাম, কোনো ভাবনা ঢাকা পড়ে আছে জটিল বাক্যবিন্যাসের তলে, কিংবা খামখেয়ালি ও কৃত্রিম ভাষাশৈলীর জালে, তখন বুঝতাম—লেখক হয়তো ভাষায় দুর্বল, তার হৃদয়ে যা আছে, তা প্রকাশ করার পদ্ধতি সে জানে না; অথবা সে অজ্ঞ—যে নিজেই পুরোপুরি আয়ত্ত করতে পারেনি তার ভাবনাকে, আত্মার গভীরে তা অনুভব করেনি; ফলে সে কেবল কল্পনার কুয়াশায় আবছা কিছু দেখে, গুছিয়ে বলতে পারে না, প্রলাপ বকে যায়। অথবা সে একজন ধূর্ত শিল্পী, যে জানে তার ভাবনা গৃহস্থালির ভাঙা বাসনের মতো তুচ্ছ ও ত্যাজ্য, তবুও চায় তা বাজারে বিকোতে—তাই সে তাকে মোড়ায় দুর্বোধ্য অলঙ্কারে, ভাষার রহস্যে আড়াল  করে দেয় আসল শূন্যতা, যেন পাঠক তাকে খুঁজতে গিয়ে ক্লান্ত হয়, ঘাম ঝরায়, কল্পনার বিস্ময়ে অভিভূত হয়।

অবশেষে পাঠক যখন অনেক পরিশ্রমে, একপ্রকার ছলনার শিকার হয়ে সেই ভাবনায় পৌঁছে যায়, তখন সে মনে করে—এই বুঝি সে কোনো গভীর অর্থ বা বিস্ময়কর বোধ লাভ করেছে! এবং সে তৃপ্ত হয়, অনেকটা সেই ক্লান্ত পথিকের মতো, যে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে অবশেষে পৌঁছায় এক ঘোলা জলাশয়ের কাছে—জল যদিও নির্মল নয়, তবু দেহ-মনে তার প্রশান্তি ছড়িয়ে পড়ে, কারণ সে এসেছে তৃষ্ণার কঠিন অভিযাত্রা শেষে।

অথবা, সে লেখক এমন এক দুর্বল চিত্তের ব্যক্তি—মনোবলে হীন, আত্মবিশ্বাসে শূন্য—যে জেনে গেছে, মানুষদের মধ্যে যারা সংখ্যাগরিষ্ঠ, সেই সাধারণ ও সাদাসিধে শ্রেণির পাঠক, যারা কোনো ভাবের অন্তর্নিহিত মূল্য বোঝে না, না তা বিবেচনায় নেয়, না তা মেপে দেখে—যদি না সেই ভাবনা তাদের সামনে উপস্থিত হয় এক গম্ভীর, শক্ত, খসখসে বাক্যবস্ত্র পরে।

আর যদি তাদের সামনে ধরা দেয় কোনো মহামূল্যবান অর্থ—অভিজাত উৎস থেকে আসা, পবিত্র উৎস থেকে ঝরনা হয়ে ফোটা—কিন্তু সেই অর্থ যদি প্রকাশিত হয় এক স্বচ্ছ, কোমল ও সরল ভাষাশৈলীতে, তবে তারা ধারণা করে, এমন সরল ভাষায় প্রকাশিত ভাবনা নিশ্চয়ই তুচ্ছ, চর্বিতচর্বণ, বা বাজারে বহুল ব্যবহৃত কোনো মামুলি বস্তু। ফলে তারা তাকে তাচ্ছিল্য করে, অবহেলা করে, চোখের কোণে ঠেলে ফেলে।

এবং এই লেখক—যার সাহস ভঙ্গুর, যার অভিলাষ সংকুচিত—মনে করে, তাকে বাধ্য হয়েই এই সাধারণ রুচির স্তরে নামতে হবে, তাদের সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য নিজ শিল্পসত্যকে বিসর্জন দিতে হবে, এবং নিজের মানসিক উচ্চতাকে নতজানু করে ফেলতে হবে।

তাই সে নিজেকে তাদের সামনে তুলে ধরে—কৃত্রিম দুর্বোধ্যতা, জড়তা ও জটিলতার মোড়কে; অস্পষ্টতা আর ধাঁধাজালে মোড়া এক লেখকসত্তা হয়ে ওঠে, যে তাদের রুচির কাছে নিজেকে বিকিয়ে দেয়, আর ভাষার স্বচ্ছতাকে বিসর্জন দিয়ে হয়ে ওঠে—গোঁজামিলের গ্ল্যামারে মোড়ানো এক চাটুকার সাহিত্যিক।

অথবা, সে এমন একজন ‘সাহিত্যিক’, যার মাতৃভাষা আরবি নয়, সে ভাবে—আরবি ভাষা মানেই কিছু অক্ষর আর শব্দ মাত্র। তার জানাশোনা সেখানেই সীমাবদ্ধ। ফলে সে যা লেখে, তা অনেকটা তেমন হয়, যেমন কেউ বিদেশি ভাষা থেকে শব্দ ধরে ধরে যান্ত্রিক অনুবাদ করে।

যখন তার ভাষার অস্বাভাবিকতা, দুর্বোধ্যতা বা জটিলতা নিয়ে কেউ প্রশ্ন তোলে, তখন সে বলে—‘আজকের আধুনিক ভাবনা আর নতুন কল্পনাগুলোকে তো আর আরবদের প্রাচীন ভাষায় প্রকাশ করা যায় না!’ যেন সে মনে করে—ভাবনাগুলোরও আলাদা আলাদা অঞ্চল আছে—কিছু পূর্বের, কিছু পশ্চিমের; কিছু শুধু আরবদের, কিছু শুধু পাশ্চাত্যের জন্য।

কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে—এই মানুষটি তার নিজের মন থেকে এসব ভাবনা সৃষ্টি করেনি। এগুলো তার হৃদয়ের কথা নয়, বরং অন্য ভাষায় পড়া বা শোনা কিছু ভাবনা—যা তখনো সেই ভাষার পোশাকেই লেগে আছে।

আর যখন সে তা আরব পাঠকের সামনে উপস্থাপন করতে যায়—কিন্তু আরবি ভাষার আসল রীতি বা সৌন্দর্য তার আয়ত্তে নেই—তখন সে সেই ভাবনাকে তার আসল ভাষার পোশাক ছাড়াতে পারে না। তাই শুধু শব্দ বদলে, আরবি শব্দ বসিয়ে, সে যেন বোঝাতে চায়—এই ভাবনা তার নিজের; অথচ আসলে তা হয় ধার করা, বাহিরের, আর ভাষাগত সৌন্দর্য থেকে অনেক দূরে।

অথবা, সে একজন কৃপণ, যার নীচতা ও বিকৃত স্বভাব তাকে মানুষকে তার দান সহজ ও নির্বিচারে দিতে দেয় না—না তা আনন্দদায়কভাবে, না তা নির্মলভাবে; বরং সে তা কলুষিত করে তোলে বিলম্ব, অজুহাত, বিরত ও প্রতিরোধের দ্বারা।

আর কৃপণতা এমন এক স্বভাব, যা যদি কোনো মানুষের হৃদয়ে স্থান করে নেয়, তবে সে নিজেই তার ভেতরে ও বাহিরে—প্রত্যেক অনুভূতির উপর—এক সজাগ প্রহরী নিযুক্ত করে দেয়, যাতে কেউ তার ভেতর থেকে কোনো কৃত্রিম জিনিসও না পায়, কিংবা তার ভেতর থেকে কিছু নিঃসরণ হলেও সামান্য আঁচও না পায়।

সে যেমন তার অর্থে কৃপণ, তেমনি তার জ্ঞানেও। তার জিহ্বা যেমন নীরব, তার হাতও তেমনি রুদ্ধ। সে তার দান এমনভাবে বিলম্বিত করে, যাতে মানুষ সর্বদা তার মুখাপেক্ষী হয়ে থাকে—যেমন কেউ নিজের কুকুরকে অভুক্ত রাখে, যাতে কুকুরটি তার পিছু পিছু চলে।

আর আল্লাহর অভিসম্পাত, তাঁর ফেরেশতাদের এবং সমস্ত মানুষের অভিসম্পাত বর্ষিত হোক অক্ষম ও মূর্খদের, প্রতারক ও মিথ্যাবাদীদের, কৃপণ ও সংকীর্ণ হৃদয়ের মানুষের উপর।

আমার দৃষ্টিতে কবিদের মধ্যে শ্রেষ্ঠতম তিনি, লেখকদের মধ্যে সর্বোচ্চ আসনের যোগ্য তিনি—চিরকালীন বা সমকালীন, দীপ্তিমান বা নির্জনপ্রিয় যিনিই হোন—যিনি নিজ আত্মার অন্তঃসলিলে আলোড়িত বেদনার রং, অথবা প্রকৃতির মহাবিস্ময় রূপে মুগ্ধ চেতনার প্রতিচ্ছবি, এমন নিখুঁত ভঙ্গিতে তুলে ধরেন, যেন পাঠক তা স্বচক্ষে প্রত্যক্ষ করে; এমন স্পষ্টতায় রচনা করেন, যেন তা পাঠকের হৃদয়গ্রন্থিতে রেখে যান অনুভবযোগ্য এক অনুভূতির স্পন্দন।

কিন্তু আমার চেতনা যদি সংশয় অনুভব করে যে, লেখক যা লিখছেন তা তাঁর হৃদয়ের কথা নয়, বরং পরদৃশ্যের একটি অভিনয়; কিংবা তিনি অন্তরের গহন গভীর থেকে যা উদ্ভাসিত, তার অবিকৃত প্রতিরূপ তুলে ধরতে ব্যর্থ হয়েছেন; অথবা তিনি দুর্বল ভঙ্গির আড়ালে আত্মগোপনে প্রবৃত্ত, শব্দজালের অরণ্যে নিজ অপারগতা আড়াল করতে চেয়েছেন; অথবা লেখনীকে রূপ দিয়েছেন এক শুষ্ক থলি, যেখান থেকে তিনি তথ্য, ইতিহাস, শাস্ত্র ও পরিসংখ্যান করে শুধু ভরেছেন, প্রাণের সঞ্চার করেননি; কিংবা তিনি কেবল একজন অনুবাদক, পরভাষার চিন্তাকে নিজস্ব বলে পরিবেশন করছেন যেন তিনি সেই ভাবনারই স্রষ্টা। অথবা আমি মনে করি, তিনি শব্দচয়ন করছেন এই ভেবে, তা পাঠককে চমৎকৃত করবে, কৃত্রিম অলংকারে বিস্মিত করবে। তবে আমি স্বীকার করব, হ্যাঁ, তিনি জ্ঞানবান, তিনি মেধাসম্পন্ন, তাঁর উপলব্ধি সূক্ষ্ম ও তীক্ষ্ণ;  না, তবুও, আমি তাঁকে কবি বলব না, লেখক বলে মান্য করব না।

আমার দৃষ্টিতে প্রেমের শ্রেষ্ঠ কাব্য সেই, যা অন্তরলীন ভালোবাসার বেদনায় ক্ষতবিক্ষত এক হৃদয়ের আর্ত চিৎকারে রচিত; শোকের সর্বোচ্চ ভাষ্য সেই, যা সন্তানের শোকে শোকাচ্ছন্ন জননীর হৃদয়ফাটা কান্নায় গড়িয়ে পড়ে; প্রশংসার প্রকৃত মহিমা সেই, যা কৃতজ্ঞ চিত্তের গভীরতম অনুভব থেকে নিঃসৃত; উপদেশের পরম পরাকাষ্ঠা সেই, যা নিঃস্বার্থ হৃদয়ের অকপট মমতাবোধে জন্ম নেয়; অশ্রুর সত্য রূপ সেই, যা বিপর্যস্ত হৃদয়ের অন্তর্গত ব্যথা হয়ে অশ্রুপথে  ঝরে পড়ে; ব্যঙ্গের সত্যিকারের সার্থকতা সেই, যা মিথ্যার মুখোশ ছিঁড়ে ফেলার সাহসে পরিপূর্ণ; আর বর্ণনার শ্রেষ্ঠ শৈলী সেই, যা প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা, হৃদয়ের গভীরে প্রতিধ্বনিত চাক্ষুষ উপলব্ধি থেকে উৎসারিত।

আমি জানি না কেন—বা কী এক অজ্ঞাত মোহে—আমার পাঠকালে সবচেয়ে বেশি টান অনুভব করতাম দুঃখ-কষ্টের কবিতা, বেদনার্ত হৃদয়গুলোর আর্ত উচ্চারণ, নিরাশার গাঢ় ছায়ায় ঢেকে যাওয়া জীবনচিত্র, কিংবা বিপর্যস্ত, বিধ্বস্ত মানুষগুলোর কাহিনির প্রতি। এ সব ছিল আমার চোখে অপার মোহের উৎস; এমন মোহ, যা অন্তর বিদীর্ণ করে দুঃখে কাঁদিয়ে তুলত আমাকে, এমন কান্নায়, যা হৃদয়ের গভীরতম স্তর ছুঁয়ে যায়।

আমি কেঁদেছি যখন পড়েছি কীভাবে মুহালহাল তার ভাইয়ের হত্যার প্রতিশোধে মরুপ্রান্তরে উদভ্রান্তের মতো ছুটে বেড়িয়েছেন। কেঁদেছি ইমরুল কায়েস-এর বেদনায়, যে পিতার মৃত্যুর প্রতিশোধে নিজ যৌবনের সকল আনন্দ বিসর্জন দিয়েছেন। মন কেঁপে উঠেছে যখন পড়েছি জালিলার কান্না—যিনি একাধারে ছিলেন স্বামী কুলাইবের বিধবা এবং ভাই জাসাস এর বোন— এক দ্বিধাবিভক্ত আত্মার ক্ষতবিক্ষত রোদন। আমি অনুভব করেছি আদি ইবনু যায়েদ-এর অসহায় কান্না, যখন তিনি নিজেকে হারিয়ে খুঁজছিলেন আন নু’মান-এর কারাগারের একাকীত্বে। কিন্তু সবচেয়ে বেশি আঘাত পেয়েছি মুতাম্মিম ইবনু নুওয়াইরার আর্তনাদে—যিনি তাঁর ভাই মালিক-এর জন্য এমন করুণভাবে বিলাপ করেছেন যে তাঁর একচোখ, যা ছিল অন্ধ, সেখান থেকেও অশ্রু গড়িয়ে পড়েছে।

আমার চোখ সজল হয়ে উঠেছে লায়লা বিনতে তোরাইফ-এর কান্নায়, যিনি ভাই ওয়ালিদ-এর জন্য অনবরত অশ্রুপাত করেছিলেন।

হৃদয় ছিঁড়ে গেছে যখন পড়েছি উম্মে হাকীম-এর কাহিনি—যিনি ছিলেন উবাইদুল্লাহ ইবনু আব্বাস-এর স্ত্রী— যিনি হজের মৌসুমে মরুপ্রান্তরে বিলাপ করে ফিরে বেড়িয়েছেন, খুঁজেছেন তাঁর দুই শিশুপুত্রকে, যাদের জবাই করে হত্যা করা হয়েছিল।

আমি কেঁদেছি শরীফ-এর কান্নায়, যখন তিনি আল-মুনাযিরা জাতির জন্য ধ্বংসপ্রাপ্ত হীরা নগরীর ধ্বংসস্তূপে বসে বিলাপ করেছিলেন। কেঁদেছি আবু উবাদার আর্তনাদে, যিনি মাদাইন-এর ধ্বংসস্তূপে বসে পারস্যের রাজাদের স্মরণে চোখের জল ফেলেছেন।

বিদীর্ণ হৃদয়ে পড়েছি আর-রাদ্বি-এর বিলাপ বানু হাশিম-এর জন্য, আল-আবলির অশ্রু বনু উমাইয়া-র জন্য, আর-রুকাশির কান্না বানু বারমাক-এর জন্য।

আমার হৃদয় ভারাক্রান্ত হয়েছে আবু ফিরাস-এর বন্দিজীবনের লাঞ্ছনায়, এবং আল-মু’তামিদ ইবনু আব্বাদ-এর কারাজীবনের নির্মম চিত্র দেখে।

চলবে

 

অনুবাদক – মুদির, মাদরাসাতু ইকরা

Related Articles