নিজস্ব প্রতিবেদক ● হাওরাঞ্চলের বানভাসী মানুষদের অনেকেই তিন বেলার পরিবর্তে দুবেলা খেয়ে বেঁচে আছেন। চারপাশে শুধু পানি থাকায় মিলছে না কোনো সবজি। আলুই একমাত্র তাদের ভরসা। কারও কারও ঘরে আবার চাল না থাকায় ভাতের পরিবর্তে শুধু রুটি খাচ্ছেন। এমনচিত্রই উঠে এসেছে হাওরকেন্দ্রিক উন্নয়ন সংস্থাগুলোর জোট হাওর অ্যাডভোকেসি প্লাটফর্মের (হ্যাপ) সর্বশেষ গবেষণা প্রতিবেদনে। হ্যাপের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, উপদ্রুত এলাকার শিশুরা পুষ্টিকর খাবার পাচ্ছে না। কিশোরী ও গর্ভবতী নারীদের ভাগ্যেও জুটছে না কোনো পুষ্টিকর খাবার।
শুধু তাই নয়, খাদ্যাভাবে ওইসব এলাকায় ব্যাহত হচ্ছে শিক্ষাকার্যক্রম। প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে কমে গেছে শিক্ষার্থী উপস্থিতির হার। মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোতে উপস্থিতির হার কমেছে বালকদের। তাই বিদ্যালয়গুলোতে দুপুরের খাবার সরবরাহের দাবি ওই এলাকার মানুষের। কারণ তারা চান না তাদের ছেলে-মেয়েরা পড়ালেখায় পিছিয়ে পড়ুক। ফসলহারা মানুষ বাঁচার তাগিদে এলাকা ছাড়ছেন। তাদের ঘরে খাবার নাই, কাজও নাই। তাই হাওর এলাকাকে দুর্গত এলাকা ঘোষণা এবং ক্ষতিগ্রস্ত সবার জন্য রেশনিং ব্যবস্থা চালু করা প্রয়োজন। বিদ্যমান বাস্তবতা বলছে, হাওরের ফসল তলিয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ভেসে গেছে কৃষকের স্বপ্ন। পরিবারে নামে বিষাদের ছায়া। ধান বিক্রির টাকায় চাষাবাদের ঋণ, সারা বছর পরিবারের ব্যয়ভার বহন এখন তাদের পক্ষে দুষ্কর। বন্ধ হয়েছে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের ছেলে-মেয়েদের পড়ালেখা। নিজ এলাকায় বিকল্প কর্মসংস্থান না থাকায় কাজের সন্ধানে পার্শ্ববর্তী বিভিন্ন জেলা ও রাজধানীতে ছুটছেন এলাকার বেশির ভাগ মানুষ। স্থানীয় খোলা বাজারে বিক্রি হওয়া ওএমএসের চাল নিতে অভাবী মানুষের দীর্ঘ সারি। হাওর অ্যাডভোকেসি প্ল্যাটফর্মের সদস্য সচিব আনিসুল ইসলাম জানান, ওইসব এলাকার তিন শতাংশ সপরিবারে স্থানান্তরিত হয়েছে। সাত শতাংশ পরিবারের এক বা একাধিক পুরুষ সদস্য এলাকা ছেড়েছেন এবং ১২ ভাগ পরিবারের সদস্যরা কাজের খোঁজে অন্যত্র যাওয়ার জন্য পরিকল্পনা করছেন। আনিসুল ইসলাম আরও বলেন, ১৫টি গ্রামে আনুমানিক নয় হাজার ৭৫০টি হাঁস মারা গেছে বলে জানিয়েছেন গ্রামবাসীরা। যার মোট মূল্য প্রায় দুই কোটি ৯২ লাখ টাকা। গ্রামবাসীদের মতে মৃত মাছ খাওয়া ও দূষিত পানির কারণে হাঁসগুলো মারা যায়। প্রতিবছর কিছু হাঁস রোগাক্রান্ত হয়ে মারা গেলেও পানি দূষিত হয়ে এতো ব্যাপক হারে মৃত্যুর ঘটনা আগে কখনও হয়নি। অথচ সরকারিভাবে বলা হচ্ছে, মাত্র পাঁচ হাজার ৬৯২টি হাঁস মারা গেছে হাওরাঞ্চলে।
এদিকে সরকারি তথ্যে বিভ্রান্তি রয়েছে উল্লেখ করে হ্যাপ জানায়, হেক্টর প্রতি চাল উৎপাদনের ক্ষতি দেখাতে গিয়ে বিভিন্ন সরকারি দপ্তর তিন টন, তিন দশমিক ৪৫ টন, তিন দশমিক ৫৩ টন ব্যবহার করেছে। যদিও পূর্ববর্তী বছরে পরিসংখ্যান ব্যুরো এ হার উল্লেখ করেছিল, তিন দশমিক ৭৬ টন। এ ছাড়া ক্ষতিগ্রস্ত ফসলি এলাকা বা মাছের মড়ক পূর্ববর্তী সময়ের তুলনায় পরবর্তীতে কম দেখানোর প্রবণতাও লক্ষ্য করা গেছে। সাতটি জেলা থেকে প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী ক্ষতিগ্রস্ত জমির পরিমাণ তিন দশমিক ৮৫ লাখ হেক্টর, অথচ ছয়টি জেলার সমন্বিত তথ্যের ক্ষেত্রে সরকারের আরেকটি বিভাগ জানায় ক্ষতিগ্রস্ত জমি দুই দশমিক পাঁচ লাখ হেক্টর। সেখানে অবশ্য ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার তথ্য বাদ দেয়া হয়েছে। এবারের বন্যায় ওই অঞ্চলে ক্ষতির পরিমাণ প্রায় পাঁচ হাজার হেক্টর।


