এবি পার্টি: নতুন আয়নায় পুরানো চেহারা

এবি পার্টি: নতুন আয়নায় পুরানো চেহারা

এবি পার্টি: নতুন আয়নায় পুরানো চেহারা

মাওলানা আরিফ বিল্লাহ ❑ রাজবন্দী বেগম খালেদা জিয়ার জামিন লাভের পর পরই ভার্চুয়াল জগতে সাঈদী মুক্তির আওয়াজ জোড়েশোরেই উঠতে থাকে। পরিকল্পিত হোক আর অপরিকল্পিত হোক মুক্তির তামান্না প্রত্যেক বন্দীরই থাকে। অনুতপ্তের একটা বড় গুণ হলো- অনুশোচিত হলে আল্লাহ পাপরাশিকেও মুছে দেন।

পবিত্র কোরআনে সূরা আল ইমরানে আল্লাহ ইরশাদ করেন, ‘তিনি যাকে ইচ্ছা মাফ করেন, যাকে ইচ্ছা শাস্তি দেন। আল্লাহ অতি দয়ালু এবং ক্ষমাশীল।’ [সূরা আল ইমরান- ১৩৯] মানুষের হৃদয়েও দয়ার উদ্রেগ হয়। বাংলাদেশ জাতীয়বাদী দল বিএনপির পক্ষ থেকে অন্তত এইটুকু বলা হয়েছে যে, বেগম জিয়ার শারিরীক বিবেচনায় ও দুই বারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তাঁকে জামিন দেওয়া হোক। কিন্তু সাইদীর মুক্তির ব্যপারে তার দল বা পরিবার থেকে এমন কোন আবেদন করা হয়নি। ফলে সাঈদীর ব্যাপারে সরকারের দিলে রহমের বরফ গলেনি। কতিপয় আবেগ প্রবণ সরল মানুষের চোখে পানি এলেও সচেতন নাগরিকের মন বিন্দু মাত্রও টলেওনি।

এ বিজয় নিয়ে আমরা গৌরব করি বটে, আসলে এ হচ্ছে আমাদের ভুলের মাসুল দেয়া মাত্র।

বাঙালির দ্রুত ভুলে যাওয়ার রোগটা আমরা পৈতৃক সূত্রেই পেয়েছি। ১৮৫৭ সালের পলাশীর আম্রকাননে মীরজাফরের গাদ্দারী ভুলে আমরা ১৯৪৭ এ জিন্নার ‘ষ্টেট’ এ পা দিয়েছি। তখন হিন্দু-বৌদ্ধ দেশজ অনক্ষর-স্বাক্ষর মুসলিমরা তুর্কী-মুগল আমলে বিদেশাগত মুসলিমদের উর্দুভাষী দেতাদের নেতৃত্বে চির-চালিত হওয়ার ফলে তারা ছিল দেশ-কাল-ভাষা-সংস্কৃতি-আচার-আচরণ ও আর্থিক জীবন চেতনায় রিক্ত। ভৌগলিক অবস্থান ও অবস্থা অভেদে বিশ্ব ভ্রাতৃত্ববাদীও ছিল। তাই জিন্নার স্টেটস্-এর ‘স’ বাদ দেওয়ার প্রথম প্রতারণা বাঙালির মনে কোন প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেনি। এও স্বীকার করতে হবে যে, আমাদের আবেগবসে ‘ষ্টেটস্’ এর ‘স’ বাদ দেওয়ার সম্মতি দানের ফলেই আমাদের ভাষা-সংগ্রামের ও মুক্তি-সংগ্রামের প্রয়োজন দেখা দেয়। এ বিজয় নিয়ে আমরা গৌরব করি বটে, আসলে এ হচ্ছে আমাদের ভুলের মাসুল দেয়া মাত্র।

কেউ যদি সফেদ দাড়ি, উচুঁ টুপি, শুভ্র পাঞ্জাবীর কারণে আলেম মনে করে সাঈদী রাজাকারের মুক্তি চাইতে পারে; তাহলে ফেনীর নুসরাত হত্যা মামলায় আসামী সিরাজ উদদৌলাও একজন আলেম, তার মুক্তি কি আপনি চাইবেন? আসলে মানুষের ধর্ম হলো মানুষ যখন কোন বিষয়ে দূর্বল হয়ে পড়ে তখন সেই বিষয়টাকে সাম্প্রদায়িকতায় জড়াতে থাকে। ধর্মীয় রং মেশাতে থাকে। ৭১ এর আগে সাঈদীর পরিচয় মাওলানা হিসেবে ছিলোনা। ছিলো দেইল্যা বা দেলু রাজাকার নামে। সুবিধাভোগি জিন্নাহর কথিত ইসলামী প্রজাতন্ত্রের ছায়াতলে থাকার জন্য পাকিস্তান পক্ষী হয়ে ধর্মীয় লেবাসে মুক্তিকামী মানুষের উপর নিষ্ঠুর নির্যাতন চালিয়েছে। ইতিহাসে তারা দেইল্যা বা দেলু রাজাকার ও কাদের কসাই নামে পরিচিত। সবচেয়ে লজ্জার ও ক্ষোভের বিষয় হলো ৭১ এর নৃশংসতার সময়কালে বাংলাদেশের কতিপয় বুদ্ধিজীবিদের নামের তালিকা পাকিস্থানের হানাদার বাহিনীর হাতে দিয়েছিলো এদেশেরই একদল কুলাঙ্গার দেশদ্রোহী জামায়াতী নেতা-কর্মীরা।

জামায়াতের প্রতিষ্ঠাতা নেতা মিষ্টার আবুল আলা মওদুদীর হাতও রাঙা ছিলো লাহোরের কাদিয়ানী বিরোধী দাঙ্গায় নিহত হাজার মানুষের রক্তে।

এমনকি গভীর রাতে তালিকাভক্ত বুদ্ধিজীবিদের তুলে নিয়ে হানাদার কসাইদের হাতে সমর্পনের কাজটি করেছে জামায়াত এবং তাদের সৃষ্ট রাজাকার, আশ্ শামস ও আল বদরের দল। এরা শুধু দেশের সেরা মাথা ও মস্তিষ্ককে হত্যা করেনি তারা স্বজাতি ও স্বধর্মের মানুষের রক্তে হান রাঙিয়েছে। জামায়াতের প্রতিষ্ঠাতা নেতা মিষ্টার আবুল আলা মওদুদীর হাতও রাঙা ছিলো লাহোরের কাদিয়ানী বিরোধী দাঙ্গায় নিহত হাজার মানুষের রক্তে। বর্তমানে ৭১ এ কুকীর্তিমান তার দলটি সর্ব মহলে কোণঠাসা হয়ে আছে। ইসলামের লেবাসে দুস্কৃতিকারী নেতাদের জেল ফাসিঁ হয়েছে। এর পরও তারা অনুশোচিত হয়নি। ব্যক্তিও না দলেও না। ফলে আঠারো কোটি হৃদয়ে তাদের প্রতি ক্ষোভ আর ঘৃণা জন্মেছে। দেরিতে হলেও জনতার জনক্ষোভ প্রশমিত করতে পুরনো শয়তানের চেলারা নতুন নামে আত্ম পরিচয় দিয়েছে।

জিন্নাহর তেলেসমতি রপ্ত করা পাকিস্তানের বোগল তলার কিছু নতুন চেহারা এবি পার্টি নামে সোনার বাংলায় আবারো জেঁকে বসতে যাচ্চে। ৭১ এর স্বাধীনতার পর জামায়াতে ইসলামী এদেশে সাঈদীর ক্যাসেট বাজিয়ে বাঙলার গরীব মানুষের ধর্মীয় অনুরাগকে নিজেদের পকেটস্থ করেছে। বর্তমানে এবি পার্টি এ কাজটি করতে চাচ্ছে মিষ্টার মাও. আজহারীকে দিয়ে। ইতিমধ্যে তারা আজহারীকে দিয়ে বাংলার ধর্মীয় মাঠকে উর্বর করে ফেলেছে। তাই সচেতন হতে হবে আলেম সমাজকে। প্রতিবাদী হতে হবে আজহারীর মুখরোচক ব্যাখ্যার ব্যপারে। অচিরেই হয়তো আজহারী গংরা হাওয়া তুলবে এবি পার্টির মাস্তুলে।

লেখক: শিক্ষক ও প্রাবন্ধিক

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *