মওদুদির সাথে আইএস-এর সংযোগটা কোথায়?
ফয়জুল্লাহ আমান ❑ মাওলানা মওদুদি প্রথাগত কোনো মাদরাসায় না পড়লেও মাওলানা হিসেবেই মশহুর। জন্ম ১৯০৩ সাল। মৃত্যু ১৯৭৯ ইং। বিগত শতকে সবচেয়ে বিতর্কিত ও আলোচিত এক চিন্তাবিদ হচ্ছেন মাওলানা মওদুদি। ইসলাম নিয়েই তার কাজ। দুই হাতে কলম চালিয়েছেন। অসংখ্য পুস্তক লিখেছেন। সংগঠন গড়েছেন। বক্তৃতা দিয়েছেন এবং বিভিন্ন বিষয়ে তার গবেষণাপত্র প্রকাশ পেয়েছে। তাফসীর হাদীস ও ফতোয়া কোনো কিছুতেই পিছিয়ে নেই তিনি। ভারতের হায়দারাবাদে তার জন্ম ও বেড়ে ওঠা। ১৬ বছর বয়সে দিল্লি আসেন। এখানেই ধীরে ধীরে তিনি লেখক হয়ে ওঠেন। প্রচুর পড়াশোনা করেন এবং এক সময় একজন প্রখ্যাত ব্যক্তি হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার সুযোগ পান।
মাওলানা মওদুদিকে নিয়ে দু ধরনের বক্তব্যই পাওয়া যায়। একদল তাকে যুগের মুজাদ্দিদ এবং রাসূল সা.-এর পর শ্রেষ্ঠ মানুষ বলে দাবি করেন। আধুনিক যুগের শ্রেষ্ঠ মনীষী হিসেবে উল্লেখ করেন। আরেক দল তাকে সাম্রাজ্যবাদী ইংরেজদের দালাল এবং আমেরিকার পেইড এজেন্ট ইত্যাদি অভিধায় অভিহিত করেন। আসলে তিনি কী? পাঠকদের সামনে আমরা চেষ্টা করব তার মূল অবস্থাটা তুলে ধরতে।
ইংরেজ আমলের মুসলিমদের একটা অংশকে তিনি খুব সহজেই কাছে টানতে পেরেছিলেন।
যারা তাকে সাহাবিদের চেয়েও শ্রেষ্ঠ মনে করেন তারা যে অতিরঞ্জন করছেন তাতে কোনো সন্দেহ নেই। মূলত মাওলানা মওদুদির লেখা বই পুস্তক সাধারণ পাঠককে খুব আকর্ষণ করত। বিশেষত সেসময়ের প্রেক্ষাপটে তিনি তানকিহাত ও তাফহীমাত গ্রন্থদ্বয়ে সংকলিত যেসব প্রবন্ধ লিখেছেন তাতে সাধারণ ধার্মিকদের জন্য জরুরি অনেক বিষয় থাকত। ইংরেজ আমলের মুসলিমদের একটা অংশকে তিনি খুব সহজেই কাছে টানতে পেরেছিলেন।
সে সময়ে বিশ্বে অনেক বড় বড় আলেম ছিলেন। মাওলানা আশরাফ আলি থানভি, মাওলানা হুসাইন আহমাদ মাদানী, মাওলানা সুলাইমান নদভী, মাওলানা আবুল কালাম আযাদ ও আরও অসংখ্য কিংবন্তীতুল্য মনীষী।
মাওলানা মওদুদির সাথে তাদের পার্থক্য কোথায়? কেন অন্য আলেমরা সবাই তার বিরোধিতা করলেন? এমনকি তার এক সময়ের বন্ধু মাওলানা আবুল হাসান আলি নদভী ও মাওলানা মনজুর নুমানি সবাই তাকে পরিত্যাগ করেন। কিন্তু কেন? নিশ্চয়ই তার ভেতর এমন কিছু দেখেছেন যা ইসলামের সঠিক শিক্ষার সাথে সংগতিপূর্ণ নয়।
মাওলানা মওদুদিকে যারা ভালোবাসেন তারা বলবেন, মওদুদি সাহেবের চিন্তাটা তারা বুঝতে পারেননি তাই তারা দূরে সরে গিয়ে সমালোচনা শুরু করেছেন। আচ্ছা তার চিন্তা তারা বুঝতে পারেননি কিন্তু এখন তো খোলা পাতার মত সব আমাদের সামনেই আছে। আমাদেরই তার বই পুস্তক খুলে দেখা উচিত। যা দেখা যায়, তার ইসলাম চর্চার ধারাটার ভেতর মোটা দাগে একটা গলদ রয়েছে। আর তা হচ্ছে ইসলামের যে কোমল দিকটা আছে তা পুরোপুরি ঢেকে গেছে মওদূদি সাহেবের দর্শনে। ইসলাম ধর্মের অনেক সুন্দর দিক তিনি তুলে ধরেছেন কিন্তু সাথে ইসলামকে একটা কঠোরতার ধর্ম বলে প্রকাশ করেছেন বিভিন্ন কৌশলে। এটা যে তিনি সাম্রাজ্যবাদীদের সঙ্গে আঁতাত করেই করেছেন এমন জরুরি নয়। এভাবে না দেখে আমাদের তার প্রতি সুধারণা রাখা উচিত। মূলত তার গবেষণার ধরণটাই এমন ছিল। মানসিকতার কারণে তার লেখাতে এর স্পষ্ট ছাপ পড়েছে। নতুন নতুন গবেষণায় এর রং পরিলক্ষিত হয়েছে। তাওহিদে হাকিমিয়্যা বলে তাওহিদের একটি প্রকার তিনি আবিষ্কার করেছেন।
ইনিল হুকমু ইল্লা লিল্লাহ। কুরআনের এ আয়াতের ব্যাখ্যায় ইসলামি স্টেটের ধারণা তিনিই উপস্থাপন করেন।
তিনি নিজে কোনো জঙ্গিবাদে জড়িত ছিলেন না। তার মৃত্যুর পরে বর্তমানের উগ্রবাদের প্রসার হতে থাকে। যতদিন তিনি বেঁচে ছিলেন ততদিন পৃথিবীতে আধুনিক উগ্রবাদের প্রসার ঘটেনি। কিন্তু এই বিশ্বজোড়ে আতঙ্কবাদের মূল যদি খোঁজা হয় তাহলে মওদূদি লিটারেচারে রয়েছে। ইনিল হুকমু ইল্লা লিল্লাহ। কুরআনের এ আয়াতের ব্যাখ্যায় ইসলামি স্টেটের ধারণা তিনিই উপস্থাপন করেন।
ইসলামি স্টেটের এ ধারণা আবু বকর বাগদাদিরা সরাসরি যে মওদুদি থেকে পেয়েছেন তা নয়। ইসলামের প্রথম যুগ সেই চল্লিশ হিজরি সনেই খারেজি সম্প্রদায়ের আবির্ভাব। তাদের ধারাবাহিকতায় এই চেতনা আরবের মুহাম্মাদ ইবন আব্দুল ওয়াহাব ও তার অনুসারীদের কাছে পৌঁছে। কিন্তু এটাকে বর্তমান রূপ দেওয়ার পেছনে মাওলানা মওদুদির অসামান্য অবদান রয়েছে। মওদুদি সাহেবের কাছ থেকেই মিসরের ইখওয়ান নেত সায়্যিদ কুতুব পেয়েছেন এদর্শন। সে হিসেবে বিগত শতকে এ ধারার নেতা বলা যায় মওদূদিকেই।
বিংশ শতকের আশির দশকে সারা বিশ্বে উগ্রবাদি বিভিন্ন সংগঠন মাথা চাড়া দিয়ে উঠতে থাকে। মাওলানা মওদূদির মৃত্যুর চল্লিশ বছর পার হয়ে গেছে। এসময় সিরিয়া ইরাক জর্ডান ও ইউরোপ আমেরিকায় যাদের তথ্য আমাদের কাছে এসেছে দেখা যায় তাদের প্রত্যেকেই সায়্যিদ কুতুবের ভক্ত। আর সায়্যিদ কুতুব মূল চিন্তাটা আত্মস্থ করেছিলেন মওদুদি সাহেবের বই থেকে। সে হিসেবে দেখা যাচ্ছে সিরিয়ার সদ্য বিলুপ্ত আই এসের সাথে মওদুদির সংযোগ অমূলক কিছু নয়।
সিরিয়া ও ইরাক থেকে বিলুপ্ত হলেও পৃথিবীর অপরাপর অঞ্চলে এখনও শংকা কাটেনি। এখনই এসব বিষয় নিয়ে আমাদের সমাজে সচেতনতা সৃষ্টি জরুরি হয়ে দাঁড়িয়েছে। করোনা ভাইরাসের মতই এসব উদভ্রান্ত চিন্তা সংক্রমিত হয়ে পুরো বিশ্বের জন্যই ভয়াবহ পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে পারে। আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা আমাদের সবাইকে সঠিক বুঝ দান করেন এবং সব ধরনের বিভ্রান্তি থেকে সচেতন থাকার তাওফিক দেন। আমীন।
লেখক: শিক্ষক, প্রাবন্ধিক ও সমাজ বিশ্লেষক


