ইতিকাফ: পূণ্যময় রজনীর খোঁজে
মুফতী তামীমুল ইসলাম ফরিদী : ইতিকাফ আরবী শব্দ। আভিধানিক অর্থে ইতিকাফ হলো, অবস্থান করা, কোন স্থানে নিজেকে আবদ্ধ রাখা। শরীয়তের পরিভাষায় ইতকিাফ হলো, ইবাদত ও সওয়াবের উদ্দেশ্যে, পুরুষের জন্য মসজিদে এবং মহিলাদের জন্য আপন ঘরে নামাযের জায়গায় অবস্থান করা।
ইতিকাফ এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত যার প্রচলন ইসলামের বহু পূর্ব থেকেই রয়েছে। নামায ও অন্যান্য ইবাদতের সাথে সাথে আল্লাহ তায়ালা হযরত ইবরাহীম আ. ও হযরত ইসমাঈল আ.-কে ইতাকাফকারীদের জন্য বাতুল্লাহকে পবিত্র করার নির্দেশ দিয়েছেন।
মহান আল্লাহ পাক রাব্বুল আলামীন পবিত্র কুরআনে কারীমে ইরশাদ করেন, ‘আর আমি ইবরাহীম ও ইসামাঈলকে আদেশ করলাম তোমরা আমার ঘরকে (কা’বাঘর) তাওয়াফকারী, ইতিকাফকারী ও রুকু-সেজদাকারীদের জন্য পবিত্র রাখ।’ (সূরা বাকারা ১২৫)
রমযানের শেষ দশকে ইতিকাফ ও তার ফযিলত: রমযানের বিশ তারিখের সূর্যাস্ত থেকে ঈদের চাঁদ ওঠা পর্যন্ত ইতিকাফ করাকে ইতিকাফে মাসনূন বলা হয়। হাদীস শরীফে আছে, ‘নবী কারীম সা. রমযানের শেষ দশ দিন ইতিকাফ করতেন।’ (সহীহ বুখারী : ২০২১)
মাহে রমযানে ইতিকাফ করা একটি তাৎপর্যময় গুরুত্বপূর্ণ আমল। রমযানের ফযীলত, বরকত এবং বিশেষত লাইলাতুল কদরের ফযীলত ও বরকত পাওয়ার জন্য ইতিকাফের গুরুত্ব অপরিসীম। নবী কারীম সা. তাঁর মাদানী জীবনে মাত্র একটি রমযানে জিহাদের সফরের কারণে ইতিকাফ করতে পারেননি। তবে পরবর্তী বছর ২০ দিন ইতিকাফ করে তা পূরণ করে নিয়েছেন। এ ছাড়া তিনি সবকটি ইতিকাফ করেছেন। সাহাবীগণও তাঁর সাথে ইতিকাফে শরীক হতেন। তাই ইতিকাফ একটি মর্যাদাপূর্ণ মাসনূন আমল যা ‘শেয়ারে ইসলাম’ ও (ইসলামের নিদর্শন) বটে। এমনকি কোন মসজিদ ইতিকাফশূন্য থাকলে পুরো এলাকাবাসী সুন্নতে মুআক্কাদা বর্জনের কারণে গুনাহগার হবে।
হাদীস শরীফে এসেছে, ‘আমাদের নবী কারীম সা. প্রত্যেক রমযানে দশ দিন ইতিকাফ করতেন। তবে ওফাতের বছর বিশ দিন ইতিকাফ করেছেন।’ (সহীহ বুখারী ২০৪৪)
ইতিকাফের ফযিলত সম্পর্কে হাদীসের ভাষ্য নিম্নরূপ: যে ব্যক্তি আল্লাহ তায়ালার সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে এক দিন ইতিকাফ করবে আল্লাহ তায়ালা তার এবং জাহান্নামের মাঝে তিন খন্দক দূরত্ব সৃষ্টি করে দিবেন। অর্থাৎ আসমান ও জমিনের মাঝে যত দূরত্ব আছে তার চেয়েও বেশি দূরত্ব সৃষ্টি করে দিবেন। (শুআবুল ঈমান ৩৯৬৫)
রমজানের শেষ দশকে ইতিকাফের উপকারিতা: মহিমান্বিত শবে কদরের ফজিলত অন্বেষণের অন্যতম মাধ্যম হল ইতিকাফ। হাদীস শরীফে এসেছে, ‘নবী কারীম সা. রমযানের মাঝের দশ দিন ইতিকাফ করতেন। এক বছর এভাবে ইতকাফ শেষ করার পর যখন রমযানের ২১তম রাত আসল (অর্থাৎ যে রাত গিয়ে সকালে তিনি ইতিকাফ থেকে বের হবেন) তিনি ঘোষণা করলেন, যে ব্যক্তি আমার সাথে ইতিকাফ করেছে সে যেন শেষ দশকে ইতিকাফ করে। কারণ আমাকে শবে কদর সম্পর্কে অবগত করা হয়েছিল (যে তা শেষ দশকের ওমুক রাত) এরপর তা ভুলিয়ে দেওয়া হয়েছে। সুতরাং তোমরা শবে কদর শেষ দশকে খোঁজ কর।’ (সহীহ বুখারী ২০২৭)
ইতিকাফকারী অবসর সময়ে কোন আমল না করলেও তার দিনরাত ২৪ ঘণ্টা ইবাদত হিসাবেই গণ্য হয়। ইতিকাফের বদৌলতে অনেক গুনাহ থেকে বেঁচে থাকা যায়। পাপাচারের সয়লাব থেকে বেঁচে থাকার জন্য আল্লাহ তায়ালার ঘর যেন একটি প্রকৃত দূর্গ।
ইতিকাফ দ্বারা দুনিয়ার বহু ঝামেলা থেকে মুক্ত করে নিজেকে পুরোপুরি আল্লাহ তায়ালার কাছে সঁপে দেওয়া হয়। রোযার কারণে পুরো দিন ফেরেশতাদের সাথে (পানাহার ও যৌন কর্ম বর্জন দ্বারা) সামঞ্জস্য হয়। আর ইতিকাফের দ্বারা ২৪ ঘণ্টা ফেরেশতাসূলভ আচরণের উপর অবিচল থাকার চমৎকার প্রশিক্ষণ হাসিল হয়।
রোযার যাবতীয় আদব ও হক যথাযথ আদায় করে পরিপূর্ণ রোযা আদায় করার জন্য ইতিকাফ যথেষ্ট সহায়ক হয়। আল্লাহ তায়ালার মেহমান হয়ে তাঁর সাথে মহব্বত ও ভালবাসা সৃষ্টি করার অন্যতম মাধ্যম ইতিকাফ। রাব্বে কারীমের সাথে নিবিড় সম্পর্ক স্থাপনের জন্য ইতিকাফ একটি অপরিহার্য আমল। মসজিদে অবস্থান করার কারণে ইতিকাফকারী যে সকল আমল করতে অক্ষম যেমন জানাযায় শরীক হওয়া, অসুস্থদের সেবা করা ইত্যাদি- এ সব আমল না করেও তার সওয়াব পেতে থাকা।
সুপ্রিয় পাঠকগণ! করোনা ভাইরাসের এই বৈশ্বিক বিপর্যয়ের মধ্যে আমরা আমাদের ঘরেই অলস সময় (প্রবাদ আছে যে অলস মস্তিষ্ক শয়তানের কারখানা) পার করছি। আসুন আমরা আমাদের পারস্পরিক সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে এই অলস সময়টুকু রমজানের শেষ দশকের মহিমান্বিত আমল ইতিকাফে শরীক হয়ে বিপুল পূণ্যের অধিকারী হতে পারি। গড়তে পারি রাব্বে কারীমের সাথে সুনিবিড় সম্পর্ক। আল্লাহ পাক রাব্বুল আলামীন আমাদের সকলকে তাওফিক দান করুন। আমীন।
লেখক: মুহতামীম ও সুবক্তা


