এই সময়। মীর মোহাম্মদ আসলাম উদ্দিন
এলএনজি আমদানি : সরকারের একটি দূরদর্শী সিদ্ধান্ত
জ্বালানি একটি দেশের আর্থসামাজিক উন্নয়নের অন্যমত চালিকাশক্তি। দারিদ্র্য বিমোচন এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক উন্নয়নে জ্বালানির ভূমিকা অপরিসীম। বাংলাদেশের প্রধানতম প্রাথমিক ও বাণিজ্যিক জ্বালানি উৎস প্রাকৃতিক গ্যাস। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান-এর বলিষ্ঠ নেতৃত্বে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার ব্রিটিশ তেল কোম্পানি শেল ওয়েল-এর কাছ থেকে নামমাত্র মূল্যে ৫টি গ্যাসক্ষেত্র ক্রয় করে দেশের স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ের জ্বালানি নিরাপত্তা প্রদান করেন।
সরকার দেশের বিদ্যমান গ্যাসের ঘাটতি ও ক্রমবর্ধমান চাহিদা মেটাতে এবং জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিতকল্পে এলএনজি আমদানির সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট ২০৩০ এবং রপকল্প ২০২১ ও ২০৪১ অর্জনে সরকারের নির্দেশনা মোতাবেক আরপিজিসিএল যথাযথ কার্যক্রমের মাধ্যমে দেশে এলএনজি টার্মিনাল (ভাসমান ও স্থলভিত্তিক) স্থাপনসহ এলএনজি সংক্রান্ত কার্যাবলি বাস্তবায়নের পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে।
কক্সবাজারের মহেশখালীতে ৫০০ এমএমএসসিএফডি ক্ষমতা সম্পন্ন একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের জন্য গত ১৮ জুলাই, ২০১৬ জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ, পেট্রোবাংলা ও EEBL এর মধ্যে চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। বর্ণিত ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের সামগ্রিক কার্যক্রম সম্পন্নের পর গত ১৯ আগস্ট ২০১৮ হতে বাণিজ্যিকভাবে জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে। কক্সবাজারের মহেশখালীতে ৫০০ এমএমসিএফডি ক্ষমতা সম্পন্ন ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের নিমিত্ত গত ২০ এপ্রিল ২০১৭ তারিখ জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ, পেট্রোবাংলা ও Summit LNG Terminal Co. (Pvt.) Ltd. এর মধ্যে চুক্তি স্বাক্ষরিত হয় । বর্ণিত ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের সামগ্রিক কার্যক্রম সম্পন্নের পর গত ৩০ এপ্রিল ২০১৯ থেকে বাণিজ্যিকভাবে জাতীয় গ্রীডে RLNG (Re-Gasification Liquefied Natural Gas) সরবরাহ করা হচ্ছে।
এলএনজি আমদানির লক্ষ্যে গত ২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৭ কাতারের Ras Laffan Liquefied Gas Company Ltd. (3) এর সাথে পেট্রোবাংলার বার্ষিক ১.৮-২.৫ মিলিয়ন টন হারে ১৫ বছর মেয়াদে G to G ভিত্তিতে এলএনজি আমদানি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এছাড়াও গত ০৬ মে ২০১৮ তারিখে Oman Trading International (OTI) এর সাথে পেট্রোবাংলার বার্ষিক ১.০-১.৫ মিলিয়ন টন হারে ১০ বছর মেয়াদে G to G ভিত্তিতে এলএনজি আমদানি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।
কাতারের Ras Laffan Liquefied Gas Company Ltd. (3) ও Oman Trading International (OTI) হতে শুরু থেকে ৩১ ডিসেম্বর ২০১৯ পর্যন্ত ৭৩ টি এলএনজি কার্গোর মাধ্যমে ৪.৫৩ মিলিয়ন টন এলএনজি আমদানি করা হয়েছে। EEBL ও Summit কর্তৃক স্থাপিত দুটি FSRU (Floating Storage Regasification Unit) হতে শুরু থেকে ৩১ ডিসেম্বর ২০১৯ পর্যন্ত ২,১৭,৮০১ মিলিয়ন ঘন ফুট আরএলএনজি/গ্যাস জাতীয় গ্রীডে সরবরাহ করা হয়েছে। বর্তমানে প্রতিদিন প্রায় ৬০০ মিলিয়ন ঘন ফুট আরএলএনজি/গ্যাস জাতীয় গ্রীডে সরবরাহ করা হচ্ছে।
২০২৪ সাল নাগাদ কক্সবাজারের মাতারবাড়িতে একটি ১০০০ এমএমসিএফডি ক্ষমতা সম্পন্ন Land Based LNG Terminal নির্মানের লক্ষ্যে টার্মিনাল ডেভলপার নির্বাচনের জন্য EOI আহ্বান করা হয়েছে এবং টার্মিনাল ডেভলপার নির্বাচনের প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। বর্ণিত Land Based LNG Terminal নির্মাণের লক্ষ্যে কক্সবাজারের মাতারবাড়িতে প্রায় ৪৫ হেক্টর জমি অধিগ্রহণের কার্যক্রম চলমান রয়েছে। Feasibility Study সম্পাদনের জন্য Consulting Firm নিয়োগের প্রক্রিয়া চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে।
বর্তমান সরকার ২০৪১ সালে দেশকে উন্নত দেশে পরিণত করার বিষয়ে প্রতিটি খাতে মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। বিদ্যুৎখাতের উন্নয়নের মাধ্যমে দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন করা সম্ভব হবে। সেক্ষেত্রে প্রচুর পরিমাণ গ্যাস সরবরাহের প্রয়োজন হবে। বিদ্যুৎ বিভাগ কর্তৃক ২০৩০ সালে ৪০ হাজার মেগাওয়াট ২০৪১ সালে বিদ্যুৎ উৎপাদন ৬০ হাজার মেগাওয়াট এবং এর লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে ২০৪১ সালে ২১ হাজার মেগাওয়াট এবং ২০৩০ সালে ১১ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এর জন্য মোট গ্যাসের চাহিদা হবে ২০৪১ সালে ৩০০০ এমএমসিএফডি যার প্রায় ৫০% নিজস্ব উৎস থেকে এবং বাকী চাহিদা এলএনজি আমদানির মাধ্যমে পূরণ করা হবে।
২০৪১ সালে বাংলাদেশকে একটি উন্নত দেশে উন্নীত করতে হলে সকল উন্নয়ন কার্যক্রমের নেপথ্যে থাকবে জ্বালানি এবং জ্বালানির অন্যতম নিয়ামক হবে গ্যাস। তাই গ্যাসের সরবরাহ অবিরত রাখতে পরিকল্পনা বাস্তবায়নে তৎপর হওয়া সময়ের দাবি।
লেখক : কলামিস্ট
১৯.০১.২০২০


