কোমলমতি শিক্ষার্থী ও বই বিতরণ

কোমলমতি শিক্ষার্থী ও বই বিতরণ

ফিরে দেখা । তিশা মণ্ডল

কোমলমতি শিক্ষার্থী ও বই বিতরণ

মেয়েটির নাম স্বপ্না। বয়স ৮ বছর। তৃতীয় শ্রেণির প্রাথমিক বিদ্যালয় বার্ষিক পরীক্ষা শেষ করে ঢাকায় ঘুরতে আসে। স্বপ্নার বাবামা ঢাকায় গার্মেন্টসে চাকুরি করে। সন্তানদের কাছে রেখে পড়াশুনা করার মতো তাদের সক্ষমতা নেই বললেই চলে। দুই বোন এক ভাইয়ের মধ্যে স্বপ্না মেঝো। স্বপ্না’র বার্ষিক পরীক্ষা শেষ হয়েছে জেনে তার বাবা গ্রাম থেকে ঢাকায় কিছুদিন থাকার জন্য সন্তানদের আনতে যান। কিছুতেই তারা বাবামার সাথে ঢাকায় আসতে সম্মত নয়। কারণ জানতে চাওয়া হলে স্বপ্না বলে আর অল্প কিছুদিন আছে আমাদের বিদ্যালয় থেকে বছরের প্রথম দিনই অর্থাৎ জানুয়ারি ১ তারিখে আমাদের বিনামূল্যে নতুন বই দিবে। সেদিনের জন্য অপেক্ষা করছি, সেদিন আমাদের বিদ্যালয়ে যেতেই হবে, যেতেই হবে।

স্বপ্নার বড়ো বোন এবার প্রাথমিক সমাপনী পরীক্ষায় অংশ নেয়। একই সুরে কথা বলে স্বপ্নার বড়ো বোনও। তাদের সংশয় হলো ঢাকায় আসলে যদি জানুয়ারি ১ তারিখের পূর্বেই গ্রামের বাড়িতে ফেরতে না পারে তাহলে তাদের নতুন বই পাওয়ার যে আকাক্সক্ষা সেটা থেকে বঞ্চিত হতে পারে। নতুন বই পাওয়ার জন্য তারা যে অপেক্ষার প্রহর গুনতেছিল, ঢাকায় আসলে সেটা হয়তো বিফলে যেতে পারে। এ সঙ্কা থেকেই তারা ঢাকায় আসতে নারাজ ছিল। বাবা-মা অনেক বুঝিয়ে সুঝিয়ে ঢাকায় আনেন। কিন্তু ঢাকায় এসে তাদের আর মন টিকছে না। তারা কখন গ্রামের বাড়িরতে যাবে কখন ১ জানুয়ারি আসবে, নতুন বই পাবে, নতুন বইয়ের গন্ধ নেবে, প্রতিটি পাতায় পাতায় উল্টিয়েপাল্টিয়ে দেখবে সে কল্পনায় বিভুর।

শিক্ষার্থীরা নতুন বই হাতে পেয়ে আনন্দে আত্মহারা হয়ে যায়। নতুন বইয়ের গন্ধ ছড়িয়ে পরে সারাদেশে। শিক্ষার্থীদের বাধভাঙ্গা উল্লাসে মুখরিত হয়ে উঠে বিদ্যাপীঠ। শিশুদের বইয়ের প্রতি মনোযোগ আকর্ষণের জন্য চার রঙের নতুন বই সরবরাহ করা হয়। প্রাথমিক স্তরে ঝকঝকে চাররঙা নতুন বই পেয়ে শিশুরা উল্টেপাল্টে দেখে কী কী আছে এর ভিতরে। বুকে চেপে ধরে প্রাণখোলা হাসিতে দৌড়াদৌরি আর ছুটাছুটিতে মগ্ন থাকে কখন বাড়িতে গিয়ে আরও একান্তে প্রত্যেক বইয়ে প্রতি পাতায় পাতায় ভাঁজে ভাঁজে হাত বুলানো যায়। সত্যিকারার্থে দিনটি যেন আনন্দের পরিপূর্ণ উৎসবে পরিণত হয়।

মানুষের মৌলিক অধিকারের মধ্যে শিক্ষা অন্যতম । শিক্ষা জাতির মেরুদন্ড। যে জাতি যত বেশি শিক্ষিত সে তত বেশি উন্নত। একটি জাতির ভবিষ্যৎ বির্নিমাণে শিক্ষাকে অগ্রাধিকার দিতে হয়। এ বিষয়টিকে মাথায় রেখে বর্তমান সরকার বিশ্বের মধ্যে এক অনন্য নজির স্থাপন করেছে, শিশুদের হাতে বছরের প্রথম দিনই বিনামূল্যে নতুন বই তোলা দেওয়া । উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে পৃথিবীর ইতিহাসে অত্যন্ত বিরল কার্যক্রম। যদিও আমরা সরকারের নানামুখী সক্রিয় কার্যক্রমের জন্য আজ আমরা উন্নয়নশীল দেশের উত্তরণ ঘটিয়ে একটি মধ্য আয়ের দেশে প্রবেশ করেছি। আমাদের প্রত্যাশা রূপকল্প: ২০৪১ বাস্তবায়নের মধ্যে দিয়ে দক্ষিণ এশিয়াই বাংলাদেশ হবে একটি উন্নত, সমৃদ্ধ দেশের মধ্যে অন্যতম।

গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের একটি যুগান্তকারী ও সাহসী পদক্ষেপ হলো দেশের বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীদের মাঝে বিনামূল্যে নতুন বই বিতরণ। প্রতি বছর প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে বিনামূল্যে নতুন বই বিতরন করা হয়। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নেতৃত্ব গঠনের পর ২০১০ সাল থেকে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে শিক্ষার্থীদের মাঝে একযোগে বিনামূল্যে পাঠ্যপুস্তক ও আনুসঙ্গিক শিক্ষা উপকরণ বিতরণ করা হয়। এ কার্যক্রম বিশ্বদবারে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।

একবিংশ শতাব্দীর চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে সক্ষম একটি সুশিক্ষিত আত্মপ্রত্যয়ী ও বিজ্ঞানমনস্ক জনগোষ্ঠী তৈরি করার লক্ষ্যে সরকার শিক্ষাখাতকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার প্রদান করে ব্যাপক কার্যক্রম গ্রহণ করেছে। রূপকল্প:২০২১ এবং ডিজিটাল বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে যুগোপযোগি ও কর্মমুখী শিক্ষা প্রবর্তনের পদক্ষেপ হিসেবে জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০ প্রণীত হয়েছে। এই শিক্ষা নীতির মূল উদ্দেশ্য হলো মানবতার বিকাশ, জনমুখী উন্নয়নে ও প্রগতিতে নেতৃত্বদানের উপযোগী মননশীল, যুক্তিবাদী, নীতিবান, নিজের এবং অন্যেরধর্মের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকা।

বর্তমান সরকার টানা তৃতীয় মেয়াদে ২০১০ সাল থেকে শুরু করে ২০২০ পর্যন্ত ১১ বছরে প্রাথমিক, এবতেদায়ী, মাধ্যমিক, মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের মাঝে মোট ৩০০ কোটি ৩৬ লাখ ৪১ হাজার ৩৭০টি বই বিতরণ করেছে। জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি) থেকে জানা যায় সম্পূর্ণ দেশীয় মুদ্রণ প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে এবার বইগুলো ছাপানো হয়। ইতোমধ্যে ২০২০ শিক্ষাবর্ষে সারাদেশের প্রত্যক স্কুলে স্কুলে বিনামূল্যে নতুন বই বিতরণ কার্যক্রম সম্পন্ন হয়েছে। ছাত্রছাত্রী নয়, বই-ই এখন যেন শিক্ষার্থীদের জন্য অপেক্ষা করে। দুর্গম ও চরাঞ্চলেও বছরের প্রথম দিনেই ছাত্রছাত্রীরা যাতে বিনামূল্যে নতুন বই হাতে পায় তার উদ্যোগ ইতোপূর্বেই কার্যকরভাবে নেওয়া হয়ে থাকে।

৩১ ডিসেম্বর ২০১৯ তারিখে প্রতি বছরের ন্যায় শিক্ষার্থীর হাতে নতুন বই তুলে দিয়ে টানা ১১তম বারের মতো বিনামূল্যের বই বিতরণ কার্যক্রম ২০২০ উদ্বোধন করেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। একই দিনে পিইসি, জেএসসি ও জেডিসি পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশ এবং ২০২০ শিক্ষাবর্ষে বিনামূল্যে বই বিতরণ কার্যক্রম উদ্বোধন শিক্ষার্থীদের আনন্দের উচ্ছাসটা যেন অন্যান্য বারের তুলনায় এবার আরো বাড়িয়ে দিয়েছে। ২০১৯ সালের জন্য প্রাকপ্রাথমিক থেকে শুরু করে মাধ্যমিক স্তর পর্যন্ত ৪ কোটি ২৬ লাখ ১৯ হাজার ৮৬৫ জন শিক্ষার্থীদের মাঝে ৩৫ কোটি ২১ লাখ ৯৭ হাজার ৮৮২টি বিনামূল্যে নতুন বই বিতরণ করা হয়।

ক্রমান্বয়ে প্রতি বছর ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা যেমন বেড়েছে তেমনি প্রয়োজনভিক্তিক বই ছাপানোর পরিমানটাও বৃদ্ধি করা হয়েছে, একই সাথে বৃদ্ধি পেয়েছে শিক্ষাক্ষেত্রে সরকারের বিনিয়োগের চিত্র।

সরকার বর্তমান ২০২০ শিক্ষাবর্ষে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ৪ কোটি ২৭ লাখ ৫২ হাজার ১৯৮ জন ছাত্রছাত্রীর মাঝে বিনামূল্যে পাঠ্যপুস্তক বিতরণ করেছে ৩৫ কোটি ৩১ লাখ ৫৪ হাজার ৬৩৮টি বই। সরকারিভাবে এতো বই ছাপিয়ে বাঁধাই করে প্রত্যন্ত অঞ্চলসহ সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সকল শিক্ষার্থীর হাতে বছরের প্রথম দিনে বই বিতরণের ইতিহাস বিশ্বের কোথাও নেই। প্রাকপ্রাথমিক পর্যায়ে ৩৩ লাখ ৩৭ হাজার ৬৩৮টি, প্রাথমিক পর্যায়ে ৯ কোটি ৮৫ লাখ ৫ হাজার ৪৮০টি এবং মাধ্যমিক পর্যায়ের ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে বিতরণ করা হবে ২৪ কোটি ৮৫ লাখ ৭২ হাজার ৮৩৪টি বই। এছাড়া ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিতরণ করা হয় ২ লাখ ৩০ হাজার ১০৩টি বই। দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের মধ্যে ব্রেইল বই বিতরণ করা হয় ৯ হাজার ৫০৪ টি। প্রত্যেক বছরের ধারাবাহিকতায় এবারও প্রাকপ্রাথমিক পর্যায়ে বিনামূল্যে বই বিতরণের পাশাপাশি খাতাসহ নানা শিক্ষা উপকরণ বিতরণ করা হবে। সব শিক্ষার্থীর জন্য শিক্ষার সুযোগ সৃষ্টি, ঝড়ে পড়া রোধ, শিক্ষাকে মানসম্পন্ন করার লক্ষ্যে এ কার্যক্রম। এবারও পাঁচটি ক্ষুদ্র-নৃ গোষ্ঠীর (চাকমা, মারমা, সাদরী, ত্রিপুরা ও গারো) শিক্ষার্থীদেরও মধ্যে বই বিতরণ কার্যক্রম চলছে।

নতুন প্রজন্মকে এমনভাবে গড়ে তুলতে হবে যাতে তারা দক্ষ, যোগ্য ও তথ্য প্রযুক্তি নির্ভর হয়ে নিজেদের দক্ষতা, সক্ষমতার প্রমাণ দিতে পারে, তা অর্জন করাই সরকারের প্রধান লক্ষ্য। আর আমাদের দায়িত্ব সরকারের গৃহীত বিভিন্ন কার্যক্রম সফল বাস্তবায়নের জন্য সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেওয়া। সারাদেশে একযোগে বিপুল সংখ্যক শিক্ষাথীদের মাঝে বিনামূল্যে বই বিতরণ একটি চ্যালেঞ্জ। শিক্ষার্থীদের প্রত্যাশা পূরণে সরকার বিরাট কর্মযজ্ঞের মধ্যে দিয়ে এই চ্যালেঞ্জকে মোকাবিলা করে। দক্ষতা আর সদিচ্ছার প্রতিফলন ঘটিয়ে বিশ্বের মধ্যে এক অনন্য উদাহরণ সৃষ্টি করেছে বাংলাদেশের বিনামূল্যে বই বিতরণ কর্মসূচি। প্রতিবছর সফল হোক বই উৎসব।
লেখক : কলামিস্ট

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *