খর্বাকৃতির শিশু : মারাত্মক স্বাস্থ্য সমস্যার একটি
আব্দুল বাতিন বাবু : অমিতের বয়স চার বছর। বয়সের তুলনায় আস্বাভাবিক ওজন তার। অমিতকে দেখে তার সঠিক বয়স নির্ধারণ করা মুশকিল। তার বয়সী একটি স্বাভাবিক শিশুর চেয়ে দ্বিগুণের বেশি ওজন অমিতের। সে স্বাভাবিক শিশুর মতো খেলাধুলা ও দৌড়াতে পারে না। একটু হাঁটা চলা করলেই ক্লান্ত হয়ে পড়ে। বাইরে গিয়ে খেলাধুলা করতেও সে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে না। বাসায় কার্টুন দেখা ও গেমস খেলে সময় কাটে তার।
অমিতের বাবা-মা দুজনেই চাকুরি করেন। বাবা-মা ছেলেকে ভালো খাবার খাওয়াতে কার্পণ্য করেন না। ফাস্টফুডের প্রতি আসক্তি অমিতের। বাবা-মা নিয়মিত বাইরের খাওয়ান অমিতকে। অতিমাত্রায় পুষ্টি এবং অপুষ্টি দুটোই শিশুর জন্য ক্ষতিকর এ বিষয়টি অনেক শিক্ষিত বাবা-মাও জানেন না। আমাদের দেশের শুধু সাধারণ মানুষই নয়, অনেক উচ্চশিক্ষিত সচেতন ব্যক্তিও মনে করেন, মোটা শিশু মানেই স্বাস্থ্যবান শিশু। সুস্বাস্থ্য আর মুটিয়ে যাওয়া এক নয়। মাত্রাতিরিক্ত স্থ’লতা এবং মুটিয়ে যাওয়া একটি মারাত্মক স্বাস্থ্য সমস্যা।
আমাদের দেশের শহরাঞ্চলের ১৪ শতাংশ শিশু অতিরিক্ত ওজন ও স্থ’লতার শিকার। আর ঢাকা মহানগরে এই হার ২১ শতাংশ। এসব শিশুর শারীরিক সক্রিয়তা কম হয়। বিভিন্ন রোগব্যাধীতেও এরা বেশি আক্রান্ত হয়। অতিরিক্ত ওজন ও স্থূলতার অন্যতম কারণ স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর খাদ্যাভ্যাস। শিশুর এ খাদ্যাভাস তৈরিতে প্রধান ভূমিকা পরিবারের।
আমাদের দেশে অনেক মা-বাবাই শিশুর জীবনের প্রথম দিকে ওজন বৃদ্ধিকে আনন্দের সাথে নেন। অনেকেই তাদের শিশুর অত্যধিক ওজন বৃদ্ধির নেতিবাচক প্রভাবগুলো নিয়ে চিন্তা করেন না। শৈশবকালে বয়স এবং উচ্চতার তুলনায় ওজন অত্যাধিক বেশি হওয়াই শিশুর স্থ’লতার কারণ।
শৈশবকালীন স্থ’লতা যদি পরিণত বয়সেও থেকে যায় তাহলে শিশুর বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। আমাদের দেশে শহরাঞ্চলের শিশু ও কিাশোর-কিশোরীদের মধ্যে স্থূলতার প্রকোপ এবং খাদ্যাভ্যাস ও শারীরিক সক্রিয়তার ধরণ তাদের অতিরিক্ত ওজন ও স্থূলতার জন্য দায়ী যা, দেশে নতুন জনস্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। অতিরিক্ত ওজন ও স্থূলতার কারণে শিশুদের মধ্যে ডায়াবেটিস, হৃদরোগ, উচ্চরক্তচাপসহ অন্যান্ত জটিল রোগের ঝুঁকি বাড়ছে।
বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, যারা বেশি চর্বিযুক্ত খাবার খেতে অভ্যস্ত এবং ফাস্ট ফুডের প্রতি আসক্ত তাদের মাঝে স্থ’লতা ও অতিরিক্ত মুটিয়ে যাওয়ার প্রবণতা বেশি। তবে বংশগত বা হরমোনজনিত কারণেও এ সমস্যা দেখা দিতে পারে। অতিরিক্ত মুটিয়ে যাওয়ার সমস্যা যে কোনো বয়সেই দেখা দিতে পারে। তবে সাধারণত ছোটবেলাতেই এই সমস্যার লক্ষণ দেখা দেয়। কোনো শিশুর মধ্যে অতিরিক্ত স্থ’লতাজনিত সমস্যা দেখা দিলে অভিজ্ঞ ডাক্তারের পরামর্শ নিতে হবে।
সুস্থ, সবল সন্তান প্রতিটি বাবা-মার কাছেই কাম্য। তাই সন্তানকে সুস্থ ও রোগমুক্ত রাখতে হলে চর্বিযুক্ত খাবার এবং ফাস্টফুড বর্জন করে ছোট মাছ, টাটকা শাকসবজি ও ফলমূল খাওয়ার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। শিশুরা অনেক কারণে স্থ’লতায় ভুগতে পারে। শারীরিক পরিশ্রমের অভাব, অস্বাস্থ্যকর খাবার, ফাস্টফুড, চিনি জাতীয় খাবার, কোমল পানীয় ইত্যাদি শিশুর অস্বাভাবিক ওজন এবং স্থ’লতার কারণ। আবার কখনো কখনো হরমোন বা জীনগত কারণেও শিশুরা স্থ’লতায় ভুগতে দেখা যায়। এটা শুধু যে জীনগত কারণে হয় সেটা নয়, বরং মায়ের শরীর থেকে অতিরিক্ত পুষ্টি উপাদান শিশুর শরীরে প্রবেশ করে শরীরে কিছু স্থায়ী পরিবর্তন আনে যেমন অত্যাধিক ক্ষুধা, নিউরোএন্ডোক্রাইন ফাংশন এবং বিপাকীয় পরিবর্তন। তাছাড়া গবেষণায় দেখা গেছে যেসব মা গর্ভাবস্থায় অত্যধিক হাইপারগ্লাইসেমিক ডায়েট করে তাদের বড় বাচ্চা হয় এবং এসব বাচ্চা স্থ’লতায় ভোগে।
একটা ছেলে অথবা মেয়ের শৈশবকালে ওজন কত হবে সেটা নির্ভর করে সে কতটুকু পরিমাণে ক্যালরি গ্রহণ করছে এবং কতটুকু পরিমাণে ব্যয় করছে তার উপর। আজকাল দেখা যায় ছেলেমেয়েরা দিনের অনেকটা সময়ে ঘরে বসে টিভি, কম্পিউটার এবং ল্যাপটপ নিয়ে থাকে আর এটা সেটা খেতেই থাকে। এতে তাদের শরীরে যেমন অকার্যকর হয়ে পড়ে তেমনি আস্তে আস্তে তাদের ওজনও বাড়তে থাকে। শিশুকে প্রতিদিন কিছু সময় হাঁটা, খেলাধুলা ও শারীরিক ব্যায়াম করাতে হবে। বাবা-মায়ের একটু সচেতনতা শিশুকে অনেক ক্ষেত্রে সুস্থ ও সবল রাখতে পারে।
শিশু স্থ’লতার কারণে পরিণত বয়সে শিশু মৃত্যুহার অনেকাংশে বেড়ে যায়। অধিকাংশ স্থ’ল শিশু বিভিন্ন প্রকার অসংক্রামক রোগে আক্রান্ত হয়ে থাকে। ধমনি ও শিরা সংক্রান্ত রোগ, ক্যানসার, অ্যাজমা, অনিয়মিত ঋতুচক্র, উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিসের মতো জীবণঘাতি রোগেও আক্রান্ত হবার আশংকা থাকে তাদের। এছাড়া স্থুল শিশুদের শারীরিক আকৃতি তাদের মনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। তারা হতাশা ও হীনমন্যতায় ভুগে। চরম হতাশার কারণে তাদের মধ্যে আচরণগত সমস্যাও দেখা যায়।
পারিবারিক সহযোগিতা স্থ’ শিশুদের সবচেয়ে বড় চিকিৎসা। স্থ’ শিশুদের ওজন কমানোর ডায়েট দেওয়া যাবে না। কারণ ওজন কমানোর ডায়েট দিলে তাদের শারীরিক উচ্চতা বৃদ্ধি ও মানসিক স্বাস্থ্যের বিকাশ ঠিক মত হবে না। এদের খাদ্য গ্রহণে পরিবর্তন আনতে হবে এবং নিয়ন্ত্রিত সক্রিয় জীবন যাপনে উৎসাহিত করতে হবে। স্থুল শিশুদের প্রয়োজনীয় পুষ্টিকর খাবার দিতে হবে এবং অধিক ক্যালরিযুক্ত খাবার বাদ দিতে হবে। বেশি পরিমাণে শাক-সবজি, ফলমূল, শস্য জাতীয় খাবার দিতে হবে, কম ফ্যাট যুক্ত দুধ বা ফ্যাটবিহীন দুধ; মাছ, কম ফ্যাটযুক্ত মাংস, ডাল, শিমের বিচি দিতে হবে এবং স্থুল শিশুদের জন্য ভালো পুষ্টিবিদের পরামর্শ অনুযায়ী খাদ্য তালিকা প্রস্তুত করে সে অনুযায়ী খাবার দিতে হবে। খাদ্য তলিকা থেকে কোমল পানীয়, চিনি, পিজ্জা, হটডগ, স্যান্ডুইচ, ফ্রাইড চিকেন এবং বার্গারের মতো ফাস্টফুড খাওয়া বন্ধ করতে হবে। বেশি লবনাক্ত খাবার এড়িয়ে চলতে হবে।
শিশু-কিশোরদের শারীরিকভাবে সক্রিয় থাকতে উৎসাহিত করতে হবে। হাঁটাচলা, সাঁতার, নাচ, জাম্পিং, সাইকেল চালানো, ফুটবল, ব্যাডমিন্টন ইত্যাদি শারীরিক পরিশ্রমের খেলায় অংশ্রগ্রহণ বাড়াতে হবে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) মতে, শিশু-কিশোরদের প্রতিদিন কমপক্ষে ১ ঘন্টা মাঠে খেলাধুলা করতে দিতে হবে; দিনে ২ ঘন্টার বেশি ল্যাপটপ, টিভি, কম্পিউটার নিয়ে বসে থাকা যাবে না; শিশুদের বিনোদনের জন্যে সবসময় পরিবারের সাথে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণের জন্যে উৎসাহিত করতে হবে; বেশি পরিমাণ ভিটামিন-সি জাতীয় শাকসবজি, ফলমূল খাওয়াতে হবে কারণ ভিটামিন সি ফ্যাট ভাঙতে সহায়তা করে; স্থুল শিশুদের খাদ্যাভ্যাস এবং শারীরিক পরিশ্রমের মাধ্যমে স্বাভাবিক জীবন যাপনে উৎসাহিত করতে হবে। পারিবারিক ভালোবাসা এবং সহযোগিতা এক্ষেত্রে শিশুদের সুস্থ, স্বাভাবিক জীবন-যাপনে ভূমিকা রাখবে।
পুষ্টি সম্পর্কে সঠিক জ্ঞান না থাকার কারণে দেশের বিপুলসংখ্যক নারী রক্তস্বল্পতায় ভোগে। ফলে তাদের শিশুরা হচ্ছে খর্বাকৃতির। এ বিষয়ে সবার মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টি করতে সরকার দেশের সব হাসপাতালে একজন করে পুষ্টিবিদ নিয়োগের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সরকারের এ অত্যন্ত সময়োপযোগী। শিশুসহ সব বয়সী মানুষকে শারীরিকভাবে সক্রিয় থাকার কোনো বিকল্প হতে পারে না বলে পুষ্টি বিশেষজ্ঞগণ মনে করেন। শিশুদের প্রতিদিন হাঁটাচলারও পাশাপাশি শারীরিক ব্যায়াম করাতে হবে। খাদ্যাভাসে পরিবর্তন আনতে হবে। ইলেক্ট্রোনিক্স দ্রব্যাদির ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। তাহলে আমাদের শিশুরা সুস্থভাবে বেড়ে উঠবে। আর এর জন্য সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন পরিবারের সচেতনতা।


