গযওয়া উহুদ । পর্ব-৬

গযওয়া উহুদ । পর্ব-৬

তীব্র যুদ্ধ শুরু

এরপর দুই দল পরস্পরের বিরুদ্ধে প্রচণ্ড লড়াইয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ল। একদিকে নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নেতৃত্বে সত্যের পতাকাবাহী আত্মত্যাগী সাহাবীগণ, আরেকদিকে আবূ সুফয়ানের নেতৃত্বে কূপমণ্ডূক শয়তানপন্থীদের দল। সাহাবীগণ ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র দলে ভাগ হয়ে প্রচণ্ড বিক্রমে দুশমনদের ব্যূহ ভেদ করে ভেতরে ঢুকে পড়লেন। আক্রমণের তীব্রতা সহ্য করতে না পেরে দুশমনরা চতুর্দিকে ছিটকে পড়ছিল। অনেকেই নিহত হল।

শহীদশ্রেষ্ঠ হযরত হামযা রা.-এর শাহাদত

বীর-কেশরী হযরত হামযা রা. বীরবিক্রমে লড়াই করে যাচ্ছিলেন। সম্মুখে যে দুশমনই পড়ছিল, ধরাশায়ী হচ্ছিল। একে একে একত্রিশ জন কাফির সেনা তার হাতে ইহলীলা সংবরণ করে। শেষে তিনি আল্লাহর পথে শাহাদত বরণ করেন।

হযরত হামযা রা. এর হন্তা ওয়াহশী ইসলাম গ্রহণের পর তাঁর শাহাদতের বিবরণ দিতে গিয়ে বলেন, আমি ছিলাম কুরাইশ সর্দার জুবায়র ইবন মুত’ইম-এর দাস। তার চাচা তুআইমা ইবন আদী বদর যুদ্ধে হযরত হামযা রা. এর হাতে নিহত হয়েছিল। উহুদ যুদ্ধের সময় জুবায়র ইবন মুত’ইম বলল, তুমি যদি আমার চাচার হত্যার বদলায় মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর চাচা হামযাকে হত্যা করতে পারো তবে তুমি মুক্ত।

ওয়াহশী বলেন, আমি দাসত্বের শৃঙ্খল থেকে মুক্তির আশায়, কেবল হযরত হামযাকে হত্যার উদ্দেশ্যেই উহুদ যুদ্ধে শরীক হলাম। আমি হাবশার লোকদের মতো দূরনিক্ষেপণ অস্ত্র বর্শা ব্যবহারে খুবই নিপুণ ছিলাম। খুব কমই আমার অস্ত্র লক্ষ্যভেদে ব্যর্থ হত।

উহুদে তুমুল যুদ্ধ শুরু হলে আমি হযরত হামযা রা. এর গতিবিধি লক্ষ্য করতে করতে একটা পাথরের নিচে তাক করে অবস্থান নিলাম। কুরাইশ সর্দার সিবা’ ইবন আবদিল উযযা ‘আমার মোকাবিলার কার সাহস হয়?’ ডাক ছাড়তে ছাড়তে যখন অগ্রসর হচ্ছিল তখন ‘ওহে মেয়েদের খতনাকারী মহিলার পুত, তুই আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের বিরুদ্ধে ঔদ্ধত্য প্রদর্শন করছিস’ বলে হযরত হামযা রা. তার উপর তলোয়ারের প্রবল এক আঘাত হানেন। এক আঘাতেই সে ধরাশায়ী হয়ে পড়ে। হযরত হামযা তার লৌহবর্মটি নেয়ার জন্য যেই ঝুঁক লেন, সেই সুযোগে আমি আমার অস্ত্রটি নিক্ষেপ করলাম। সেটি তাঁর নাভিমূল ভেদ করে অতিক্রম করে। তিনি আমার দিকে অগ্রসর হতে চাইলেন কিন্তু এর আগেই ভূমিতে খুবড়ে পড়লেন। আমি আমার অস্ত্রটি তাঁর শরীর থেকে বের করে শিবিরে ফিরে গেলাম।

অন্য এক বর্ণনায় আছে, আবূ সুফয়ানের স্ত্রী হিন্দা গায়ের অলঙ্কার খুলে তাকে দিয়ে পুরস্কৃত করে এবং মক্কায় ফেরার পর আরো স্বর্ণমুদ্রা দিবে বলে ওয়াদা করে। এরপর হিন্দা হযরত হামযার লাশের কাছে যায়। প্রতিহিংসায় উন্মত্ত হয়ে তাঁর বুক চিরে ফেলে এবং কলিজা বের করে চিবুতে থাকে। নাক-কান কেটে চেহারা বিকৃত করে। গোশত টুকরো টুকরো করে হাত ও গলার হার বানায় এবং বিভৎস রূপ ধারণ করে।

যুদ্ধ শেষে নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হযরত হামযা রা. এর এই নৃশংস হত্যাকাণ্ড দেখে অত্যন্ত কষ্ট পেয়েছিলেন। জীবনে আর কখনও তা ভুলতে পারেননি। এমনকি তিনি বলেছিলেন, চাচা, আপনার স্থানে যদি পঞ্চাশটি কাফিরকে হত্যা করতে হয় তবে তাই করব।

এই ওয়াহশী এবং হিন্দাও পরবর্তীতে ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। ওয়াহশী নিজে বলেন, মক্কা বিজয়ের পর পালিয়ে তায়েফে চলে এসেছিলাম। ক্রমেই পৃথিবী আমার জন্য খুবই সংকীর্ণ হয়ে উঠল, কোথাও আশ্রয় ছিল না। শুনলাম, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম প্রতিনিধি দলের সাথে গেলে কাউকে হত্যা করেন না। আমি তায়েফের প্রতিনিধি দলের সাথে তাঁর কাছে পৌঁছে গেলাম এবং ঈমান নিয়ে আসলাম। লোকেরা বলল, এ তো সেই ওয়াহশী! তিনি বললেন, শত কাফিরকে হত্যা করার চেয়েও একজনের ঈমান আনা আমার অধিক প্রিয়।

আমাকে দেখে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, তুমিই ওয়াহশী? আমি বললাম, জি।

তিনি বললেন, তুমিই হামযাকে হত্যা করেছো? আমি বললাম, হ্যাঁ। সেই আল্লাহর প্রশংসা, যিনি তাঁকে আমার হাতে শাহাদতের মর্যাদা দিয়ে সম্মানিত করেছেন আর আমাকে তাঁর হাতে নিহত করে (জাহান্নামী বানিয়ে) লাঞ্ছিত করেননি।

কুরাইশদের কেউ কেউ আশ্চর্য হয়ে বলল, এ তো হযরত হামযা রা. এর নৃশংস হত্যাকারী! তাকে আপনি ভালবাসছেন?

নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, ওয়াহশী, তুমি আমার সামনে বসবে না। যাও, আল্লাহর পথ রুদ্ধ করার জন্য এতদিন যেমন যুদ্ধ করেছো, এখন আল্লাহর রাস্তায় যেয়ে জিহাদ করতে থাকো।

হযরত ওয়াহশী রা. এটাকেই তাঁর জীবনের পণ বানিয়ে নিয়েছিলেন এবং পরে যে কায়দায় তিনি হযরত হামযা রা.কে শহীদ করেছিলেন, একই কায়দায় হযরত আবূ বকরের যুগে নবুওয়াতের ভণ্ড দাবীদার মুসায়লামা আল কাযযাবকেও হত্যা করেন। পরে তিনি বলতেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পর সর্বশ্রেষ্ঠ লোকটিকে আমি হত্যা করেছিলাম, আর পরবর্তীতে সর্বনিম্ন লোকটিকেও হত্যা করতে পারলাম। 

শাহাদতের অদম্য পিপাসায়

হযরত সা’দ ইবন আবী ওয়াক্কাস রা. বলেন, উহুদের দিন যুদ্ধ শুরুর আগে হযরত আবদুল্লাহ ইবন জাহশ রা. আমাকে বললেন, চলুন আমরা আল্লাহর কাছে যা চাওয়ার চেয়ে নিই।

তাঁরা উভয়েই ময়দানের একপাশে চলে এলেন। হযরত সা’দ প্রথম দুআ শুরু করলেন, হে আল্লাহ, যুদ্ধে যেন কঠিন কোনো বাহাদুরের সম্মুখীন হই, ভীষণ যেন হয় তার আক্রমণ। আমিও তার মোকাবিলায় লড়তে পারি। শেষে আপনি আমাকেই যেন জয়ী করেন। তাকে হত্যা করতে পারি এবং তার অস্ত্রশস্ত্র অধিকার করতে পারি। আবদুল্লাহ ইবন জাহশ রা. বললেন, আমীন।

এরপর তিনি দুআ শুরু করলেন। বললেন, হে আল্লাহ, আমি যেন কোনো কঠিন বলশালী শত্রুর সম্মুখীন হই, খুবই যেন ভীষণ হয় তার আক্রমণ। আমিও যেন প্রতি আক্রমণ করতে পারি। শেষে যেন তার হাতে হয় আমার শাহাদত। সে যেন প্রতিহিংসায় উন্মত্ত হয়ে আমার নাক-কান কেটে দেয়। হাশরে যখন তোমার সাথে সাক্ষাৎ হবে, তুমি বলবে, হে আমার প্রিয়, তোমার নাক-কান কর্তিত হল কেন? আমি উত্তর দিব, তোমার এবং তোমার রাসূলের পথে আমার এই হাল। তুমি তখন বলবে, সত্য বলেছো তুমি।

হযরত সা’দ রা. বলেন, আল্লাহর কসম! আমার দুআর চেয়ে আবদুল্লাহ ইবন জাহশ রা. এর দুআ ছিল অনেক উত্তম। যুদ্ধ শেষে দেখলাম, তিনি শহীদ। আর তাঁর নাক-কান কেটে একটা সুতায় বেঁধে রেখেছে কোনো দুর্বৃত্ত। এ জন্য তিনি ইসলামে— ‘المُجَدَّعُ فِي اللهِ’ (মুজাদ্দা’ ফিল্লাহ, আল্লাহর পথে যার নাক-কান কাটা হয়েছে) খেতাবে ভূষিত। তাঁর মামা হযরত হামযা রা. এর সঙ্গে একই কবরে দাফন করা হয় তাঁকে। তাঁর রেখে যাওয়া সম্পদ দিয়ে খায়বারে তাঁর ছেলের জন্য একটা বাগান খরিদ করে দেয়া হয়েছিল।

Related Articles