তুমিও জান্নাতে চলে এসো
মুবাশশির ইবন আবদিল্লাহ বদর যুদ্ধে শহীদ হয়েছিলেন। হযরত আবদুল্লাহ ইবন আমর ইবন হারাম রা. বলেন, উহুদের কিছু আগে মুবাশশির ইবন আবদিল্লাহ রা.কে স্বপ্নে দেখি। তিনি আমাকে বললেন, কিছুদিনের মধ্যেই তুমিও আমাদের কাছে আসছো। আমি বললাম, তুমি কোথায় আছো?
তিনি বললেন, জান্নাতে। যেখানে ইচ্ছা সেখানেই আমি ঘুরে বেড়াতে পারছি। আমি বললাম, তুমি কি বদরে শহীদ হয়ে যাওনি? তিনি বললেন, হ্যাঁ, তবে আমাকে আমার আল্লাহ জিন্দা করেছেন।
হযরত আবদুল্লাহ নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে এসে স্বপ্নের কথা ব্যক্ত করলেন। তিনি বললেন, হে জাবিরের পিতা, তোমার ভাগ্যেও আল্লাহ শাহাদতের সৌভাগ্য রেখেছেন।
হযরত আবদুল্লাহ উহুদে শরীক হলেন এবং শহীদ হয়ে গেলেন। নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম অগ্নিপতি হযরত আমর ইবনুল জমূহ রা. এর সঙ্গে একই কবরে তাঁকে দাফন করেন। তাঁর বোন হিন্দ রা.কে তিনি বলেছিলেন, ওহে হিন্দ, আমি দেখছি শহীদ হওয়ার ক্ষণ থেকেই ফেরেশতারা তোমার ভাইকে ছায়া দিয়ে রেখেছেন। অপেক্ষা করছেন কোথায় তাকে দাফন দেয়া হয়।
হযরত জাবির রা. বলেন, আমাকে উদাস ও দুঃখ ভারাক্রান্ত দেখতে পেয়ে নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, এই অবস্থা কেন? আমি বললাম, আমার পিতা আবদুল্লাহ উহুদে শহীদ হয়েছেন। অনেক ভাইবোন এবং ঋণের বোঝা রেখে গেছেন। চিন্তা হয় কী করি?
নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, তোমাকে একটা খোশখবরী শোনাব? আল্লাহ পাক অন্যান্য মানুষের সঙ্গে কথা বলেছেন পর্দার অন্তরালে, কিন্তু তোমার পিতাকে জিন্দা করে তার সঙ্গে আল্লাহ পাক কথা বলেছেন সামনাসামনি, ‘বলো হে আমার বান্দা, তোমার কী চাওয়ার আছে?’ তোমার পিতা বললেন, আমার একমাত্র কামনা হল, আমাকে জিন্দা করা হোক, তোমার পথে যেন আবার শহীদ হই। আল্লাহ বললেন, মৃত্যুর পর আর দুনিয়ায় ফিরে যাওয়ার কথা নেই।
ইয়াহুদীশ্রেষ্ঠ মুখায়রীক ইসরাইলী রা.
মদীনার ইয়াহুদীদের অনেক বড় আলিম ছিলেন হযরত মুখায়রীক রা.। নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের গুণাবলী দেখে তিনি চিনে ফেলেছিলেন, ইনিই সেই নবী যার বিবরণ তাওরাতে এসেছে। কিন্তু তিনি তাঁর সম্প্রদায়ের কথা ভেবে কিছুটা দ্বিধা-দ্বন্দ্বে ভুগছিলেন। তবে উহুদ যুদ্ধের শুরুর দিন শনিবারে সব দ্বিধা ঝেড়ে তিনি স্ব সম্প্রদায়ের লোকদের বললেন, হে ইয়াহুদী সম্প্রদায়, তোমরা বিলক্ষণ জানো, মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে সাহায্য করা তোমাদের অবশ্য কর্তব্য। তারা বলল, আজকের দিন তো সাবাত অনুষ্ঠানের দিন শনিবার। তিনি বললেন, তোমাদের আজ সাবাত নেই।
তিনি তাঁর সম্প্রদায়ের লোকদের ওয়াদা নিলেন, আজ যদি আমি মারা যাই আমার সমুদয় সম্পদ মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে ন্যস্ত করবে। তিনি যদৃচ্ছা তা ব্যবহারের অধিকার রাখেন। মুহাম্মদ ইবন ‘উমর আল আসলামী বলেন, তিনি ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন।
এরপর অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত হয়ে তিনি উহুদের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়লেন। শেষে লড়াই করতে করতে শহীদ হয়ে গেলেন।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলতেন, ‘ইয়াহুদীদের মাঝে সর্বোত্তম জন হল মুখায়রীক।’ যুবায়র ইবন বাক্কার বর্ণনা করেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, মুখায়রীক হল ইয়াহুদীদের মধ্যে অগ্রগামী, সালমান হল পারস্যবাসীদের মধ্যে অগ্রগামী, আর বিলাল হল হাবশাবাসীদের মধ্যে অগ্রগামী লোক।
হযরত মুখায়রীকের শাহাদতের পর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর সম্পদ নিজের জিম্মায় নিয়ে এসেছিলেন। তা ছিল সাতটি খর্জুর উদ্যান।
এক ওয়াক্ত নামায আদায় না করেও যিনি জান্নাতী (হযরত উসয়রিাম রা.)
হযরত আবূ হুরায়রা রা. একবার লোকদেরকে বললেন, বলতে পারো এমন একজন লোকের কথা, যে জান্নাতী অথচ সে এক ওয়াক্ত নামাযও পড়েনি? উপস্থিত লোকেরা বলল, আমরা তো জানি না, আপনিই বলে দিন।
হযরত আবূ হুরায়রা রা. বললেন, তিনি হলেন বনু আবদুল আশহালের উসয়রিাম রা.। হযরত উসয়রিাম রা.কে বারবার পীড়াপীড়ি করা সত্ত্বেও তিনি ইসলাম গ্রহণ করেননি। উহুদ যুদ্ধের প্রাক্কালে তাঁর একটা মনোরম উদ্যানের বিষয়ে বাইরে ছিলেন। মদীনায় ফিরে দেখেন সঙ্গীদের কেউ নেই। তাই জিজ্ঞাসা করলেন, সা’দ ইবন মুআয কোথায়? জবাব পেলেন, উহুদে। ‘তাঁর জ্ঞাতি ভাই-ভাতিজারা কোথায়?’ জবাব এল, উহুদে। ‘আমার গোষ্ঠীর লোকেরা কোথায়?’ বলা হল, তারাও উহুদে।
তাঁর মনও উতলা হয়ে উঠল। ইসলামে দীক্ষিত হলেন। তরবারি-বর্শা হাতে নিলেন, অন্যান্য অস্ত্রশস্ত্র সাথে নিলেন। ঘোড়ায় চড়ে সোজা উহুদে চলে আসলেন। লোকেরা তাঁকে দেখে বলল, সরে যাও আমর। তিনি বললেন, আমি তো ঈমান এনেছি। এরপর তিনি যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়লেন। শেষে সাংঘাতিক ভাবে আহত হয়ে পড়ে গেলেন।
তাঁর সম্প্রদায় বনু আবদুল আশহাল তাঁকে দেখে বলল, উসয়রিাম! তুমি কেন এখানে? আমরা তো জানতাম তুমি বারবার ইসলাম গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানিয়ে আসছিলে। এখন কি সম্প্রদায়ের টানে এসেছো না ইসলামের প্রতি ভালবাসার টানে? তিনি বললেন, ইসলামের প্রতি ভালবাসায়। আমি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি ঈমান এনেছি, পরে আমার তরবারি এবং অন্যান্য অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে শরীক হয়ে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়লাম। এখন আমার অবস্থা তো তোমরা দেখতেই পাচ্ছ। আমি যদি মারা যাই, তবে আমার সব ধনসম্পদ মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের। তিনি যদৃচ্ছা তা ব্যয় করবেন।
এরপর তিনি বেশিক্ষণ আর জীবিত ছিলেন না। নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর কথা শুনে বললেন, ‘তিনি তো অবশ্যই জান্নাতী।’ অথচ এক ওয়াক্ত নামাযও আদায় করার তাঁর সুযোগ হয়নি। সকালেই ইসলাম গ্রহণ করলেন আর নামায়ের ওয়াক্ত আসার আগেই শহীদ হয়ে গেলেন।


