গলাকাটা তরমুজ | রশীদ জামীল
এখন ওয়াজ ফরমাইবেন প্রখ্যাত মুফাসসিরে কোরআন (যিনি উসুলে তাফসিরের হামযাটাও ভালো করে বানান করতে পারেন না), বিশিষ্ট ইসলামী চিন্তাবিদ (যার উল্টা পাল্টা চিন্তা প্রায়ই উম্মতের জন্য দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়ায়), আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন বক্তা (কারণ, তিনি ত্রিপুরা এবং ভুটানে দুইটা মাহফিল করে এসেছেন), হযরতুল আল্লাম হযরত মাওলানা…
গলা খাকারি দিয়ে হযরতুল আল্লাম শুরু হলেন। মিনিট দশেক লম্বা একখান খুতবা দিলেন। তারপর, কিছু হাসি, কিছু কান্না, মাঝখানে এক দুইটা টান, একটু আধটু ভাঁড়ামে… বয়ান শেষ।
উঠে দাঁড়ালেন তিনি।
-হুজুর! একটা মোনাজাত দিয়ে যাবেন না?
হাতের ঘড়ির দিকে তাকাতে তাকাতে হুজুর বললেন, ‘মাহফিল তো শেষ হয় নাই। মোনাজাত দিয়ে দিলে লোকজন চলে যাবে। পরের বক্তা উঠান’- বলেই স্টেজ ছাড়লেন তিনি। হাদিয়ার বকেয়া অ্যামাউন্ট পকেটে নিয়ে গাড়িতে উঠলেন। দেরি করার টাইম নাই। আরো কিছু হেদায়তের বাণী নিয়ে তাকে অন্যত্র যেতে হবে। মিস করা যাবে না। সেখান থেকেও বায়না লওয়া।
বলছি গলাকাটা বক্তাদের কথা। ‘গলাকাটা বক্তা’ শব্দটা মাওলানা নুরুল ইসলাম ওলিপুরির বক্তব্য থেকে ধার করা। তিনি গলাকাটার একটা ডেফিনেশন দিয়েছেন উদাহরণসহ। ‘বিশ টাকার পেয়াজ দুইশ টাকা বিক্রি করলে সে হলো গলাকাটা ব্যবসায়ী। ১৫/২০ হাজার টাকা হাদিয়া দিলে যে বক্তার যাতায়াত খরচ বাদেও ৪/৫ হাজার টাকা পকেটে থাকে, তারা ৪০/৫০/৮০ হাজার টাকা নিলে তারা হলো গলাকাটা ওয়াইজ’।
ব্যাখ্যাটা আমার পছন্দ হয়েছে। এটাকে বেইজ ধরে বক্তাদের আরো কিছু ক্রাইটেরিয়া তৈরি করা যায়। ক্যাটাগরিওয়াইজ একটা তালিকাও করা যায়। অবশ্য, তাদেরকেও গলাকাটা বক্তার ক্যাটাগরিতে গন্য করা জায়েজ হবে কিনা-আমি জানি না।
ফরমকাটা বক্তা
ওয়াজের দাওয়াত গ্রহণের জন্য তিনি আলাদা ফরম বানিয়ে রেখেছেন। যে ফরমের অন্যান্য কলামের সাথে বিশেষ তিনটি কলামও থাকে।
১. অগ্রিম…
২. বকেয়া…
৩. মোট…
সম্পূর্ণ ব্যবসায়িক ফরমেটে তৈরি এই লেনদেন ফরম সন্তুষজনক পর্যায়ে ফিল আউট হলে তবেই মাহফিলে গমন, এবং ওয়াদা অনুযায়ী (চুক্তি শব্দটা বললাম না) পুরো পয়সা না দিলে মাহফিল কর্তৃপক্ষের সাথে তাৎক্ষণিক জিহাদ ঘোষণা।
ঠোঁটকাটা বক্তা
এই প্রজাতির বক্তাগণ মাইক্রোফোন পাওয়ার পর মুখে আর লাগাম রাখেন না। তিনি যাকে পছন্দ করেন, তাকে তোষামোদ করতে করতে রহমতের ফেরেশতা বানিয়ে ছাড়েন। আর যাকে তার পছন্দ নয়, তাকে পায়ের তলার ধুলোর সমানও মনে করতে চান না।
কুশিকাটা বক্তা
ছোটবেলা আমাদের মা খালাদের কুশিকাটা সুঁই দিয়ে ডিজাইনের সুয়েটার বুনতে দেখতাম। তারা সুঁই দিয়ে উলেন জামা-কাপড় সেলাই করতেন। আজকাল কিছু বক্তা তাদের কুশিকাটা দিয়ে অন্য বক্তাকে সেলাই করেন।
বড়শিকাটা বক্তা
মাছ ধরার জন্য বড়শির সুতার মাথায় ঝুমকা মতোন একটা জিনিস থাকে; যেটা পঁচা গান্ধা খাবারের প্রলেপ মুড়িয়ে মাছদের মুখের সামনে তুলে ধরা হয়। কিছু বক্তা আছেন যারা কোরআনের মাহফিলে উদ্ভট কেচ্ছা-কাহিনি বলে শ্রোতা শিকারের নেশায় থাকেন।
এখন চলুন গলাকাটা বক্তাদের সাথে পরিচিত হই। গলাকাটা বক্তাদের ক্যাটাগরি আবার দুইটা।
১. গলার সামনের দিকে কাটা।
২. পেছনের দিকে কাটা।
কেউ কেউ আছেন যারা ‘নাচতে নেমে আর ঘোমটা টানার দরকার কি’- স্টাইলে সরাসরি দরদাম করেই হাদিয়া(!) ঠিক করে নেন। এরা হলেন গলাকাটা বাই ফ্রন্ট সাইড। এদের সংখ্যা খুব একটা বেশি না।
সেকেন্ড ক্যাটাগরি ঘোমটাটা একটু টেনে রাখেন। মাছ ধরেন কিন্তু পানিতে নামেন না। গলাটা তারাও কাটেন তবে ছুরিচাকু থাকে অন্যের হাতে। হযরতের পক্ষ থেকে দাওয়াতদাতাদের কাছে টাকাও ডিমান্ড করা হয় না, কিন্তু তারা কায়দা করে পরিবেশ তৈরির মাধ্যমে হাদিয়ার কাঙ্খিত ফিগারটা দাওয়াতদাতার মুখ থেকে বের করেই ছাড়েন। এই ট্রেনিং দিয়েই তাদেরকে মাঠে ছাড়া হয়। পয়সার পরিমাণটা যতক্ষণ না সন্তুষজনক অংকে গিয়ে পৌঁছায়, ততক্ষণ ডায়েরিতে তারিখ খুঁজে মিলে না। দে অলসো হ্যাভ বিন কাটিং দ্যা থ্রট বাই হিডেন সাইড।
খোলাসাতুল কালাম। গলাটা সকলেই কাটেন। কেউ কাটেন সরাসরি, কেউ একটু ঘুরিয়ে। পাবলিকের কাছে উভয় পক্ষই সমান। কারণ, ছুরি তরমুজের উপর পড়ুক অথবা তরমুজ ছুরির উপর, কাটা তো তরমুজকেই পড়তে হয়।
ছোটবেলা থেকেই আমরা ওয়াজের সাথে পরিচিত। ওয়াইজিনদের তখনও হাদিয়া দেওয়া হতো, এখনও হয়। তখন মানুষ যা দিত, তাতেই বক্তাগণ সন্তুষ্ট থাকতেন। পয়সা নিয়ে দেন-দরবার করতেন না। আর এখন মার্কেট-ডিমান্ডে থাকা উল্লেখযোগ্য বক্তাদের প্রায় সবাই দেনা-পাওনার হিসাব পজিটিভ হলে তবেই বয়ান ফরমাইতে যান। ব্যতিক্রম আছেন, তবে তাঁরা মার্কেটে নেই।
আমি কারো নাম নিচ্ছি না। আশা করতে চাই কারো কোনো কমেন্ট পাস করার ইচ্ছা হলে কারো নাম ম্যানশন না করেই করবেন। কথাটি বললাম এজন্য যে, কেউ যখন এসে বলবেন, অমুক হযরত কখনো চুক্তি করে পয়সা নেন না, তখন উচিত হবে তিনি কীভাবে কোন তরিকায় কাজটি করেন, সেটা বুঝিয়ে বলা। কাজটি করতে চাচ্ছি না। সেটা পার্সনাল পর্যায়ে চলে যাবে। আমরা কথা বলব ইনজেনারেল ওয়েতে। বিশেষ কোনো বক্তাকে যেমন সাইজ করত নয়। একইভাবে কাউকে আবে জমজমের পানিতে ধোয়া- এটা প্রমাণ করার জন্যও নয়।
যারা লাজ লজ্জার মাথা খেয়ে সরাসরি কন্টাক করে পয়সা নেন, আর যারা কায়দা করে পরিবেশ তৈরির মাধ্যমে আদায় করেন, উভয়ের মধ্যে আমরা নীতিগত কোনো পার্থক্য খুঁজে পাই না। হারাম আর মাকরূহে তাহরিমির মাঝে ব্যবধান খুবই কম।
আমি এভাবে পয়সা নেওয়াকে হারাম বলছি না। এটা হালাল না হারাম- বিজ্ঞজনেরাই বলবেন। হালালের একটা গল্প মনে পড়ল। আমি বরং গল্পটা বলি।
রাস্তায় ডাকাতের কবলে পড়েছে একলোক। পকেটে ২০ হাজার টাকা ছিল। বুকে চাকু ধরতেই লোকটি টাকাগুলো বের করে দিয়ে দিলো। জান না বাঁচলে টাকা দিয়ে কী হবে?
ডাকাতদল টাকা নিয়ে কিছু দূর গিয়ে আবার ঘুরে দাঁড়াল। বলল, অ্যাই দাঁড়া।
লোকটি কাঁদো কাঁদো গলায় বলল, ভাই! আমার কাছে আর কিছু নাই।
ওরা বলল, টাকা যে দিলি, হালাল করে দিয়া যাবি না?
লোকটি বলল, কীভাবে হালাল করতে হবে।
-দাবি-দাওয়া ছাড়তে হবে না? এখন বল, এই টাকার উপর তর কোনো দাবি-টাবি আছে কিনা।
লোকটি বলল, জি না। মোটেও কোনো দাবি নাই।
পরিবেশ তৈরি করে মোটা অংকের হাদিয়া আদায় করার সাথে বুকে চাকু ধরে পয়সা হালাল করার কোনো মিল পাওয়া গেলে সেটা অনভিপ্রেত কাকতাল মাত্র।
মুহতারাম ওয়াইজিন!
আপনা সরবে ওয়াজ করতে থাকুন।
আপনারা নীরবে পয়সা কামাতে থাকুন।
কিন্তু কাঁচের ঘরে বসে বাইরের দিকে ঢিল ছুঁড়েন কেন? আপনাদের অনেকের ওয়াজ বাণিজ্যের অনেক কিছুই যে আমরা অনেকেই জানি, এটা কি আপনারা জানেন?
লেখক : নিউ ইয়র্ক প্রবাসী


