- আমিনুল ইসলাম কাসেমী
আজো গা শিউরে ওঠে। সে দৃশ্য সহ্য করার মত ছিল না। গোপনে কেঁদেছি অনেকবার। কাউকে বলার শক্তি ছিল না। টেলিভিশনের পর্দায় প্রিয় শায়েখের সে মলিন চেহারা আমার স্মৃতিপটে গেঁথে আছে। হ্যান্ডক্যাপ পরানো। মাথায় সেই কিস্তি টুপি। সাদা পাঞ্জাবী-পায়জামা। তবে লাল হাজী রুমাল খানা গায়ে শোভা পাচ্ছিল। এমন অবস্থায় হযরত শাহ জালাল আন্তর্জাতিক বিমান বন্দর থেকে শাইখুল ইসলাম আল্লামা ফরীদ উদ্দীন মাসঊদ সাহেবকে গ্রেফতার করা হয়েছিল।
সাধারণ কোনো ব্যক্তি তিনি নন। একজন সুবিখ্যাত আলেমেদ্বীন। শাইখুল হাদীস। প্রায় অর্ধশতাব্দীকাল তখন হাদীসের দরস দেন। আবার ইসলামিক ফাউন্ডেশনেরর ডাইরেক্টর হিসাবে বহুবছর দায়িত্ব পালন করেন। কোনো ফেলানো ব্যক্তি তিনি নন। অখ্যাত কেউ নয়। প্রসিদ্ধ আলেম-গবেষক ও খ্যাতিমান ইসলামী স্কলার হিসাবে তাঁর ব্যাপক পরিচিতি ছিল। কিন্তু তারপরেও তাঁকে মিথ্যা অপবাদে অভিযুক্ত করা হলো। সারাদেশে সিরিজ বোমা ফাটানোর দায় এড়ানোর জন্য উদোর পিন্ডি বুধোর ঘাড়ে। সত্যকে গোপন করে একজন হক্কানী-রব্বানী আলেমের উপর খড়গ চাপানোর চেষ্টা করেছিল তারা।
অথচ আল্লামা মাসঊদ সাহেব নির্দোষ। তিনি কিছুই জানেন না। তবুও ঘটনাকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করতে চেয়েছিল। আসল অপরাধীদের আড়াল করে নিরীহ মানুষকে ফাঁসানো উদ্দেশ্য ছিল তাদের। তবে লড়াকু মুজাহিদ ছিলেন তিনি। মনোবল হারাননি। জালিমের কাঠগড়ায় মজলুমের কন্ঠ বেজে উঠেছিল। এরকম অবস্হায় কত মানুষ ভেঙ্গে পড়ে। কত বড় বড় ব্যক্তিত্ব, কত তুখোড় নেতা, কিন্তু আদালতে উঠলে তার আর খবর থাকে না। আল্লামা ফরীদ উদ্দীন মাসঊদ সাহেব আসলেই আকাবির-আছলাফের সাহসী সন্তান। আসলেই তিনি তাঁদের ফয়েজ প্রাপ্ত। বিপদসংকুল পরিবেশে ঘাবড়াননি। দমে যাননি। বরং ঈমানের বলে বলীয়ান ছিলেন এই মহান ব্যক্তিত্ব।
যেখানে রাষ্ট্রের বড় বড় হোমরা-চোমরাদের ষড়যন্ত্রে তাঁকে গ্রেফতার করা হয়েছিল। ঠিক তাদের পোষ্য কর্মচারী-কর্মকর্তাদের সামনে তিনি গর্জে ওঠেছিলেন। দ্ব্যর্থহীন কন্ঠে বলেছিলেন, ‘নিজামী আর মুজাহিদের কাছে জিজ্ঞেস করুন, কারা বোমা ফাটিয়েছে।’
এ যেন সাইয়্যেদ হুসাইন আহমাদ মাদানী (রহ.) এর প্রতিচ্ছবি। হযরত মাদানী যেমন জালেম ব্রিটিশ সরকারের বিরুদ্ধে গর্জে ওঠেছিলেন। কামানের সামনে বুক পেতে দিয়েছিলেন। তবুও জালেম শক্তির সাথে আপোস করেননি। তদ্রুপ শাইখুল ইসলাম আল্লামা ফরীদ উদ্দীন মাসঊদ সাহেব জালিম জোট সরকারের বিরুদ্ধে একাই রুখে দাঁড়িয়েছিলেন। সরাসরি রাষ্ট্রপক্ষ যখন তাঁর বিরুদ্ধে, ঠিক সেই মুহুর্তে রাষ্ট্রসন্ত্রাসের বিরুদ্ধে একাই কথা বলেছেন। অবর্ননীয় কষ্ট তাঁর ভোগ করতে হয়েছে।
এখনো জেলখানাতে মানুষ আছে। জামাতবদ্ধ ভাবে রয়েছে তারা। এক সঙ্গে থাকার দ্বারা কষ্ট কিছুটা হলেও কম বোঝা যায়। কিন্তু শাইখুল ইসলাম তখন একাই জেলে ছিলেন, তাঁর কোন সঙ্গী ছিল না। কোনো আলেম-উলামা তাঁর পাশে দাঁড়ায়নি। বরং ক্ষমতাসীন দলের এক আলেম এমপিকে উপহাস করতে দেখেছি। মহান আল্লাহর মেহেরবানী। আকাবির-আছলাফের যোগ্য উত্তরসুরী আল্লামা মাসঊদ। আল্লাহ ছাড়া কাউকে তিনি পরোয়া করেননি। মহান আল্লাহর মদদে তিনি হক-হক্কানিয়্যাতের উপরে ছিলেন অটল-অবিচল।
একজন সাহসী সৈনিক। বিরল একজন আলেমেদ্বীন। বাতিল শক্তির বিরুদ্ধে তাঁর জিহাদ সবসময়। নবী- সাহাবীদের দুশমুনদের সাথে কখনো আপোস নয়। দীর্ঘদিন কারার অন্ধকার প্রকষ্ঠে থেকেও এক মুহুর্তের জন্য হক থেকে নড়ে যাননি। মানুষ কতো কৌশল তালাশ করে বের হবার। সত্য-মিথ্যার মিশ্রণ ঘটায়। কিন্তু আইনি লড়াইয়ে আল্লামা মাসঊদ বিজয় লাভ করেন। কারাগার থেকে মুক্তিপান।
তবে সেদিন শুধু আল্লামা মাসঊদ একাই মুক্তি পাননি। বরং জয় হয়েছে সত্যের। মিথ্যার পরাজয় হয়েছে সেদিন। নবী-সাহাবীদের দুশমুনদের মসনদে ঘুন লাগা শুরু হয়। যারা সত্যকে গোপন করতে চেয়েছিল, যারা অন্যায় করে দোষ অন্যের উপর চাপাতে চেয়েছিল, ইতিহাস আর তাদের ক্ষমা করেনি। বড় নির্মম ভাবে তাদের পরাজয় হয়।
হকের বাতি চিরদিন জ্বলবে। নিভে যাবে না কোনদিন। ব্রিটিশদের অত্যাচারে পিষ্ট হয়েছিল এদেশের সাধারণ মানুষ এবং আলেম-উলামা। তবে আলেমগণ ছিলেন হকের উপর দৃঢ়। বিন্দু পরিমাণ হকের থেকে সরে যাননি। ঠিক তাঁদের রুহানী সন্তানেরা বাতিলের সাথে আপোসহীন। ভয় পায় না কখনো। আল্লাহ তায়ালা এই মর্দে মুজাহিদ আলেমকে কবুল করুন। আমিন।
লেখক: শিক্ষক ও কলামিষ্ট
- আরও পড়ুন: আল্লামা মাসঊদ-এর কারামুক্তি দিবস আজ


