ফিরতে অনিচ্ছুক রোহিঙ্গারা ক্যাম্প ছেড়ে পালাচ্ছে

ফিরতে অনিচ্ছুক রোহিঙ্গারা ক্যাম্প ছেড়ে পালাচ্ছে

কক্সবাজার প্রতিনিধি ● মিয়ানমারের সেনা নির্যাতনে এ দেশে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গারা উখিয়ার ৮টি অস্থায়ী ক্যাম্পে আশ্রয় নিয়েছেন। তারা সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন দাতা সংস্থার দেওয়া ত্রাণ সামগ্রী কমবেশি পাচ্ছেন। তবে সম্প্রতি ক্যাম্প থেকে বেশ কিছু পরিবার পালিয়ে গেছে বলে প্রত্যক্ষদর্শী রোহিঙ্গারা জানিয়েছেন। তারা জানান, যেসব রোহিঙ্গা মিয়ানমারে সচ্ছল জীবন-যাপন করতেন এরাই মূলত ক্যাম্প ত্যাগ করে বিভিন্ন স্থানে বাসা ভাড়া নিয়ে স্থায়ীভাবে বাংলাদেশে থেকে যাওয়ার সুযোগ খুঁজছেন। আবার অনেকের ছেলে-মেয়ে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে থাকায় সেখান থেকে সব কাগজপত্র তৈরি করে জাল ভিসার মাধ্যমে পরিবার-পরিজন নিয়ে যাচ্ছেন।

একাধিক রোহিঙ্গা অভিমত প্রকাশ করে বলেন, মিয়ানমারের সাথে বাংলাদেশের যে প্রত্যাবাসন চুক্তি হয়েছে তা দায়সারা গোছের। ওই চুক্তি অনুযায়ী অনেকেই মিয়ানমারে ফিরে যাওয়ার ব্যাপারে দ্বিধান্বিত। তারা প্রকাশ্যে কিছু না বললেও এ নিয়ে ক্যাম্পে চলছে নেতিবাচক আলোচনা।

স্থানীয় এনজিও সংস্থা ‘হেলপ কক্সবাজার’র নির্বাহী পরিচালক এম এ আবুল কাশেম বলেন, মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের মধ্যে ২৫ শতাংশ পরিবার ধনাঢ্য। যাদের ছেলে-মেয়েরা মালয়েশিয়া, আরব আমিরাত, সৌদিআরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে অবস্থান করছে। বাকি ৭৫ শতাংশ পরিবারের মধ্যে ২০ শতাংশ পরিবার স্বচ্ছল। যারা দেশের বিভিন্ন স্থানে উন্নত জীবন-যাপনের জন্য গোপনে দালালের মাধ্যমে ক্যাম্প ত্যাগ করছেন। আর বাকি ৫৫ শতাংশ পরিবার হতদরিদ্র। যারা মিয়ানমারের চাইতে এখানে ভালো রয়েছেন বলে স্বীকার করেছেন। এসব রোহিঙ্গাদের দাবি, তাদের বসতভিটা ফিরে পাওয়ার নিশ্চয়তা ও স্বাধীন চলাফেরার সুযোগ নিশ্চিত করলে তারা মিয়ানমারে ফিরে যাবেন। তারা আরো জানান, কুতুপালং ক্যাম্প থেকে ইতোমধ্যে প্রায় শতাধিক পরিবার বিদেশে চলে গেছে। আরো কিছু পরিবার চলে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে।

কুতুপালং আনরেজিস্টার্ড রোহিঙ্গা ক্যাম্পের সেক্রেটারি মোহাম্মদ নুর (৩৪) জানান, গত ১ মাস ধরে ২ শতাধিক রোহিঙ্গা নাগরিককে ক্যাম্পে দেখা যাচ্ছে না।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ক্যাম্পের ডি-১ ব্লকের মো. জুবাইর, মো. আলম, নুর মোহাম্মদ, আব্দুল লতিফ, মো. ইউছূপ, আবু তাহের, মো. জুবাইর ও মো. আবু তাহের পরিবার নিয়ে মালয়েশিয়া চলে গেছেন। এছাড়া ই-২ ব্লকের আতাউর রহমান, আলী জুহার সৌদি আরবে, ছৈয়দ নুর, নুরুল আলম, কামাল উদ্দিন কাতার ও হোছন আহাম্মদ আমেরিকা চলে গেছেন।

তারা কিভাবে গেছে জানতে চাওয়া হলে ক্যাম্প সেক্রেটারি বলেন, প্রবাসে অবস্থানরত তাদের স্বজনেরা পাসপোর্ট, ভিসাসহ যাবতীয় কাগজপত্র পাঠিয়েছে। এ ব্যাপারে পাঁচলাইশ থানার পরিদর্শক তদন্ত ওয়ালী উদ্দীন আকবর জানান, আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিয়ে সংঘবদ্ধ দালালের মাধ্যমে বিপুল টাকা ব্যয় করে রোহিঙ্গারা বিদেশে পাড়ি জমাচ্ছে।

১৯৯১ সালে কুতুপালং ক্যাম্পে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গা নাগরিক ডাক্তার জাফর আলম বলেন, বাংলাদেশ-মিয়ানমারের মধ্যে সাম্প্রতিক সম্পাদিত চুক্তির ওপর নির্ভর করে রোহিঙ্গারা মিয়ানমারে ফিরে যেতে নারাজ। তাই যাদের অঢেল টাকা পয়সা আছে তারা দালালের মাধ্যমে ভুয়া পাসপোর্ট বানিয়ে বিদেশে চলে যাচ্ছে। যারা আর্থিকভাবে স্বচ্ছল, বিদেশ যাওয়ার মতো অঢেল টাকা পয়সা নেই তারা ক্যাম্প ছেড়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে চলে যাচ্ছে।

এ প্রসঙ্গে উখিয়া উপজেলা রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন সংগ্রাম কমিটির আহ্বায়ক অধ্যক্ষ হামিদুল হক চৌধুরী জানান, রোহিঙ্গাদের ৫ হাজার একর জায়গার ওপর নিরাপদ বেষ্টনির মধ্যে রাখার কথা থাকলেও তা এখনো বাস্তবায়ন হয়নি। বর্তমানে যে ভাবে রোহিঙ্গারা ক্যাম্প ছেড়ে অন্যত্র চলে যাচ্ছে তা অব্যাহত থাকলে সারাদেশে ছড়িয়ে পড়বে এই জনগোষ্ঠী। তখন আর প্রত্যাবাসন করেও কোনো লাভ হবে না।

উখিয়া থানার অফিসার ইনচার্জ মো. আবুল খায়ের বলেন, ক্যাম্প ছেড়ে বাইরে যাওয়া প্রতিরোধের ব্যাপারে তল্লাশি অভিযান অব্যাহত রয়েছে। পুলিশের পাশাপাশি সামরিক বাহিনীর লোকজনও যাত্রীবাহী গাড়িতে তল্লাশি চালিয়ে যাত্রীদের নিকট আইডি কার্ড আছে কিনা জানতে চাইছে। অনেককে ক্যাম্পে ফেরত পাঠানো হচ্ছে।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *