বক্তৃতায় মাওলানা সাদের নাম নিলেন না আল্লামা আহমদ শফী

বক্তৃতায় মাওলানা সাদের নাম নিলেন না আল্লামা আহমদ শফী

পাথেয় রিপোর্ট : বিশ্ব তাবলিগের ভারতীয় মুরব্বি মাওলানা সাদ কান্ধলভীর বিরোধী তাবলিগ ও হেফাজতপন্থী কওমি আলেমদের পরামর্শসভা (ওয়াজাহাতি জোড়) শনিবার সকালে রাজধানীর মুহাম্মদপুরে অনুষ্ঠিত হয়েছে। এতে হেফাজতে ইসলামের আমীর আল্লামা শাহ আহমদ শফী প্রধান অতিথির বক্তৃতা করেন। তিনি তার বক্তৃতায় একবারও মাওলানা সাদ কান্ধলভীর নাম উচ্চারণ করেননি। নিচে আল্লামা আহমদ শফীর বক্তৃতাটি হুবহু তুলে ধরা হলো-


জামায়াতে ইসলামির এখন  নামগন্ধও নাই . আল্লামা আহমদ শফী


‘আলহামদুলিআহলিহি, ওয়াসসালাতু লিআহলিহা’

ক্বলা রাসূলুল্লাহি সা. ‘আদদিনু আন নাসিহাহ’

আমি ছোট মানুষ। এখানে যে মুরুব্বীয়ানে কেরাম তাশরীফ নিয়ে আসছেন। বাংলাদেশের বড়ো বড়ো আলেমেরা, মুফতীরা এদের কথা আপনাদেরকে শুনয়িছেন। তাদের একেকজনকে যদি কথা বলার সুযোগ দেয়া হতো তাহলে তারা সারাদিন কথা বলতে পারতো। এমন ইস্তেদাদ, কাবেলিয়াত আল্লাহ তাদেরকে দান করেছেন। আমি দোআ করি আল্লাহ তাদের দীর্ঘায়ু করুন।

দীর্ঘায়ু করলে এ ধরনের মাহফিল আরো শুনতে পারবেন। ‘আল উলামা ওয়ারাসাতুল আম্বিয়া’। এই উলামারা নবীদের ওয়ারেস।

আজকে হাজার হাজার মাদরাসা মসজিদ নিয়ে এনারা বসা। আল্লাহ আল্লাহ ছাড়া তাদের আর কোনও কাজ নেই। ঘণ্টা বাজলে কিতাব নিয়ে ছেলেদের পড়ানোর কাজ। দেওবন্দ দেওবন্দ আমরা নাম নিই শুধু। দেওবন্দ মাদরাসা নবী আ. একটি লাঠি দিয়ে যেভাবে নকশা করে দেখিয়েছেন, ঠিক সেভাবেই মুরুব্বিয়ানে কেরাম এই মাদরাসাকে প্রতিষ্ঠা করেছেন। একথা স্মরণ রাখবেন। সেজন্য আমরা ছেলেদের পড়ানোর পর বলে থাকি তোমরা কিছুদিন হলেও দেওবন্দ গিয়েও ঘুরে আসবে। দেওবন্দ ঘুরে আসলেও একজন বড়ো আলেমের মতো আলেম হতে পারবে।

সব লেখা আছে কি করবেন না করবেন। কোথায় যাবেন, কার সঙ্গে সাক্ষাৎ করবেন সব লিপিবদ্ধ আছে। দেওবন্দের কথা সবাই আমরা বলে থাকি। যাতে আমাদের চলাফেরা সবকিছু দেওবন্দের ফতোয়া মোতাবেক হয়। কি সত্য না!

দেওববন্দ থেকে যে ফতোয়া আমরা পেয়েছি তাতে দেখিছে, এ ফতোয়া মোতাবেক হুজুর এবং মুফতীয়ানে কেরাম বয়ান করেছেন। তাবলীগ কার কথা মোতাবেক চলবে, কারা চালাবে? তিনজন মুরুব্বি, মাওলানা ইলিয়াস, মাওলানা এনামুল হাসান, মাওলানা ইউসুফ সাহেব। এরা যে উসূলে শরীয়াহ নির্ধারণ করে দিয়েছেন ঠিক কেয়ামত পর্যন্ত ওই উসূলই চলবে। কেমন, রাজি আছেন তো আপনারা?

এই আলেমরা, মুফতীরা ও আমরা সবাই ওয়াজের মাহফিলে কথা বললে, কোনও মাহফিলের মধ্যে কথা বললে এই তাবলীগের কথা একটু বলে দিবেন। আমরা অন্য কারও কথা মানি না। তাবলীগেও ওই তিনজন মুরুব্বীয়ানে কেরামের কথা মোতাবেক আমরা নিজেও তাবলীগ করবো এবং অন্য ভাইকেও এই উসূলের উপর থাকার জন্য বলবো। রাজী আছেন তো!

আমরা আলেমের কথা মোতাবেক চলবো। যিনি কোনও আলেম না, কোনও আলেমের কাছে পড়েন নাই। ওনি একটা মাযহাব বানিয়ে নিলে আপনারা মানবেন? কখনোই মানবেন না। এই আলেম উলামারা বাংলার সিংহ। এদের কথা মোতাবেক চলবেন। প্রত্যেক জায়গায় অন্য কারো কথা মানবেন না। কেউ যদি বলতে চায় আমল করবেন না। তাবলীগের এ কাজ উলামাদের থেকে আসছে। এখনও তাবলীগের মুরুব্বী হবে এই উলামা হযরত। কেমন কথা বুঝে আসছে?

আর কেউ যদি এখানে নাক গলাইতে আসে তাদেরকে মানবেন না। যারা আলেমদেরকে কয়েকবার পিটাই করছে, যারা তাবলীগের মাতব্বর সাজতেছে তারা আলেমদেরকে পছন্দ করে না। আলেমদেরকে ছাত্রদেরকে কয়েকবার মেরেছে, পিটিয়েছে। সত্য না মিথ্যা বলুন।। জানেন কি না আপনারা। তারা যে মেরেছে!

আমরা উলামারা মার খেতে পারবো, এই মুফতিয়ানে কেরাম আমাদের গালি দিলে সহ্য করতে পারবো। কিন্তু আর কেউ, যারা আলেম না। এরা কি জানবে তাবলীগ সম্পর্কে। এরা কিছুই জানে না। তারা কেন আমাদের পিটাবে?

তাবলীগে তো আদব শিখতে আসি। তাবলীগে আসছি আমরা আদব আখলাক, স্বভাব- চরিত্র  শেখার জন্য। বলেন, সবাই। যাদের কোনও আদব, আখলাক কিচ্ছুই নেই। তারা কি তাবলীগ করবে? তাবলীগের ইলমই তো তাদের কাছে নেই।

তারা যেহেতু আলেম না সেহেতু আমি আদদিনু আন নাসিহা’র কথা বলছি। দ্বীন-ধর্ম কাকে বলে? একে অন্যের মঙ্গল কামনা করার নাম ‘নসীহত’। দ্বীন পুরোপুরিভাবে নসীহতের নাম। সাহাবারা জিজ্ঞাসা করলো খায়েরখাহী করা নসীহতের নাম। খায়েরখাহী কার সাথে করবো? নবী আ. নিজে উত্তর দিচ্ছেন ‘লিল্লাহ’ ওলি রাসূলিহি ওলি আইম্মাতিল মুসলিমীন ওআম্মাতিহীম। খায়েরখাহী এটিই। ব্যাস, ওয়াজ এটুকুই।

যে খায়েরখাহী’ কার সঙ্গে করবেন, লিল্লাহ তথা আল্লাহর সাথে। এর অর্থ কি। এর অর্থ হলো আল্লাহর কোরআনের উপর আমল করবেন। কোরআন যাই বলে,  কোরআন মোতাবেক চলবেন। কোরআন বুঝবে কে! কোরআন বুঝবে আলেমরা, মুফতীরা। এই আলেমদের সাথে সদাচরণ করবেন নাকি এদেরকে পিটাবেন। সাবধান।

আল্লাহর নবী বলছেন:’ লিল্লাহ।অর্থাৎ আল্লাহর কোরআন মোতাবেক আমল করবেন।

দ্বিতীয়: ওলি রাসূলিহী’- আল্লাহর রাসূল আমাদের নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম না হলে একলাখ, দু’লাখ নবী আল্লাহ পাঠিয়েছেন দুনিয়ায়। তাদের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ, সর্বশেষ রাসূল আমাদের নবী। তো রাসূলের সঙ্গে খায়েরখাহী করা কি? তা হলো। রাসূলের সুন্নত মোতাবেক আমল করবেন। নতুন মাযহাব যারা বানাচ্ছে তাদের কথা মানবেন না। এখন  সালাফি, গায়রে মুকাল্লিদ কথা ফেরকা বের হচ্ছে দিনদিন। এরকম তাবলীগের মধ্যেও একটা নতুন তাবলীগ হচ্ছে জামায়াতে ইসলামির মতো। কোনও বেশকম নাই। যেমন, জামায়াতে ইসলামির এখন  নামগন্ধও নাই। আছে? নাই।

এরা এক ইসলাম কায়েম করছে! সত্য না মিথ্য। কিন্তু এটা অচল হয়ে গেছে। এটা চলে নাই। এরা আমাদের হাটহাজারি মাদরাসা জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ধ্বংস করার জন্য পিস্তল, ছুরি ইত্যাদি নিয়ে গুণ্ডাদের নিয়ে এসেছিল। কিন্তু আল্লাহর ফযলে হাটহাজারি মাদরাসার কিছু ক্ষতি করতে পারে নাই। শহর থেকে বা বাহির থেকে যত গুণ্ডারা আসছিলো তাদেরকে মহিলারা মরিচের গুড়ো দিয়ে বিদায় করেছে।

দ্বিতীয়ত নসীহত: নবী আ.এর সঙ্গে খায়েরখাহী করা। এর অর্থ হলো নবীর যত ছোট বড়ো সুন্নত আছে সব মানা। আপনারা মানতে রাজী আছেন তো?

আল্লাহর কোরআন থেকে একটা কথা বলছি। আমরা সবাই মুসলমান। মুসলমানের চিহ্ন কি? বলেন, নামাজ পড়া। আল্লাহ কোরআনে তিরাশি বার নামাজের কথা উল্লেখ করেছেন। আপনাদের থেকে ওয়াদা নিচ্ছি। আপনারা আপনাদের ঘরে যারা আছে সবাইকে নামাজের দাওয়াত দিবেন।

আমি একটা কথা বলবো, আপনারা কি রাখবেন? পুরুষেরা মুখের মধ্যে কি রাখে? দাড়ি। অনেকে মুখের মধ্যে দাড়ি রেখেছে একটু একটু। এগুলোর দ্বারা দাড়ি রাখার সুন্নত তরীকা আদায় হবে না। এক মুষ্টি চার আঙ্গুল পর্যন্ত আপনারা দাড়ি রাখবেন। যদি নবী আ.’র সুপারিশ পেতে চান। রাখবেন তো। যদি না রাখেন। তাহলে কেয়ামতের দিন নবীর কাছে সুপারিশের জন্য গেলে তিনি বলেবন, যাও মিঞা! তুমি কোন ইয়াহুদি, নাসারার উম্মত আমি চিনি না। তুমি আমার মুখের সাথে দুশমনি করেছ। কেমন। নবী আ.র মুখে কি ছিলো! দাড়ী ছিলো। এক মুষ্টি পরিমাণ। তো যার যার মুষ্টি পরিমাণ একমুষ্টি দাড়ি নাই তারা যদি নবীর কাছে সুপারিশের জন্য যায়, তখন নবী বলবেন যাও মিঞা। তুমি কোন ইয়াহুদি নাসারার উম্মত আমি জানি না। যদি আমার উম্মত হতে আমার মতো একলাখ, দু’লাখ চব্বিশ হাজার পয়গাম্বরদের মতোও তোমার মুখে দাড়ি থাকতে। বুঝে এসেছে কি? দাড়ি রাখবেন তো।

রাসূলের জন্য খায়েরখাহি করার অর্থ বলেছি হুজুরের সুন্নত পালন। হুজুরের সুন্নত আরও ‘রাসুল কি সুন্নতে’নামে একটি কিতাব দোকানে পাওয়া যায়। কিতাবটি বাংলায় পাওয়া যায়। কিতাবটি নিয়ে আমল করবেন, কেমন। আমল করবেন তো। তারমধ্যে তাবলীগও আছে। এই তাবলীগও মুফতীয়ানে কেরাম, আওলিয়ায়ে এযাম এরা যেভাবে ওয়াদা দিয়েছেন, বলেছেন ওইভাবে তাবলীগকে ধরে রাখবেন।  মধ্যে কেউ আসলে বলবেন, যাও মিঞা! তুমি তাবলীগ জানো না’ এরকম করে বলবেন। প্রয়োজন যদি হয় গ্রামেগঞ্জে এক সপ্তাহের জন্য হলেও বের হবেন। ইনশাল্লাহ বলেন। এ দেশে নতুন তাবলীগ যেন আসতে না পারে। আমরা তাদের তাবলীগে যাবো না। সত্য ওয়াদা করছেন তো আপনারা। সত্য ওয়াদা করেন। মাদরাসা বন্ধ দিয়ে হলেও এটার জন্য নেমে যাব। আমি যেমন মাদরাসা বন্ধ দিয়ে এনজিওর বিরুদ্ধে নেমে গিয়েছিলাম ছাত্রদের নিয়ে। রাজী আছেন তো।

আপনারা বাড়ীতে যারা আছেন তাদের সবাইকে নামাজি বানাবেন তো। যত মাদারেস আছে সব মাদারেসগুলোয় সাহায্য করবেন। মাদরাসাগুলোতে সবাই কিছুকিছু দান করবেন। এবছর চামড়া বিক্রি করতে পারে নাই। তাই অনেক মাদরাসার অবস্থা খারাপ হয়ে গেছে। শিক্ষকদের বেতন দিতে পারে নাই। আপনারা মুসলমান সবাই নিজনিজ এলাকায় যত মাদরাসা আছে সেখানে যোগাযোগ করে তাদের সহযোগিতা করবেন। চাউলের ব্যবস্থা করে দিবেন।

এরপর আর দুটো কি। তা হলো : ওলী আইয়িম্মাতিল মুসলিমীন ওআম্মাতিহীম। আইয়িম্মাতিল মুসলিমীন তো পাবো না। এর দ্বারা প্রধানমন্ত্রী হতে যারা আছে যেমন রাষ্ট্রপ্রধান বা এমপি আরো যারা আছে এদেরকে নসীহত করা। চিঠির মাধ্যমে বা তাদের কাছে গিয়ে হোক। তাদেরকে বলা যে, তোমরা রাষ্ট্র পরিচালনা করছো, শরীয়ত মোতাবেক রাষ্ট্র চালাও। জোরজবরি করে রাষ্ট্র পরিচালনা করো। এ নসীহত করতে হবে। চতুর্থত: অলি আম্মাতিহীম’ এই যে আপনারা কত মানুষ বাংলাদেশ থেকে গাড়ী ভরে ভরে এখানে এসেছেন, আমরা আপনাদের ওয়াজ করছি। গ্রামে গ্রামে গিয়ে সব জায়গাতেই ওয়াজ করছি এটাই হচ্ছে নসীহত।


(২৮ জুলাই শনিবার দুপুরে হাটহাজারী মাদরাসার মহাপরিচালক আল্লামা আহমদ শফীর বক্তৃতা।)

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *