বিক্ষোভে অগ্নিগর্ভ নেপালে নিহত ১৪ কারফিউ জারি, সেনা মোতায়েন

বিক্ষোভে অগ্নিগর্ভ নেপালে নিহত ১৪ কারফিউ জারি, সেনা মোতায়েন

পাথেয় টোয়েন্টিফোর ডটকম : সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সরকারি নিষেধাজ্ঞা ও দুর্নীতির প্রতিবাদে উত্তাল হয়ে উঠেছে নেপালের রাজধানী কাঠমান্ডু। গতকাল সোমবার সকাল থেকে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে শহরের বিভিন্ন প্রান্তে। শিক্ষার্থী ও তরুণদের নেতৃত্বে শুরু হওয়া এ আন্দোলন দ্রুতই সহিংস রূপ নেয়, পুলিশের সাথে সংঘর্ষে অন্তত ১৪ জন নিহত এবং শতাধিক আহত হয়েছেন। বিভিন্ন হাসপাতালের বরাতে এ তথ্য জানিয়েছে নেপালি সংবাদমাধ্যম দ্য হিমালয়ান টাইমস।

সরকার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে দুপুর ১২টা ৩০ মিনিট থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত রাজধানীতে কারফিউ জারি করেছে। পাশাপাশি সেনাবাহিনীকে রাস্তায় নামানো হয়েছে। তবে কারফিউ উপেক্ষা করেই বিক্ষুব্ধ জনতা শহরের বিভিন্ন সড়কে অবস্থান নিয়েছেন। জেন জেড তরুণদের বিক্ষোভ শুধু রাজধানী কাঠমান্ডুতেই সীমাবদ্ধ নেই, দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়ছে। এরই মধ্যে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে পোখারা, বিরাটনগর, বুটওয়াল, ঝাপা, চিতওনসহ বিভিন্ন শহর।

গত ২৮ আগস্ট নেপাল সরকার একটি নির্দেশ জারি করে জানায়, দেশে সক্রিয় সব সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে সরকারিভাবে নিবন্ধিত হতে হবে। সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছিল ৩ আগস্ট পর্যন্ত। কিন্তু ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ, এক্স (সাবেক টুইটার)সহ বেশির ভাগ আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্ম সেই শর্ত মানেনি। এরপর ৪ আগস্ট থেকে এসব প্ল্যাটফর্মে প্রবেশ নিষিদ্ধ করা হয়।

চীনা মালিকানাধীন টিকটক তখনো নিষেধাজ্ঞার বাইরে ছিল। তরুণ প্রজন্মের অনেকেই এটিকে বৈষম্যমূলক সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখেন। তারা টিকটকের মাধ্যমেই আন্দোলনের ডাক দিতে থাকেন। এভাবেই অনলাইনে জমতে থাকা ক্ষোভ গত রোববার থেকে রাস্তায় বিস্ফোরিত হয়। বিক্ষোভ দমনে নেপালি নিরাপত্তা বাহিনী জলকামান, টিয়ার শেল ও রাবার বুলেট ব্যবহার করেছে। অন্য দিকে বিক্ষোভকারীরা লাঠি, ডালপালা ও পানির বোতল নিয়ে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। এসময় মুহুর্মুহু সরকারবিরোধী সেøাগানে মুখর থাকে কাঠমান্ডুর রাজপথ।

বিক্ষোভকারীদের একটি অংশ জাতীয় পার্লামেন্ট ভবনে ঢুকে পড়ে। এতে উত্তেজনা আরও চরমে ওঠে। এ ছাড়া রাজধানীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা যেমন প্রেসিডেন্টের সরকারি বাসভবন ‘শীতল নিবাস’, প্রধানমন্ত্রী কেপি শর্মা ওলির সরকারি বাসভবন, সিংহ দরবার রাজপ্রাসাদ ও ভাইস প্রেসিডেন্টের বাসভবন ঘিরে কড়া নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে।

যদিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিষেধাজ্ঞা আন্দোলনের তাৎক্ষণিক কারণ, বিশ্লেষকরা বলছেন এর পেছনে দীর্ঘ দিন ধরে পুঞ্জীভূত ক্ষোভ কাজ করছে। ওলি সরকারের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ, অর্থনৈতিক বৈষম্য ও যুবসমাজের কর্মসংস্থান সঙ্কট নিয়ে অসন্তোষ ক্রমেই বাড়ছিল। রাজনৈতিক বিশ্লেষক সুরেশ আচার্য বলেন, ‘সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম তরুণদের জন্য ছিল মত প্রকাশের মাধ্যম। সেটি বন্ধ করে সরকার তাদের কণ্ঠ রুদ্ধ করেছে। এর মধ্য দিয়েই জমে থাকা ক্ষোভ বিস্ফোরিত হলো।’ এর আগে মার্চ মাসেও নেপালে রাজতন্ত্র পুনঃপ্রবর্তনের দাবিতে বড় ধরনের বিক্ষোভ হয়েছিল। সেবারও সেনা মোতায়েন করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা হয়েছিল। ছয় মাস না যেতেই আবারো একই ধরনের উত্তেজনা তৈরি হওয়ায় দেশটির রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

সোমবার রাত পর্যন্ত কাঠমান্ডুর রাজপথ উত্তেজনাপূর্ণ ছিল। কারফিউয়ের মধ্যেও বিক্ষোভকারীরা সড়কে নেমে সরকারের পদক্ষেপের বিরুদ্ধে সেøাগান দিয়েছেন, ‘দুর্নীতি হটাও, স্বাধীনতা ফেরাও।’ নেপালি সরকার বলছে, যেকোনো মূল্যে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা হবে। তবে তরুণ সমাজের ক্রমবর্ধমান ক্ষোভ প্রশমিত না হলে এ অস্থিরতা রাজধানীর বাইরে দেশজুড়েই ছড়িয়ে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

Related Articles